৩৭তম বন পর্ব-আলোকের তীরে অর্জুন: এক মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন


৩৭তম বন পর্ব-আলোকের তীরে অর্জুন: এক মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন

ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। গন্ধমাদন পর্বতের চূড়ায় মায়াবী আলোর আলপনা। ঠিক তখনই মহর্ষি ধৌম্য তাঁর প্রাতঃস্নান আর জপ-আহ্নিক শেষ করে পাণ্ডবদের কুটিরের দিকে এগিয়ে গেলেন। সঙ্গে একদল তপস্বী, যাঁদের চোখে তপস্যার শান্ত দীপ্তি। যুধিষ্ঠির, ভীম আর দ্রৌপদী পরম শ্রদ্ধায় এগিয়ে এসে প্রণাম করলেন তাঁদের।

ধৌম্য মৃদু হেসে যুধিষ্ঠিরের হাতটি নিজের হাতের মধ্যে নিলেন। এক অদ্ভুত স্নেহ আর গাম্ভীর্য ঝরে পড়ল তাঁর কণ্ঠে। তিনি পুব আকাশে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, "দেখো যুধিষ্ঠির, ওই যে সুদূর প্রসারিত পর্বতমালা সমুদ্রের কোল ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ওর নাম মন্দরাচল। সবুজ বরণ অরণ্য আর রূপালি শৃঙ্গ নিয়ে কেমন রূপসী দেখাচ্ছে ওকে, তাই না? এই পূর্ব দিকটাই হলো দেবরাজ ইন্দ্র আর ধনকুবেরের আবাস। এখানেই ঋষি, গন্ধর্ব আর দেবতারা উদীয়মান সূর্যকে বন্দনা জানান।"

ধৌম্য একে একে দিকচক্রবালের রহস্য উন্মোচন করতে লাগলেন, যেন এক প্রাচীন ভূগোলের গল্প বলছেন। তিনি দক্ষিণ দিকে ইশারা করে বললেন, "ওই দিকে থাকেন ধর্মের দেবতা, যমরাজ। তাঁর নগরী সংযমনী বড় বিচিত্র, বড় সমৃদ্ধ। আর পশ্চিমে তাকিয়ে দেখো, অস্তাচল পর্বত। বরুণদেব সেখানে মহাসমুদ্রের অতল থেকে সমস্ত সৃষ্টিকে রক্ষা করছেন।"

সবশেষে ধৌম্য তাকালেন উত্তরের সেই ধবধবে সাদা তুষারাবৃত চূড়াগুলোর দিকে। তাঁর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, "আর ওই যে দেখছ ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছে—ওটাই মেরু পর্বত। সাধারণ মানুষের সাধ্য নেই সেখানে পৌঁছায়। কেবল ব্রহ্মবিদরাই পারেন ওই আলোর দেশে পা রাখতে। ওরই চূড়ায় বসে ব্রহ্মার সভা। সপ্তর্ষিমণ্ডল ওকে ঘিরেই উদিত আর অস্ত যায়। আর ওই পরম পবিত্র শৃঙ্গেই বিরাজ করছেন স্বয়ং সনাতন নারায়ণ। স্বপ্রকাশ, জ্যোতির্ময়। দেবতা বা দানব কেউ তাঁর নাগাল পায় না। কেবল পরম আত্মত্যাগী আর শুদ্ধচিত্ত যোগীরাই তাঁর দেখা পান। আর একবার সেখানে পৌঁছালে, এই মর্ত্যের দুঃখ-কষ্টের সংসারে আর ফিরে আসতে হয় না। হে ধর্মরাজ, এই অবিনশ্বর পুণ্যভূমিকে প্রণাম করো।"

যুধিষ্ঠির মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। তিনি দেখলেন, কেমন করে সূর্য, চাঁদ আর নক্ষত্ররা মেরু পর্বতকে প্রদক্ষিণ করছে। এই সূর্য-চন্দ্রই তো দিন-রাতের হিসাব রাখছে, বৃষ্টি আর বাতাসে পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখছে। এক গভীর শান্তিতে পাণ্ডবরা সেই পাহাড়ি বুকেই দিন কাটাতে লাগলেন। কিন্তু মনে মনে সবাই যেন কারোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

ঠিক তখনই ঘটল সেই অলৌকিক ঘটনা।

দীর্ঘ পাঁচটি বছর কেটে গেছে। অর্জুন তখন স্বর্গে, দেবরাজ ইন্দ্রের অতিথি। কিন্তু তিনি সেখানে শুধু বিলাসে মত্ত ছিলেন না, দিন-রাত এক করে শিখেছেন অস্ত্রবিদ্যা। অগ্নি, বরুণ, চন্দ্র, বায়ু, বিষ্ণু, শিব, ব্রহ্মা আর যমের মতো মহাদেবতাদের কাছ থেকে একে একে লাভ করেছেন মহাশক্তিধর সব দিব্যাস্ত্র।

আজ অর্জুনের ফেরার দিন। শিক্ষা সম্পূর্ণ হতে ইন্দ্র পরম স্নেহে বিদায় দিলেন তাঁর প্রিয় পুত্রকে।

গন্ধমাদন পর্বতের আকাশে হঠাৎ মেঘের গর্জন শোনা গেল, কিন্তু সে মেঘে বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল না, ছিল এক মহাসমৃদ্ধির সুর। এক দিব্য রথে চড়ে, আলোর রেখা ফালি ফালি করে কেটে অর্জুন নেমে এলেন মর্ত্যের মাটিতে। তাঁর চোখে দেবলোকের আত্মবিশ্বাস, বুকে বীরের আনন্দ। পাঁচ বছরের দীর্ঘ বিরহ শেষে, অস্ত্রাগারের সমস্ত আলো নিজের ডানহাতে নিয়ে, অর্জুন আবার এসে দাঁড়ালেন তাঁর ভাইদের সামনে। গন্ধমাদন পর্বত যেন এক লহমায় নতুন করে জেগে উঠল।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৩৭তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৩৬তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

 সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা