নবমভাগ বিরাটপর্ব বিজয়ী অর্জুন এবং এক বিষণ্ণ অপরাহ্ন

 


নবমভাগ বিরাটপর্ব বিজয়ী অর্জুন এবং এক বিষণ্ণ অপরাহ্ন অর্জুনের একক বিজয়

এরপর অশ্বত্থামা এসে আক্রমণ করলেন অর্জুনকে। মেঘ যেমন অঝোরে জল ঢালে, তেমনি তাঁর ধনুক থেকে বাণ ঝরতে লাগল। বাণের বেগ ছিল ঝড়ের মতো, তবু অর্জুন সেগুলো ঠেকিয়ে দিয়ে অশ্বত্থামার ঘোড়াগুলোকে আহত করলেন। অশ্বত্থামাও কম যান না, একটুখানি সুযোগ পেয়েই বাণ দিয়ে অর্জুনের ধনুকের ছিলা কেটে দিলেন। এই কাজ দেখে দেবতারা পর্যন্ত প্রশংসা করলেন, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, কৃপাচার্য সবাই তারিফ করলেন অশ্বত্থামার। তারপর আবার তিনি অর্জুনকে লক্ষ্য করে বাণ ছুঁড়লেন, আর দুজনের মধ্যে জমে উঠল রোমাঞ্চকর লড়াই। দুজনেই মহাবীর, দুজনেই একে অপরের ওপর ক্রমাগত বাণ ছুঁড়ে চললেন। অর্জুনের কাছে ছিল দিব্য তূণীর— তাতে বাণ কখনো ফুরাত না, তাই তিনি লড়ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল হয়ে। কিন্তু অশ্বত্থামার বাণ ফুরিয়ে এল একসময়, তাই লড়াইয়ে অর্জুন এগিয়ে গেলেন।

বি:দ্র: অশ্বথামার জন্ম কাহিনি ঝালিয়ে নিতে এখানে ক্লিক করুন 

ঠিক তখনই কর্ণ তাঁর ধনুকে টঙ্কার দিলেন। সেই শব্দ শুনে অর্জুন ফিরে তাকালেন, আর কর্ণকে দেখামাত্র তাঁর চোখে জ্বলে উঠল পুরনো রাগ। অশ্বত্থামাকে ছেড়ে তিনি সোজা ছুটে গেলেন কর্ণের দিকে। কাছে গিয়ে বললেন— কর্ণ, সেই যে সভায় বসে তুমি অহংকার করে বলতে যুদ্ধে তোমার সমান কেউ নেই, আজ সেই কথার প্রমাণ দেওয়ার সময় এসেছে। এতদিন আমার সঙ্গে যুদ্ধ না করেই বড় বড় কথা বলে এসেছ, আজ যুদ্ধ করে সেটা প্রমাণ করো। মনে আছে তো, সভায় যখন দ্রৌপদীকে দুষ্ট লোকেরা অপমান করছিল, তুমি তখন মজা দেখছিলে? আজ সেই অন্যায়ের ফল ভোগ করো। তখন ধর্মের বাঁধনে বাঁধা থেকে সব সহ্য করেছিলাম, আজ সেই ক্রোধের ফল দেখো আমার এই জয়ে।

কর্ণ পাল্টা জবাব দিলেন— অর্জুন, যা বলছ তা করে দেখাও। বড় বড় কথা তো বলছই, কিন্তু তুমি আগে কী করেছ তা সবারই জানা। আগে যা সহ্য করেছ, সেটা তোমার অক্ষমতাই ছিল। আজ যদি তোমার পরাক্রম দেখি, তবেই মানব। আমার সঙ্গে লড়ার এই ইচ্ছেটা যেন হঠাৎ জেগে উঠল তোমার মনে। আচ্ছা, আজ আমার পরাক্রমও একটু দেখে নাও।

অর্জুন বললেন— রাধাপুত্র, একটু আগেই তো তুমি আমার সামনে থেকে পালিয়ে গিয়েছিলে, তাই বেঁচে গেলে, শুধু তোমার ছোট ভাই মারা পড়ল। তুমি ছাড়া আর কে আছে, যে ভাইয়ের মৃত্যু দেখে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে এত বড় কথা বলে?

এই বলে অর্জুন কর্ণের বর্ম কাটার জন্য বাণ ছুঁড়লেন, কর্ণও তা ঠেকালেন। অর্জুন বারবার বাণ দিয়ে কর্ণের ঘোড়াগুলো বিদ্ধ করলেন, তাঁর ঢাল কেটে দিলেন, রথের রশিও কেটে দিলেন। কর্ণ তখন তূণীর থেকে তীর তুলে অর্জুনের হাতে বেঁধালেন। অর্জুন তাতে ক্ষান্ত না হয়ে কর্ণের ধনুকই কেটে দিলেন। কর্ণ তখন শক্তি অস্ত্র ছুঁড়লেন, কিন্তু সেটা লক্ষ্যে পৌঁছনোর আগেই অর্জুন কেটে ফেললেন। এই দেখে কর্ণের সহচররা একযোগে অর্জুনকে ঘিরে ধরল, কিন্তু গাণ্ডীব থেকে ছোঁড়া বাণে তারা সবাই ছিন্নভিন্ন হয়ে মাটিতে পড়ল। তারপর অর্জুন কর্ণের রথের ঘোড়াগুলোও বধ করলেন, আর একটা তেজস্বী বাণ ছুঁড়লেন যা কর্ণের বর্ম ভেদ করে বুকে বিঁধল। কর্ণ অজ্ঞান হয়ে পড়লেন, পরে সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে উত্তর দিকে পালিয়ে গেলেন। অর্জুন আর উত্তর তখন সজোরে গর্জন করে উঠলেন জয়ের আনন্দে।

কর্ণকে হারিয়ে অর্জুন উত্তরকে বললেন— যেদিকে স্বর্ণতারকা চিহ্নিত রথ দেখা যাচ্ছে, সেদিকে চলো। ওখানে আমার পিতামহ বসে আছেন, দেবতার মতো দেখতে, তিনি আমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে চান।

উত্তর ততক্ষণে নিজেও বাণে আহত হয়েছেন। ভয়ে-ক্লান্তিতে তিনি বললেন— বীরবর, আমি আর ঘোড়া সামলাতে পারছি না। প্রাণের ভয় হচ্ছে আমার। এত বড় বড় যোদ্ধার এমন সমাবেশ আমি জীবনে দেখিনি। আপনার এই লড়াই দেখে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাচ্ছি। এই অস্ত্রের শব্দ শুনতে শুনতে আমার কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে, স্মৃতিও যেন কমে আসছে। এখন আর চাবুক আর রথের রশি ধরার শক্তি নেই আমার।

অর্জুন তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন— নরশ্রেষ্ঠ, ভয় পেয়ো না, ধৈর্য ধরো। তুমিও তো আজ অদ্ভুত পরাক্রম দেখিয়েছ। তুমি রাজপুত্র, মৎস্যরাজের বিখ্যাত বংশে জন্ম তোমার। এখন হতাশ হওয়া তোমার সাজে না। ঠিক করে বসো, ঘোড়া সামলাও। চলো এবার ভীষ্মের সেনার সামনে যাই, দেখবে আমি কীভাবে দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ করি, সব সৈন্য কেমন চাকার মতো ঘুরপাক খায়। আমি তোমাকেও শেখাব বাণ চালানো আর অস্ত্র সঞ্চালনের কৌশল। ইন্দ্রের কাছ থেকে বজ্রাস্ত্র, ব্রহ্মার কাছ থেকে হাতির মতো তেজ, প্রজাপতির কাছ থেকে সংকটকালে বিচিত্র রীতিতে লড়ার কৌশল, রুদ্রের কাছ থেকে রুদ্রাস্ত্র, বরুণের কাছ থেকে বারুণাস্ত্র, অগ্নির কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, বায়ুর কাছ থেকে বায়ব্যাস্ত্র— সবই শিখেছি আমি। ভয় পেয়ো না, আমি একাই কৌরবরূপী বন উজাড় করে দেব।

এই কথায় উত্তর কিছুটা সাহস পেলেন, রথ নিয়ে চললেন ভীষ্মের সুরক্ষিত সেনার দিকে। অর্জুনকে আসতে দেখে ভীষ্ম ধৈর্য ধরে তাঁর গতিরোধ করলেন। অর্জুন বাণে ভীষ্মের রথের ধ্বজা কেটে ফেললেন। ঠিক সেই মুহূর্তে দুঃশাসন, বিকর্ণ, দুঃসহ আর বিবিংশতি চারদিক থেকে ঘিরে ধরলেন অর্জুনকে। দুঃশাসন এক বাণে উত্তরকে আর আরেক বাণে অর্জুনকে বিদ্ধ করলেন। অর্জুনও তাঁর তীক্ষ্ণ বাণে দুঃশাসনের সোনার ধনুক কেটে দিয়ে পাঁচটা বাণ মারলেন তাঁকে। ব্যথায় কাতর হয়ে দুঃশাসন যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালালেন। এরপর বিকর্ণ এলেন আক্রমণ করতে, অর্জুন তাঁর কপালে একটা বাণ মারতেই তিনি রথ থেকে পড়ে গেলেন। তারপর দুঃসহ আর বিবিংশতি ভাইদের প্রতিশোধ নিতে একসঙ্গে এলেন, অর্জুন বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে দুটো বাণে দুজনকেই বিদ্ধ করলেন, ঘোড়াও বধ করলেন। তাঁদের সহচররা রক্তাক্ত দুজনকে অন্য রথে করে সরিয়ে নিয়ে গেল। অর্জুন তখনও রণভূমিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, অপরাজেয়।

এই পরাক্রম দেখে দুর্যোধন, কর্ণ, দুঃশাসন, দ্রোণ, অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য— সবাই একসঙ্গে রেগে গিয়ে আবার আক্রমণ করলেন অর্জুনকে। সবার দিব্যাস্ত্র একযোগে ছুটে এল তাঁর দিকে, শরীরের এমন কোনো জায়গা রইল না যেখানে বাণ বেঁধেনি। তবু অর্জুন মৃদু হেসে গাণ্ডীবে ঐন্দ্র অস্ত্র সন্ধান করে ছুঁড়লেন, কৌরবদের ঢেকে দিলেন বাণের বৃষ্টিতে। হাতি-রথের সওয়াররা সব মূর্ছা গেল, সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে প্রাণভয়ে পালাতে লাগল।

এই দেখে স্বয়ং ভীষ্ম এলেন সোনার ধনুক আর মর্মভেদী বাণ নিয়ে। ধ্বজায় আটটা বাণ মারলেন তিনি, ধ্বজার বানর আর তার সামনের ভূতমূর্তিও আহত হল। অর্জুন এক ভল্ল দিয়ে ভীষ্মের ছাতা কেটে ফেললেন, ঘোড়া-সারথিদেরও আহত করলেন। ভীষ্ম আর সহ্য করতে না পেরে দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ শুরু করলেন, অর্জুনও পাল্টা দিব্যাস্ত্র ছাড়লেন। যেন বলি আর ইন্দ্রের যুদ্ধ চলছে এমন এক ভয়ংকর লড়াই শুরু হল দুজনের মধ্যে। কৌরবরা প্রশংসা করে বলল— ভীষ্ম যে অর্জুনের সঙ্গে এই লড়াই চালাচ্ছেন, এ সহজ কাজ নয়। অর্জুন বলবান, তরুণ, রণকৌশলী, ক্ষিপ্র— ভীষ্ম আর দ্রোণ ছাড়া আর কে সইতে পারবে ওর বেগ!

দুজনেই একে একে প্রজাপত্য, ঐন্দ্র, আগ্নেয়, রৌদ্র, বারুণ, কৌবের, যাম্য, বায়ব্য অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। প্রথমে দিব্যাস্ত্রের লড়াই, তারপর সাধারণ বাণের লড়াই। ভীষ্ম একটা নতুন ধনুক নিয়ে ফের আক্রমণ করলেন, অর্জুন সেটাও কেটে দিলেন। ভীষ্ম রাগে ফুঁসে অর্জুনের বাঁ হাতে বাণ বিঁধিয়ে দিলেন। অর্জুন হেসে ভীষ্মের ধনুক টুকরো টুকরো করে দিলেন, তারপর দশটা বাণ মারলেন তাঁর বুকে। ভীষ্ম প্রচণ্ড আহত হয়ে রথের দণ্ড ধরে বহুক্ষণ বসে রইলেন। তাঁকে অজ্ঞানপ্রায় দেখে সারথি নিজের কর্তব্য মনে করে রথ যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে নিয়ে গেলেন।

ভীষ্ম সরে যেতেই দুর্যোধন নিজেই ধনুক হাতে গর্জন করতে করতে এগিয়ে এলেন অর্জুনের দিকে। কপাল লক্ষ্য করে বাণ ছুঁড়লেন, বাণটা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল, অর্জুনের কপাল থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। রেগে গিয়ে অর্জুন তীক্ষ্ণ বাণে দুর্যোধনকে আঘাত করতে লাগলেন। প্রচণ্ড যুদ্ধ বেধে গেল দুজনের মধ্যে। একটা বাণ দুর্যোধনের বুকে লাগতেই তিনি আহত হয়ে পড়লেন। অর্জুন এরপর একে একে প্রধান সেনানীদের মেরে সরিয়ে দিলেন। যোদ্ধাদের পালাতে দেখে দুর্যোধনও রথ ঘুরিয়ে পালাতে লাগলেন, রক্ত বমি করতে করতে।

অর্জুন তাঁকে ডেকে বললেন— ধৃতরাষ্ট্রনন্দন, যুদ্ধে পিঠ দেখিয়ে পালাচ্ছ কেন? এতে তোমার এত বড় কীর্তি মাটি হবে। যে বিজয়বাদ্য আগে বাজত, তা আর বাজবে না। যাঁকে তুমি রাজ্যচ্যুত করেছ, সেই যুধিষ্ঠিরেরই ভাই আজ যুদ্ধে তোমার সামনে দাঁড়িয়েছে, একবার মুখ ফিরিয়ে দেখো। বীর দুর্যোধন, রাজার কর্তব্য মনে করো। এখন তোমার সামনে-পিছনে কেউ রক্ষা করার নেই, তাই পালিয়ে হলেও নিজের প্রাণটা বাঁচাও।

এই আহ্বানে দুর্যোধন যেন আহত মত্ত হাতির মতো ফিরে এলেন, ক্ষতবিক্ষত শরীর সামলে। তাঁকে ফিরতে দেখে উত্তর দিক থেকে কর্ণ, পশ্চিম দিক থেকে ভীষ্ম, আর দ্রোণ-কৃপাচার্য-বিবিংশতি-দুঃশাসন সবাই ছুটে এলেন রক্ষা করতে। সবাই মিলে চারদিক থেকে ঘিরে ধরলেন অর্জুনকে, বৃষ্টির মতো বাণ ছুড়তে লাগলেন। অর্জুন তাঁদের সব অস্ত্র প্রতিহত করলেন, তারপর প্রয়োগ করলেন এক দুর্লঙ্ঘ্য অস্ত্র— সম্মোহন। তারপর দুহাতে শঙ্খ তুলে এমন জোরে বাজালেন যে দিক-বিদিক, আকাশ-বাতাস-পৃথিবী সব কেঁপে উঠল। সেই শব্দে কৌরব বীররা সবাই অজ্ঞান হয়ে পড়লেন, হাত থেকে অস্ত্র খসে পড়ল, তাঁরা নিশ্চল হয়ে রইলেন।

তাঁদের এই অবস্থা দেখে অর্জুনের মনে পড়ল উত্তরার কথা। তিনি উত্তরকে বললেন— রাজকুমার, এদের চেতনা ফেরার আগেই তুমি এই সেনার মধ্যে দিয়ে গিয়ে দ্রোণ-কৃপাচার্যের সাদা কাপড়, কর্ণের হলুদ কাপড়, অশ্বত্থামা-দুর্যোধনের নীল কাপড় নিয়ে এসো। তবে সাবধান, পিতামহ ভীষ্ম বোধহয় এখনও সজ্ঞান আছেন, কারণ উনি সম্মোহনাস্ত্র ঠেকাতে জানেন। তাই তাঁর ঘোড়া এড়িয়ে যেয়ো।

উত্তর রথ থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে সেই কাপড়গুলো নিয়ে এলেন, আবার রথে উঠে বেরিয়ে এলেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে। ঠিকই, ভীষ্ম তখনও সজাগ ছিলেন, তিনি অর্জুনকে চলে যেতে দেখে বাণ ছুঁড়লেন। অর্জুন তাঁর ঘোড়াগুলোকে দশটা বাণে বিদ্ধ করে, সারথিকেও শেষ করে বেরিয়ে এলেন যুদ্ধভূমি থেকে। তখন তাঁকে দেখাচ্ছিল যেন মেঘ কেটে যাওয়া সূর্যের মতো।

কিছুক্ষণ পর কৌরবদের চেতনা ফিরল। দুর্যোধন অর্জুনকে একলা যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে ভীষ্মকে জিজ্ঞেস করলেন— পিতামহ, ও আপনার হাত থেকে বাঁচল কী করে? এখনই ওকে শেষ করুন, পালাতে দেবেন না।

ভীষ্ম হেসে বললেন— কুরুরাজ, তুমি নিজেই যখন অস্ত্র ছেড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে, তখন তোমার বুদ্ধি কোথায় ছিল, পরাক্রম কোথায় গিয়েছিল? অর্জুনের মন কখনো পাপাচারে নত হয় না, ত্রিলোকের রাজ্যের বিনিময়েও সে নিজের ধর্ম ছাড়বে না। তাই এই যুদ্ধে সে আমাদের বধ করেনি। এখন চলো, শীঘ্র হস্তিনাপুরে ফিরে যাই। অর্জুন গোধন নিয়ে চলে যাবে, তাতে ক্ষতি নেই। মোহে পড়ে নিজের ভালোটা নষ্ট কোরো না, সবারই উচিত নিজের হিতের কথা ভাবা।

পিতামহের এই কথা শুনে দুর্যোধন বুঝলেন এই যুদ্ধে আর আশা নেই। মনে মনে কষ্ট পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলেন। বাকি যোদ্ধাদেরও ভীষ্মের কথাই যুক্তিসঙ্গত মনে হল— লড়াই চালালে অর্জুনরূপী আগুন আরও বেড়েই চলবে। তাই সবাই দুর্যোধনকে রক্ষা করার জন্য ফিরে যাওয়াই ঠিক করলেন।

কৌরবদের ফিরে যেতে দেখে অর্জুন খুশি হলেন। মাথা নত করে পিতামহ ভীষ্ম আর গুরু দ্রোণকে প্রণাম জানালেন, আর অশ্বত্থামা-কৃপাচার্য-অন্যান্য কুরুবংশীয় বড়দের বাণের মাধ্যমে এক অদ্ভুত রীতিতে প্রণাম জানালেন। তারপর এক বাণে দুর্যোধনের রত্নখচিত মুকুট দু-টুকরো করে দিলেন। গাণ্ডীবে টঙ্কার দিয়ে, দেবদত্ত শঙ্খ বাজিয়ে শত্রুর হৃদয় কাঁপিয়ে দিলেন। তাঁর সোনার মালা জড়ানো ধ্বজা তখন বিজয়ের আনন্দে ঝলমল করছিল।

কৌরবরা চলে গেলে অর্জুন প্রসন্ন হয়ে উত্তরকে বললেন— রাজকুমার, এবার ঘোড়া ফেরাও। তোমাদের গোধন আমরা জিতে নিয়েছি, শত্রুও চলে গেছে। এখন আনন্দ করে নগরে ফিরে চলো।

অর্জুনের সঙ্গে কৌরবদের এই অদ্ভুত যুদ্ধ দেখে দেবতারাও প্রসন্ন হলেন, তাঁর পরাক্রমের কথা স্মরণ করতে করতে নিজেদের লোকে ফিরে গেলেন।


বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে এবং বনপর্ব ৬৫তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিরাটপর্বের  নবম ভাগের  আলোচনা এবং বিরাটপর্বের পরবর্তী ভাগ চলবে।


পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।


আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি