৬৩তম বনপর্ব-সাবিত্রীর ভালোবাসার জয়গাথা: এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান-
৬৩তম বনপর্ব- সাবিত্রীর ভালোবাসার জয়গাথা: এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান-
যুধিষ্ঠিরের অন্তরে বিষাদের ঘন মেঘ। রাজ্য হারিয়েছেন, বনবাসের কষ্ট সহ্য করছেন, কিন্তু সব ছাপিয়ে তাঁর বুকের ভেতর বিঁধছে দ্রৌপদীর দুঃখ। মুনি মার্কণ্ডেয়কে তিনি প্রশ্ন করলেন, "হে ঋষি, রাজত্ব হারানোর যন্ত্রণা তো আছেই, কিন্তু দ্রৌপদীর এই অপমান, এই কষ্ট আমার বুক ঝাঁঝরা করে দেয়। দ্রৌপদীর মতো এমন নিঃস্বার্থ, পতিব্রতা নারী কি এই পৃথিবীতে আর কেউ কখনো জন্মেছেন? আপনি কি এমন কারও কথা জানেন?"
ঋষি মার্কণ্ডেয় এক মুহূর্ত থামলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, "শোনো রাজন, তবে তোমাকে এক মহীয়সী নারীর কথা বলি। মদ্রদেশের রাজকন্যা সাবিত্রী—যে নামে আজও কুলকামিনীরা সৌভাগ্যের আলো খোঁজে।"
১. রাজকন্যার আত্মসংকোচ ও নিয়তির আহ্বান
মদ্রদেশের রাজা অশ্বপতি ছিলেন অতিশয় ধর্মপরায়ণ, দাতা ও প্রজাবৎসল। কিন্তু একটিমাত্র খামতি তাঁর জীবনে অন্ধকার করে রেখেছিল—তিনি ছিলেন সন্তানহীন। অবশেষে দেবী সাবিত্রীর আরাধনা করে, তাঁরই কৃপায় তিনি লাভ করলেন পদ্মপলাশলোচনা এক কন্যাকে। দেবীর নামানুসারেই নাম রাখা হলো ‘সাবিত্রী’।
কন্যা ক্রমশ বড় হয়ে উঠলেন। যেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মী নেমে এসেছেন মদ্ররাজপুরীতে। দেখতে দেখতে তিনি পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করলেন। তাঁর রূপের জ্যোতি এমন ছিল যে, কোনো রাজকুমার সাহস করে তাঁর পণিপ্রার্থী হতে এগিয়ে এলো না। অশ্বপতি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। একদিন মেয়েকে কাছে ডেকে অত্যন্ত স্নেহে বললেন, "বাছা, শাস্ত্রে আছে বিবাহযোগ্যা কন্যাকে যে পিতা পাত্রে সমর্পণ করেন না, তিনি নিন্দনীয়। তুমি স্বয়ং বের হও। নিজের যোগ্য পতি বেছে নাও। আমি যেন দেবতাদের কাছে অপরাধী না হই।"
গায়ে সামান্য গহনা, পরনে তাপসের পোশাক, সঙ্গে কয়েকজন বৃদ্ধ মন্ত্রী—সাবিত্রী বের হলেন তীর্থ ও তপোবনের উদ্দেশ্যে। রাজর্ষি ও মুনিদের চরণ বন্দনা করে, দীন-দরিদ্রকে দানছত্র খুলে দিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন এক বন থেকে অন্য বনে।
২. হৃদয়ের নির্বাচন ও নারদের অমঙ্গল বার্তা
একদিন রাজা অশ্বপতি সভায় বসে কথা বলছেন দেবর্ষি নারদের সঙ্গে। এমন সময় পথশ্রমে কিঞ্চিৎ ক্লান্ত, কিন্তু চোখে অদ্ভুত এক উজ্জ্বলতা নিয়ে ফিরে এলেন সাবিত্রী। দেবর্ষি নারদকে দেখে তিনি নত মাথায় প্রণাম করলেন।
নারদ মিটিমিটি হেসে বললেন, "মহারাজ, কন্যা তো যৌবনপ্রাপ্তা, অথচ এখনও একে গৃহে আটকে রেখেছেন কেন? কোথায় গিয়েছিলেন ইনি?"
অশ্বপতি বললেন, "দেবর্ষি, পতি অন্বেষণেই তো গিয়েছিলেন। সাবিত্রী, বলো, কাকে তোমার মন বরণ করল?"
সাবিত্রী বিনম্র কণ্ঠে বললেন, "পিতাশ্রী, শাল্বদেশের এক ধর্মপ্রাণ রাজা ছিলেন—দ্যুমৎসেন। অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শত্রুরাজা তাঁর রাজ্য ছিনিয়ে নেয়। তিনি স্ত্রী ও বালকপুত্র সত্যবানকে নিয়ে গভীর বনে আশ্রয় নেন। সেই সত্যবান এখন তপোবনেই বড় হয়েছেন। আমি মনে মনে তাঁকেই আমার পতি বলে বরণ করেছি।"
কথাটা শোনামাত্র দেবর্ষি নারদের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "মহারাজ! সাবিত্রী না জেনে বড় ভুল করে ফেলেছে। সত্যবান সূর্যের মতো তেজস্বী, বৃহস্পতির মতো বুদ্ধিমান, শিবের মতো দাতা আর চন্দ্রের মতো প্রিয়দর্শন—তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁর মধ্যে এমন এক মহাদোষ আছে, যা তাঁর সমস্ত গুণকে ঢেকে দেয়।"
অশ্বপতি চমকে উঠলেন, "কী সেই দোষ, দেবর্ষি?"
নারদ বললেন, "আজ থেকে ঠিক এক বছর পর সত্যবানের আয়ু শেষ হবে। সে দেহত্যাগ করবে।"
রাজা অশ্বপতি শিউরে উঠলেন। সাবিত্রীর দিকে ফিরে আকুল কণ্ঠে বললেন, "মা সাবিত্রী, শুনলে তো? ও পথ ছাড়ো। তুমি আবার গিয়ে অন্য কাউকে বর হিসেবে বেছে নাও।"
কিন্তু সাবিত্রীর মুখাবয়ব স্থির, অবিচল। তিনি ধীর গলায় বললেন, "পিতা! কাঠ বা পাথর একবারই আলাদা হয়। কন্যাদানও জীবনে একবারই করা যায়। ‘আমি দান করলাম’—এই সংকল্পও তো একবারই হয়। তিনি দীর্ঘায়ু হন বা অল্পায়ু, গুণবান হন বা গুণহীন—আমি তাঁকেই বরণ করেছি। মনই মানুষের আসল ধ্রুবতারা, আমার মন স্থির হয়ে গেছে।"
নারদ তখন হেসে উঠে বললেন, "মহারাজ, আপনার কন্যার বুদ্ধি অত্যন্ত স্থির, একে ধর্ম থেকে বিচ্যুত করা অসম্ভব। সত্যবানের যে গুণ, তা বিরল। ঈশ্বর যা চান, তা-ই হোক। আপনি নির্বিঘ্নে কন্যাদান করুন।"
৩. বনের কুটির ও মৃত্যুর প্রহর গোনা
রাজা অশ্বপতি ঋষি নারদের আদেশ শিরোধার্য করে গভীর বনে দ্যুমৎসেনের আশ্রমে উপস্থিত হলেন। জীর্ণ কুটির, শালগাছের নিচে বসে আছেন এক নেত্রহীন বৃদ্ধ রাজা। অশ্বপতি যখন কন্যাসম্প্রদানের প্রস্তাব দিলেন, দ্যুমৎসেন ইতস্তত করে বললেন, "মহারাজ! আমরা রাজ্যচ্যুত, বনবাসী, তপস্বী। আপনার রাজকন্যা এই বনের কষ্ট সহ্য করবে কেমন করে?"
অশ্বপতি হেসে বললেন, "সুখ আর দুঃখ তো জোয়ার-ভাটার মতো আসে আর যায়। আমার কন্যা সব জেনেবুঝেই এসেছে।"
শাস্ত্রসম্মতভাবে শুভলগ্নে সত্যবান ও সাবিত্রীর বিবাহ সম্পন্ন হলো।
রাজকীয় পোশাক, মনি-মাণিক্য সব খুলে ফেলে সাবিত্রী পরলেন গেরুয়া বসন। দিনরাত শ্বশুর-শাশুড়ির সেবায়, পতির প্রেমে তিনি নিজেকে সঁপে দিলেন। কিন্তু বাইরে থেকে হাসিমুখে থাকলেও সাবিত্রীর ভেতরের হৃদয়ে জ্বলছিল এক প্রচ্ছন্ন আগ্নেয়গিরি। দিন গুনছিলেন তিনি। দেবর্ষি নারদের সেই ভয়াল বাণী প্রতি মুহূর্তে তাঁর মনে বাজছিল।
অবশেষে সেই অলক্ষুণে দিনটি এসে উপস্থিত হলো। মৃত্যুর আর চারদিন বাকি থাকতে সাবিত্রী কঠোর তিন দিনের ‘ত্রিরাত্র’ ব্রত শুরু করলেন। অনাহার, নির্ঘুম রাত, আর বুকভাঙা প্রার্থনা।
যেদিন সত্যবানের মৃত্যুর দিন, সেদিন সকালে উঠে সূর্যদেবকে প্রণাম জানিয়ে, গুরুজনদের আশীর্বাদ মাথায় নিলেন সাবিত্রী। সবাই আশীর্বাদ করলেন—'অবিধবা হও'। সাবিত্রী মনে মনে বললেন, তাই হোক’।
সত্যবান কাঠ কাটার জন্য কুঠার হাতে বনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতেই সাবিত্রী বললেন, "আজ আমিও আপনার সঙ্গে বনে যাব।"
সত্যবান অবাক হয়ে বললেন, "প্রিয়ে, তুমি উপবাস করে দুর্বল, বনের পথ দুর্গম। কী দরকার কায়েক্লেশের?"
"না, আমার মন আজ বড্ড ব্যাকুল। আমাকে বারণ করবেন না," সাবিত্রীর অনমনীয় জেদের কাছে সত্যবান হার মানলেন।
৪. যমরাজের মুখোমুখি
গভীর বনে সত্যবান ফল তুললেন, তারপর কাঠ কাটতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ কাটতেই হঠাৎ সত্যবানের কপাল ঘেমে উঠল, মাথা তীব্র যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যেতে লাগল। কুঠারটি ফেলে দিয়ে তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে সাবিত্রীর কাছে এসে বললেন, "সাবিত্রী! আমার মাথা যেন লোহার পেরেক দিয়ে কেউ ফুটো করছে... শরীর অবশ হয়ে আসছে। আমি একটু শোব..."
সাবিত্রী বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে সত্যবানের মাথাটি নিজের কোলে তুলে নিয়ে মাটিতে বসলেন। এটাই সেই ক্ষণ!
ঠিক সেই মুহূর্তে সাবিত্রী দেখলেন, বনের ভেতর থেকে এক দীর্ঘকায় পুরুষ এগিয়ে আসছেন। তাঁর পরনে রক্তবর্ণের বস্ত্র, মাথায় মুকুট, শ্যামল কান্তি কিন্তু চোখ দুটি রক্ত জবা ফুলের মতো লাল। হাতে তাঁর এক ভয়ঙ্কর পাশ (দড়ি)।
সাবিত্রী পতির মাথাটি আলতো করে মাটিতে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করলেন। "আপনি নিশ্চিত কোনো দেবপুরুষ! কৃপা করে বলুন, আপনি কে?"
সেই ভয়াল পুরুষ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, "সাবিত্রী, তুমি পতিব্রতা ও তপস্বিনী, তাই তোমাকে উত্তর দিচ্ছি। আমি যমরাজ। তোমার পতি সত্যবানের আয়ু শেষ। আমি একে নিয়ে যেতে এসেছি।"
সাবিত্রী বিস্মিত হয়ে বললেন, "প্রভুর দূত আসার কথা শুনেছি, আপনি স্বয়ং কেন এসেছেন?"
"সত্যবান পরম ধর্মাত্মা ও গুণের সাগর। সাধারণ দূতের সাধ্য নেই একে স্পর্শ করার," বলেই যমরাজ সত্যবানের দেহ থেকে এক বুড়ো আঙুল পরিমাণ জীবাত্মাকে পাশে বেঁধে দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
দুঃখাতুর কিন্তু অটল সাবিত্রীও যমরাজের পিছু পিছু চলতে লাগলেন।
কিছুদূর গিয়ে যমরাজ পিছন ফিরে তাকিয়ে বললেন, "সাবিত্রী, ফিরে যাও। পতিসেবার ঋণ থেকে তুমি মুক্ত। অনুগমন করার শেষ সীমা অতিক্রম করে ফেলেছ।"
সাবিত্রী মিষ্ট অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "হে দেবরাজ! যেখানে আমার স্বামী যান, সেখানে যাওয়াই আমার সনাতন ধর্ম। তপস্যা, গুরুভক্তি আর আপনার কৃপায় আমার গতি কোথাও রুদ্ধ হতে পারে না। সাধুপুরুষের সঙ্গ কখনো ব্যর্থ হয় না।"
যমরাজ সাবিত্রীর বাগ্মিতা ও প্রাঞ্জল সত্যভাষণে প্রীত হয়ে বললেন, "সাবিত্রী, তোমার কথায় আমি সন্তুষ্ট। সত্যবানের জীবন ছাড়া তুমি যা বর চাইবে, আমি দেব।"
সাবিত্রী ক্ষণকাল ভেবে বললেন, "আমার শ্বশুর রাজ্য হারিয়ে অন্ধ হয়ে বনবাসী। তিনি যেন দৃষ্টি ফিরে পান, আর সূর্যের মতো তেজস্বী হন।"
"তথাস্তু!" যমরাজ বললেন, "যাও, এবার ফিরে যাও, খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছ।"
কিন্তু সাবিত্রী থামলেন না। পিছন পিছন চলতে চলতেই বলতে লাগলেন সৎপুরুষের ধর্ম আর দয়ার মাহাত্ম্য। যমরাজ আবার মুগ্ধ হলেন, "সাবিত্রী, সত্যবানের প্রাণ ছাড়া আর একটি বর চেয়ে নাও।"
সাবিত্রী বললেন, "আমার শ্বশুরের অপহৃত রাজ্য যেন তিনি ফিরে পান এবং কখনো যেন ধর্মচ্যুত না হন।"
"তা-ই হবে। এবার ফিরে যাও, বৃথা শ্রম কোরো না," যমরাজ সামনে পা বাড়ালেন।
সাবিত্রী কিন্তু পথ চলতেই থাকলেন। মুখে তাঁর ধর্মের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা—কীভাবে ন্যায়বিচারক ‘বৈবস্বত’ পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করেন। যমরাজ আবার বললেন, "তোমার কথা যেন অমৃত বর্ষণ করছে! সত্যবানের জীবন বাদে তৃতীয় বর নাও।"
সাবিত্রী সহাস্যে বললেন, "আমার পিতা সন্তানহীন। তাঁর যেন শত পুত্র জন্মায়, যারা তাঁর কুল রক্ষা করবে।"
"তোমার পিতার শত পুত্র হবে। এবার তো অনেক দূর চলে এলে, ফিরে যাও রাজপুত্রী!" যমরাজ তাড়া দিলেন।
সাবিত্রী নম্রভাবে বললেন, "পতির সঙ্গে চললে পথকে দূর মনে হয় না দেব! সাধুসন্তদের সান্নিধ্যই তো জগতের আধার। তাঁরা প্রতিদানের আশা না করেই পরোপকার করেন।"
যমরাজ সাবিত্রীর গভীর জ্ঞানে মোহিত হয়ে বললেন, "হে কল্যাণী, তোমার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বহুগুণ বেড়ে গেল! এবার সত্যবানের প্রাণ ছাড়া শেষ বর চেয়ে নাও।"
সাবিত্রী চতুর ও ধীমান বাক্যে বললেন, "হে ধর্মরাজ! সত্যবানের ঔরসে আমার যেন কুলবর্ধনকারী একশত বলবান পুত্র হয়—আপনি এই বর আমাকে দিন।"
যমরাজ পরম প্রসন্ন হয়ে বললেন, "তথাস্তু! তোমার শত পুত্র হবে, যারা তোমাকে আনন্দ দেবে। এবার ফিরে যাও..."
বর দিয়েই যমরাজ দু-পা হেঁটেছেন, অমনি সাবিত্রী মৃদু হেসে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। "হে দেবেশ্বর! আপনি আমাকে সত্যবানের ঔরসে শত পুত্রের বর দিলেন, অথচ আমার স্বামীকে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছেন! পতি ছাড়া কি দাম্পত্য ধর্ম সম্ভব? স্বামী ছাড়া আমার স্বর্গসুখ, লক্ষ্মী কিংবা জীবন—কোনো কিছুরই প্রয়োজন নেই! আপনার নিজের বাক্য সত্য করতেই সত্যবানকে জীবনদান দিন!"
যমরাজ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তারপর এক মূহুর্ত থেমে হেসে ফেললেন। সাবিত্রীর অনন্য বুদ্ধি, প্রেম ও সততার কাছে মৃত্যুঞ্জয়ী যমরাজ পরাজিত হলেন।
তিনি হাতের পাশ আলগা করে দিয়ে বললেন, "হে কুলনন্দিনী, তুমি জয়ী হলে! আমি তোমার স্বামীকে মুক্ত করলাম। সে নীরোগ হয়ে চারশত বছর বেঁচে থাকবে, প্রজারঞ্জন করবে এবং তোমার গর্ভে শত পুত্রের জন্ম দেবে।"
৫. পুনর্জীবন ও আলোর ভোর
যমরাজ অদৃশ্য হয়ে গেলে সাবিত্রী দ্রুত ফিরে এলেন সেই গাছের নিচে, যেখানে সত্যবানের অচেতন দেহটি পড়ে ছিল। পরম মমতায় পতির মাথাটি আবার নিজের কোলে তুলে নিলেন।
কিছুক্ষণ পরেই সত্যবান দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ মেললেন। যেন দীর্ঘ কোনো গভীর ঘুম থেকে উঠলেন! তিনি সাবিত্রীর দিকে চেয়ে বললেন, "কতক্ষণ ঘুমিয়ে পড়লাম! আর সেই কালো চেহারার লোকটা কোথায় গেল, যে আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল?"
সাবিত্রী আলতো করে পতির মুখ মুছে দিয়ে বললেন, "নাথ, উনি প্রজাপালনকারী স্বয়ং যমরাজ ছিলেন। তিনি এখন চলে গেছেন। দেখুন, চারদিক অন্ধকার হয়ে এসেছে। কাল সব বলব, এখন উঠে দাঁড়ান, আশ্রমে চলুন, মাতা-পিতা আপনার জন্য ব্যাকুল হচ্ছেন।"
সত্যবান চমকে উঠলেন, "হ্যাঁ, সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে! বাবা-মা নিশ্চয়ই কেঁদে আকুল হচ্ছেন!"
সাবিত্রী পরম যত্নে পতিকে ধরে দাঁড় করালেন। জোছনার আলোয় পথ চিনে চিনে দুজনে চললেন আশ্রমে।
ওদিকে আশ্রমে তখন অলৌকিক কাণ্ড ঘটে গেছে। রাজা দ্যুমৎসেন হঠাৎ করেই অলৌকিকভাবে চোখের দৃষ্টি ফিরে পেয়েছেন! কিন্তু পুত্র ফিরে না আসায় অন্ধকারের ভেতর তিনি আর তাঁর পত্নী শৈব্যা হাহাকার করছিলেন। আশ্রমে উপস্থিত গৌতম, সুবর্ণ, দালভ্য প্রমুখ ঋষিগণ দৈবজ্ঞানের শক্তিতে বারবার দ্যুমৎসেনকে আশ্বাস দিচ্ছিলেন, "সাবিত্রীর মতো মহামানবী যার স্ত্রী, সেই সত্যবানের কখনোই অকালমৃত্যু হতে পারে না! তারা জীবিত আছে।"
এমন সময় কুটিরের সামনে এসে দাঁড়ালেন সত্যবান ও সাবিত্রী। আশ্রমজুড়ে আনন্দের রোল উঠল। ঋষিরা জিজ্ঞাসা করলেন, "এত বিলম্ব কেন হলো সত্যবান?"
সত্যবান বললেন বনের মধ্যে তাঁর মাথা ব্যথার কথা। কিন্তু ঋষি গৌতম হেসে বললেন, "সত্যবান, তুমি আসল সত্য জানো না। সাবিত্রী দেবী, তুমি বলো, কী অলৌকিক ঘটনা ঘটে গেছে আজ?"
সাবিত্রী আর গোপন রাখলেন না। বনের মধ্যে যমরাজের আগমন, তর্ক, স্তুতি এবং পাঁচটি বরের কথা বিস্তারিত খুলে বললেন।
আশ্রমের সমস্ত মুনি-ঋষি সাবিত্রীর চরণে প্রণাম জানিয়ে বললেন, "ধন্য তুমি সাবিত্রী! অন্ধকার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়া দুটি কুলকে তুমি আজ নিজের জ্ঞান, ধৈর্য ও প্রেম দিয়ে উদ্ধার করলে!"
পরদিন সকালেই শাল্বদেশ থেকে প্রজারা ও রাজকর্মচারীরা চতুরঙ্গিণী সেনা নিয়ে আশ্রমে হাজির। অত্যাচারী শত্রুরাজা মন্ত্রীর হাতে নিহত হয়েছে, আর প্রজা সাধারণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে দ্যুমৎসেনকেই তারা আবার সিংহাসনে বসাবে। অন্ধ রাজা যে দৃষ্টি ফিরে পেয়েছেন, তা দেখে সবাই আনন্দে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল।
মহারাজ দ্যুমৎসেন সসম্মানে রাজধানীতে ফিরে গিয়ে পুনরায় সিংহাসনে আরোহণ করলেন এবং সত্যবানকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করা হলো।
কালের নিয়মে সাবিত্রীর গর্ভে সত্যবানের শত শূরবীর পুত্র জন্মগ্রহণ করল, আর সাবিত্রীর মা মালবীর গর্ভে জন্ম নিল রাজা অশ্বপতির শত পুত্র।
গল্প শেষ করে ঋষি মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকালেন। যুধিষ্ঠিরের চোখের বিষাদ তখন অনেকটাই কেটে গেছে।
মার্কণ্ডেয় বললেন, "রাজন! সাবিত্রী যেমন তাঁর সততা ও পতিব্রত্য দিয়ে স্বামী ও শ্বশুরকূলকে চরম সংকট থেকে রক্ষা করেছিলেন, তোমার এই দ্রৌপদীও ঠিক তেমনই শুভলক্ষণা। দ্রৌপদীও তোমাদের এই দুঃখের সাগর থেকে উদ্ধার করবেন। বৃথা শোক কোরো না।"
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৬৩তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ৬২তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment