৪৩তম বনপর্ব-ঋষি মার্কণ্ডেয় ও মনুর আশ্চর্য উপাখ্যান বৈবস্বত মনু ও মহামৎস্যের কাহিনি
৪৩তম বনপর্ব-ঋষি মার্কণ্ডেয় ও মনুর আশ্চর্য উপাখ্যান বৈবস্বত মনু ও মহামৎস্যের কাহিনি
পাণ্ডুনন্দন যুধিষ্ঠির মার্কণ্ডেয় মুনির দিকে চেয়ে অত্যন্ত বিনম্র গলায় অনুরোধ করলেন, "মুনিবর, আপনি দয়া করে আমাদের বৈবস্বত মনুর সেই পবিত্র চরিত্রটি বর্ণনা করুন।"
মার্কণ্ডেয় মুনি কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি যেন চিরে চলে গেল মহাকালের গভীরে। বহু কোটি বছর আগের এক নিভৃত, কুয়াশামোড়া সকাল যেন আবার তাঁর চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠল। তিনি বলতে শুরু করলেন।
"রাজন, সে এক আশ্চর্য সময়। বিবস্বান অর্থাৎ সূর্যের এক প্রতাপশালী পুত্র ছিলেন, যাঁর দীপ্তি ছিল স্বয়ং প্রজাপতির মতো। তিনি ছিলেন এক মহান রাজর্ষি। একদিন তিনি সব ছেড়ে বদরিকাশ্রমে গিয়ে দাঁড়ালেন— একপায়ে ভর দিয়ে, দুই হাত স্বর্গের দিকে তুলে। একটানা দশ হাজার বছর ধরে চলল সেই কঠোর তপস্যা। ঝড় এল, বৃষ্টি এল, কিন্তু মনুর শরীর নড়ল না, এক চুল টলল না। এমনই ইস্পাতকঠিন ছিল তাঁর সংকল্প।
একদিন তিনি গিরিণী নদীর তীরে আহ্নিক সারছেন, এমন সময় জলের বুক চিরে ছোট্ট একটি সোনা-রঙা মাছ ভেসে উঠল। অতি করুণ সুরে সে ডেকে বলল, 'মহাত্মন, আমি বড় অসহায়, নিতান্তই এক ক্ষুদ্র মৎস্য। এই নদীর বড় বড় মাছেরা সারাক্ষণ আমাকে খেয়ে ফেলার জন্য তাড়া করে। আমি ভয়ে কাঁপছি, আমাকে আপনি দয়া করে আশ্রয় দিন।'
মনুর বুকের ভেতরটা মায়ায় আর্দ্র হয়ে উঠল। তিনি পরম স্নেহে মাছটিকে অঞ্জলি ভরে তুলে নিয়ে একটি মাটির কলসিতে রাখলেন। নিজের সন্তানের মতোই তার যত্ন নিতে লাগলেন। কিন্তু আশ্চর্য! দিনে দিনে মাছটি এত দ্রুত বাড়তে লাগল যে, মাত্র কয়েকদিনেই কলসির ভেতর তার আর নড়াচড়ার জায়গা রইল না। সে আবার কাঁচুমাচু মুখে মনুর কাছে এসে বলল, 'মহারাজ, আমার যে আর দম বন্ধ হয়ে আসছে! দয়া করে আমাকে একটু বড় কোনো জায়গায় রাখুন।'
মনু তখন তাকে নিয়ে গেলেন এক বিশাল পুষ্করিণীতে— দুই যোজন দীর্ঘ আর এক যোজন চওড়া সেই টলটলে জলের জলাশয়। সেখানেও বহু বছর কেটে গেল। কিন্তু একদিন দেখা গেল, সেই বিশাল পুষ্করিণীও তার বিপুল দেহের কাছে অতি ক্ষুদ্র হয়ে পড়েছে।
মাছটি আবার আকুল হয়ে বলল, 'ভগবান, এবার আমাকে গঙ্গার বহমান জলে ছেড়ে দিন, নয়তো আপনার যা ভালো মনে হয় করুন।' মনু পরম স্নেহে তাকে গঙ্গায় নিয়ে ছাড়লেন। কিন্তু সেখানেও কিছুদিন পর তার দেহ আর ধরে না! শেষে একদিন সে বলল, 'প্রভু, এবার আমাকে নিয়ে চলুন মহাসমুদ্রে, নইলে আমার আর অঙ্গ নাড়ানোর উপায় নেই।' মনু তাকে গঙ্গা থেকে তুলে নীল সমুদ্রের বুকে ছেড়ে দিলেন।
মহাসমুদ্রের নোনা জলে মুক্ত হতেই সেই অদ্ভুত মৎস্যটি খিলখিল করে হেসে উঠল। মানুষের গলায় বলল, 'মনু, তুমি সব বিপদ থেকে আমাকে আগলে রেখেছ। এবার মন দিয়ে আমার কথা শোনো। সামনে এক মহাসংকট। আর কিছুদিনের মধ্যেই এক ভয়ংকর প্রলয় নামবে পৃথিবীতে, সমস্ত জগৎ তলিয়ে যাবে জলের নিচে। তুমি আর দেরি কোরো না, এখনই একটি অত্যন্ত মজবুত নৌকা তৈরি করো। তাতে শক্ত দড়ি বেঁধে, সমস্ত প্রকার শস্য আর ঔষধি গাছের বীজ আলাদা আলাদা করে সংগ্রহ করে নৌকায় তুলে নাও। তারপর সপ্তর্ষিদের সঙ্গে নিয়ে আমার প্রতীক্ষায় বসে থাকবে। সময় এলে আমি মাথায় শিং নিয়ে এক বিশাল মহামৎস্যরূপে তোমার সামনে এসে দাঁড়াব। তখন আমাকে চিনে নিও।'
এই বলে সেই অলৌকিক মৎস্য সমুদ্রের অতলে মিলিয়ে গেল। মনু এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সমস্ত বীজ সংগ্রহ করে সেই নৌকায় উঠলেন। দেখতে দেখতে প্রলয়ের উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ল পৃথিবীতে। চারিদিক অন্ধকার করে জল বাড়তে লাগল। দুলতে দুলতে মনু তখন ব্যাকুল হৃদয়ে সেই মহামৎস্যকে স্মরণ করলেন। ঠিক তখনই সমুদ্রের বুক চিরে শিং মাথায় দিয়ে এসে দাঁড়াল সেই বিশালাকার রূপোলি মাছ। মনু শক্ত দড়ির ফাঁস তার শিঙে বেঁধে দিলেন। মৎস্য তীব্র বেগে সেই নৌকা টেনে নিয়ে চলল উত্তাল তরঙ্গের বুক চিরে।
চারিদিকে তখন শুধু জল আর জল। আকাশ আর মাটির তফাত মুছে গেছে। কোথাও কোনো পাহাড় নেই, গাছ নেই, মানুষ নেই। অনন্ত জলরাশির বুকে ভেসে চলেছে শুধু একটি নৌকা— যাতে রয়েছেন মনু, সপ্তর্ষি আর সেই পথপ্রদর্শক মৎস্য। বহু বছর ধরে সেই মৎস্য সাবধানে নৌকাটিকে টেনে নিয়ে চলল, যতক্ষণ না হিমালয়ের সর্বোচ্চ বরফাবৃত চূড়ার কাছে গিয়ে পৌঁছাল।
সেখানে পৌঁছে মৎস্য বলল, 'দেরি কোরো না, এই হিমগিরির চূড়াতেই নৌকাটিকে শক্ত করে বেঁধে ফেলো।' ঋষিরা তখনই তাই করলেন। আজও হিমালয়ের সেই পবিত্র চূড়াটি 'নৌকাবন্ধন' নামে মানুষের মনে রয়ে গেছে।
এরপর সেই মহামৎস্য তাঁদের সামনে নিজের আসল রূপ প্রকাশ করল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, 'আমি স্বয়ং প্রজাপতি ভগবান ব্রহ্মা, আমার ওপরে আর কেউ নেই। তোমাদের উদ্ধার করতেই আমি মৎস্য রূপ ধারণ করেছিলাম। হে মনু, এবার তোমার কাজ শুরু হবে। তপস্যার বলে শক্তি অর্জন করে তুমি আবার সৃষ্টি করবে দেবতা, অসুর, মানুষ আর চরাচর জগৎ। আমার আশীর্বাদে এই সৃষ্টিযজ্ঞে তুমি কখনও মোহগ্রস্ত হবে না।'
এই বলে মহামৎস্য বাতাসে মিলিয়ে গেল। মনু আবার বসলেন কঠোর তপস্যায়, লাভ করলেন অনন্ত সৃষ্টিক্ষমতা।রাজন যুধিষ্ঠির, এই হলো সেই আদি ও পরম পবিত্র মৎস্য-উপাখ্যান।"
শ্রীকৃষ্ণের মহিমা ও সহস্র-যুগান্তের প্রলয়কথা
মার্কণ্ডেয়ের কথা শেষ হলে যুধিষ্ঠির কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তারপর তাঁর চোখের গভীরে এক অপার বিস্ময় ও জিজ্ঞাসা নিয়ে চেয়ে রইলেন মুনির দিকে।
"হে মহর্ষি," যুধিষ্ঠির বললেন, "আপনি হাজার হাজার যুগ ধরে কত ভাঙাগড়া, কত মহাপ্রলয় দেখেছেন। এই মরজগতে আপনার মতো দীর্ঘায়ু আর কেউ নেই। আপনি পরম পুরুষ নারায়ণের পরম সখা, আপনার মহিমা দেবলোকেও গীত হয়। যোগের অতল শক্তিতে আপনি বহুবার পরমেশ্বরকে দর্শন করেছেন। তাই বার্ধক্য বা মৃত্যু আপনাকে স্পর্শ করতে পারে না। যখন সূর্য, চন্দ্র, বায়ু সব কিছু নিভে যায়, চরাচর গ্রাস করে ঘন অন্ধকার জলরাশি, তখনও আপনি পদ্মপাতায় শুয়ে থাকা ব্রহ্মার পাশে বসে থাকেন ঈশ্বরের নাম জপ করতে করতে। আপনিই তো সমস্ত ইতিহাসের একমাত্র জীবন্ত সাক্ষী। দয়া করে আমাকে সেই মহাপ্রলয় ও পরম সত্যের কথা বলুন।"
মার্কণ্ডেয় মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে জড়ানো হাজার বছরের অভিজ্ঞতা। তিনি পাশে বসে থাকা পীতাম্বরধারী কৃষ্ণের দিকে একবার তাকালেন, তারপর বললেন—
"রাজন, সৃষ্টির আদিপুরুষকে প্রণাম জানিয়ে বলছি। এই যে আমাদের পাশে বসে আছেন যদুশ্রেষ্ঠ জনার্দন— ইনিই এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি আর প্রলয়ের আদি কারণ। ইনি পরম পবিত্র, মানুষের চিন্তার অতীত এক রহস্য। কিন্তু হায়! বেদও এঁকে সম্পূর্ণ চেনেনি। প্রলয়ের পর এই আদিপুরুষ থেকেই আবার রূপকথার মতো নতুন পৃথিবী জেগে ওঠে।
যুগের পরিমাপ শুনো রাজন। চার হাজার দিব্যবছরে এক সত্যযুগ হয়, তার সন্ধ্যা আর সন্ধ্যাংশ মিলিয়ে আরও চারশো বছর। মোট আটচল্লিশশো দিব্যবছরে সম্পূর্ণ হয় সত্যযুগ। ত্রেতাযুগ হয় ছত্রিশশো বছর, দ্বাপর চব্বিশশো বছর। এইভাবে বারো হাজার দিব্যবছরে তৈরি হয় একটি চতুর্যুগ। আর এক হাজার চতুর্যুগ মিলে হয় ব্রহ্মার মাত্র একটি দিন! এই একদিন জুড়েই টিকে থাকে সৃষ্টি। তারপর ব্রহ্মার রাত নেমে এলে সব কিছু বিলীন হয়ে যায় প্রলয়ের অতলে।
কলিযুগের শেষভাগে এসে মানুষ তার নিজের ধর্ম হারিয়ে ফেলে। চারিদিকে শুধু মিথ্যা আর ভণ্ডামির জয়জয়কার। ব্রাহ্মণ করে শূদ্রের কাজ, আর শূদ্র বসে ব্রাহ্মণের আসনে। যজ্ঞ বন্ধ হয়ে যায়, মানুষের মুখে কোনো অখাদ্যের বিচার থাকে না। নীতিহীন, লোভী শাসকেরা সিংহাসনে বসে প্রজাদের রক্ত চুষে খায়। মানুষের আয়ু ও শারীরিক গড়ন ছোট হয়ে আসে। বসন্তের গাছে আর ফুল ফোটে না, সুন্দর পাখিরা দেশ ছেড়ে পালায়, শুধু কাক আর চিল এসে বাসা বাঁধে ঘরের কোণে।
ব্রাহ্মণেরা লোভের বশে পাপীদের কাছ থেকে দান গ্রহণ করে, গৃহস্থরা অন্যায়ের পথ ধরে টাকা উপার্জনের নেশায় মত্ত হয়। সময়মতো বৃষ্টি পড়ে না, মাটিতে বীজ বুনলেও ফসল ফলে না। নারীরা স্বামীদের প্রতারণা করতে শুরু করে।
এইভাবে যখন সহস্র যুগ পূর্ণ হয়, তখন আকাশে আর মেঘের দেখা মেলে না। বছরের পর বছর খরায় জ্বলতে থাকে মাটি। তৃষ্ণায়, ক্ষুধায় ছটফট করে মারা যায় কোটি কোটি প্রাণী। তারপর সূর্যের তেজ এত গুণ বেড়ে যায় যে, নদী, দীঘি, মহাসমুদ্রের জল চোখের পলকে বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। চারিদিক শুধু দাউদাউ আগুন। 'সংবর্তক' নামের এক প্রলয়াগ্নি প্রচণ্ড বাতাসে ভর করে মাটির বুক চিরে পাতাল পর্যন্ত পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। দেবতা, দানব, যক্ষ— সবাই ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে।
এরপর হঠাৎ করেই আকাশ জুড়ে কালো মেঘের পাহাড় জমে। গর্জন করে, বিদ্যুতের চাবুক মেরে শুরু হয় এক অবিরাম মহাপ্লাবন। একটানা বারো বছর ধরে চলে সেই ধারা শ্রাবণ। সমুদ্র তার সীমানা লঙ্ঘন করে ধেয়ে আসে স্থলভাগের দিকে। হিমালয়ের পাথর ফাটিয়ে জল গ্রাস করে নেয় সব কিছু। চারপাশ শান্ত হলে, ব্রহ্মা সেই প্রলয়-বাতাসকে নিজের নিঃশ্বাসে টেনে নিয়ে শয়ন করেন একার্ণবের অনন্ত জলে। দেবতা, অসুর, মানুষ বলতে আর কেউ বেঁচে থাকে না। শুধু আমি একা, সেই অতল কালো জলের উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে ভেসে বেড়াই এদিক থেকে ওদিকে।"
মার্কণ্ডেয়ের বালমুকুন্দ দর্শন
মার্কণ্ডেয় খানিকক্ষণের জন্য চোখ বুজলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর এবার আরও নরম, আরও মায়াময় হয়ে উঠল।
"যুধিষ্ঠির, ভাবো সেই দৃশ্য! চারদিকে শুধুই অন্তহীন অন্ধকার আর প্রলয়-বারি। আমি একা ক্লান্ত শরীরে সাঁতরে চলেছি, কোথাও একটু আশ্রয়ের চিহ্ন নেই। হঠাৎ সেই আদিহীন-অন্তহীন জলের বুকে আমার চোখে পড়ল এক বিশাল, সবুজ বটগাছ। আর সেই গাছের একটি কচি পাতার ওপরে শুয়ে রয়েছে এক নবজাতক শিশু। আহা, কী তার রূপ! গায়ের রঙ অতসী ফুলের মতো নীলচে-শ্যামল, টানা টানা চোখ দুটি যেন পদ্মের পাপড়ি, বুকে জ্বলজ্বল করছে শ্রীধামের চিহ্ন।
আমি থমকে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যখন ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন এই প্রলয়-সমুদ্রে এই অলৌকিক শিশু কোত্থেকে এল? আমি ত্রিকালজ্ঞ ঋষি, অথচ আমার সমস্ত জ্ঞান দিয়েও এই শিশুকে চিনতে পারলাম না।
ঠিক তখনই সেই শিশুটির ঠোঁটে ফুটে উঠল এক স্বর্গীয় হাসি। অতি মধুর, অমৃতের মতো কণ্ঠে সে আমাকে ডেকে বলল, 'মার্কণ্ডেয়, আমি জানি তুমি বড্ড ক্লান্ত। বহুকাল ধরে ভেসে বেড়াচ্ছ এই জলে। এসো, আমার ভেতরে এসে একটু বিশ্রাম নাও।'
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সেই শিশুর এক গভীর প্রশ্বাসের টানে ধুলোবালির মতো উড়ে গিয়ে সোজা তার মুখের ভেতর দিয়ে তার পেটে প্রবেশ করলাম!
আর ভেতরে ঢুকতেই আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল রাজন! এ কোন মায়া! সেই ছোট্ট শিশুর পেটের ভেতর লুকিয়ে রয়েছে এক আস্ত মহাবিশ্ব! আমি দেখলাম সুন্দর সুন্দর শহর, গ্রাম, জনপদ। বহমান গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, সিন্ধু, নর্মদা আর কাবেরী নদী। রত্নভরা সমুদ্র, আকাশে মেঘের আড়ালে হাসছে সূর্য আর চাঁদ। সেখানে মানুষেরা মনের আনন্দে বর্ণাশ্রম মেনে নিজের নিজের কাজ করছে— ব্রাহ্মণেরা হোম করছেন, ক্ষত্রিয় রাজারা পরম যত্নে প্রজা পালন করছেন, চাষীরা মাঠে ফসল ফলাচ্ছে।
আমি অবাক হয়ে ঘুরতে লাগলাম সেই অলৌকিক উদরে। দেখতে পেলাম হিমালয়, গন্ধমাদন, বিন্ধ্যাচল, মেরু পর্বত। দেখলাম স্বর্গের দেবতাদের, গন্ধর্বদের, যক্ষদের। এই বাইরে যা কিছু আছে, তার সবটাই সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো রয়েছে সেই শিশুর পেটের ভেতর! আমি সেই জগতের মিষ্টি ফল খেয়ে খেয়ে প্রায় একশো বছর ধরে ঘুরে বেড়ালাম, কিন্তু তাঁর দেহের কোনো শেষ সীমানা খুঁজে পেলাম না।
অবশেষে ক্লান্ত হয়ে আমি মনে-প্রাণে সেই অলৌকিক শিশুর শরণ নিলাম। তখনই এক ঝলক দমকা বাতাসের মতো সেই শিশুটি মুখ খুলল, আর আমি ফুসফুসের বাতাস ছাড়ার মতো তার মুখ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
বাইরে এসে দেখি, আগের মতোই সেই অনন্ত কালো জলরাশির বুকে বটপাতায় শুয়ে হাসছে সেই মায়াবী শিশু। সে আমাকে চিবুক ছুঁয়ে বলল, 'কী মার্কণ্ডেয়, ভেতরে তোমার ক্লান্তি দূর হলো তো?'
আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। আমার অহংকার চূর্ণ হয়ে গেল। আমি পরম ভক্তিতে সেই শিশুর লালচে দুটি চরণে মাথা রেখে লুটিয়ে পড়লাম। বিনীত স্বরে জিজ্ঞেস করলাম, 'প্রভু, কে আপনি? এই শিশু রূপেই বা কেন অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড উদরে নিয়ে ভেসে আছেন?'
সেই পরমেশ্বর তখন মৃদু হেসে বললেন, 'হে বিপ্রবর, দেবতারাও আমার আসল স্বরূপ জানে না। তুমি আমার শরণ নিয়েছ, তাই তোমাকে বলছি— সৃষ্টির শুরুতে এই জলের নাম ছিল "নারা", আর সেই জলে আমার অয়ন অর্থাৎ আশ্রয় বলে আমিই হলেম "নারায়ণ"। আমিই সৃষ্টি, আমিই স্থিতি, আবার আমিই সংহার। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, ইন্দ্র, কুবের— সব আমারই প্রকাশ। অগ্নি আমার মুখ, পৃথিবী আমার চরণ, সূর্য-চন্দ্র আমার দুটি চোখ। যখনই পৃথিবীতে ধর্মের গ্লানি ঘটে, অধর্মের জয়জয়কার হয়, তখনই আমি নানা রূপে অবতীর্ণ হই। সত্যযুগে আমার গায়ের রঙ ছিল শ্বেত, ত্রেতায় হলুদ, দ্বাপরে রক্তবর্ণ আর কলিযুগে কৃষ্ণ। এই প্রলয়কালে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে নিজের শরীরে গুটিয়ে নিয়ে আমি এখানে একা শুয়ে থাকি, যতক্ষণ না ব্রহ্মা তাঁর নিদ্রা থেকে জেগে ওঠেন। ব্রহ্মা জেগে উঠলে আবার নতুন করে সৃষ্টি শুরু হবে। তুমি নিশ্চিন্তে এই জলের ওপর বিচরণ করো।'
এই বলে সেই অলৌকিক বালমুকুন্দ আমার চোখের সামনেই শূন্যে মিলিয়ে গেলেন। হে পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির, সহস্র যুগের অন্তে আমি যাঁর সেই বিশ্বরূপ দর্শন করেছিলাম, আজ তোমাদের পরম সৌভাগ্য যে, সেই আদিপুরুষ স্বয়ং তোমাদের আত্মীয় রূপে, তোমাদের সারথি রূপে এখানে বসে আছেন। এই শ্রীকৃষ্ণই হলেন সেই নারায়ণ! তোমরা ওঁর শরণ নাও, উনিই জগতের একমাত্র আশ্রয়।"
মার্কণ্ডেয় মুনির এই আবেগঘন কথা শেষ হওয়ার পর গোটা সভায় এক অপার্থিব নীরবতা নেমে এল। যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব আর দ্রৌপদী— সবাই মিলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকালেন কৃষ্ণের দিকে। তারপর গভীর ভক্তিতে নত মস্তকে প্রণাম জানালেন সেই অনন্ত শ্রীকৃষ্ণকে। কৃষ্ণও অতি সস্নেহে হাসিমুখে তাঁদের দিকে হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৪৩তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ৪২তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment