৬৪তম বনপর্ব- দানবীরের মহামানবীয় কর্ণের জেদ
৬৪তম বনপর্ব- দানবীরের মহামানবীয় কর্ণের জেদ
দ্বাদশ বছরের দীর্ঘ বনবাসের প্রহর শেষ হয়ে তখন ত্রয়োদশ বর্ষের সূচনা ঘটছে। পাণ্ডবদের ভবিষ্যৎ বিজয়ের পথ সুগম করতে দেবরাজ ইন্দ্র মনে মনে এক অমোঘ চক্রান্ত রচনা করলেন—যেমন করেই হোক, কর্ণের দেহ থেকে তাঁর জন্মসূত্রে প্রাপ্ত অভেদ্য কবচ ও কুণ্ডল হরণ করতে হবে। কিন্তু মহাবিশ্বের পিতা কি সন্তানের এই আসন্ন বিপদের কথা জেনেও নীরব থাকতে পারেন? দেবরাজ ইন্দ্রের এই গোপন অভিপ্রায়ের কথা জানতে পেরে সূর্যদেবের বুক পিতা স্নেহে আকুল হয়ে উঠল। তিনি স্থির করলেন, পুত্রকে এই সর্বনাশা দানব্রত থেকে রক্ষা করতেই হবে।
রাতের নিস্তব্ধতা তখন বিশ্বচরাচরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সত্যবাদী ও ব্রাহ্মণসেবক বীর কর্ণ নিশ্চিন্ত মনে এক সুন্দর শয্যায় সুষুপ্তিতে নিমগ্ন। এমন সময় স্বপ্নের এক অলৌকিক কুয়াশা ফুঁড়ে কর্ণের শয্যাপাশে এসে দাঁড়ালেন এক তেজস্বী বেদবিদ ব্রাহ্মণ। তাঁর চোখে-মুখে করুণা আর আশঙ্কার আলো-ছায়া।
সেই ব্রাহ্মণবেশী সূর্যদেব পরম মমতায় ঘুমন্ত কর্ণের উদ্দেশ্যে বললেন—"হে সত্যবাদী শ্রেষ্ঠ মহাবাহু কর্ণ! পিতা যেমন পুত্রের হিতচিন্তায় আকুল হয়, আমিও তেমনই এক পরম সত্য তোমাকে জানাতে এসেছি। শোনো, পাণ্ডবদের উপকার সাধনের জন্য দেবরাজ ইন্দ্র ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে তোমার দ্বারে আসবেন। তোমার স্বভাবের কথা তাঁর অজানা নয়, সমস্ত জগৎ জানে তোমার ওই কঠোর ব্রতের নিয়ম—কোনো সৎ ব্যক্তি তোমার কাছে প্রার্থনা করলে তুমি তাকে কখনো রিক্তহাতে ফেরাও না, অথচ নিজে কখনো কারও কাছে কিছু চাও না। কিন্তু কর্ণ, এই নিঃশব্দ উদারতাই আজ তোমার কাল হতে চলেছে..."
ব্রাহ্মণের কণ্ঠস্বরে ফুটে উঠল তীব্র সতর্কবার্তা—"যদি তুমি তোমার এই সহজাত দিব্য কবচ ও কুণ্ডল দান করে দাও, তবে তোমার ক্ষণস্থায়ী জীবনের আয়ুরেখা অতি দ্রুত ক্ষীণ হয়ে আসবে, মৃত্যুর অধিকার এসে বর্তাবে তোমার ওপর। তুমি জেনে রাখো, যতক্ষণ এই রত্নখচিত কবচ-কুণ্ডল তোমার গায়ে থাকবে, কোনো শত্রু—চাই সে দেব কিংবা দানব হোক—তোমাকে যুদ্ধে বধ করতে পারবে না। এ কোনো সাধারণ অলঙ্কার নয়, এ যে অমৃত হতে উৎপন্ন! তাই যদি জীবন তোমার প্রিয় হয়, তবে সর্বস্ব দিয়ে একে রক্ষা করো।"
স্বপ্নের ঘোরেই কর্ণ ধীরে ধীরে চোখ মেললেন। সশ্রদ্ধ সংশয়ে শুধালেন—"ভগবান! আমার প্রতি এমন অসীম স্নেহ বর্ষণ করে আমাকে উপদেশ দিচ্ছেন, কৃপা করে বলুন—ব্রাহ্মণবেশে আপনি কে?"
ব্রাহ্মণ তখন তাঁর ছদ্মবেশ কাটিয়ে নিজের অলৌকিক রূপ সামান্য প্রকাশ করে বললেন—"হে পুত্র! আমি সূর্য। স্নেহবশতই তোমাকে এই গুহ্য উপদেশ দিলাম। আমার কথা শোনো, এতেই তোমার পরম কল্যাণ হবে।"
কিন্তু কর্ণের মুখে ফুটে উঠল না কোনো ভয়ের ছাপ; বরং এক অদ্ভুত, অভিমানী ও উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে পড়ল তাঁর চেহারায়। তিনি বিনম্র কণ্ঠে বললেন—"ভগবান ভাস্কর! আপনি স্বয়ং যখন আমার হিতের জন্য নেমে এসেছেন, তখন আমার পরম কল্যাণ তো সুনিশ্চিত। কিন্তু দেব, আপনি বরদাতা দেবতা, আপনার কাছে আমার আকুল নিবেদন—আমাকে ভালোবেসে থাকলে আমাকে আমার ব্রত থেকে বিচ্যুত করবেন না। ত্রিলোক জানে, শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ যদি আমার দ্বারে এসে আমার প্রাণও ভিক্ষা চান, আমি তা-ও সানন্দে দান করতে পারি। দেবরাজ ইন্দ্র যদি পাণ্ডবদের হিতে ব্রাহ্মণের বেশে আসেন, তবে আমি অবশ্যই আমার এই দিব্য কবচ-কুণ্ডল তাঁর হাতে তুলে দেব। রক্তমাংসের এই ক্ষণভঙ্গুর শরীরের চেয়ে আমার কাছে যশের মূল্য অনেক বেশি। জগতে যশের অমরত্ব লাভ করে মরাই তো শ্রেষ্ঠ, কালিমালিপ্ত দীর্ঘ জীবনের কী বা অর্থ থাকতে পারে?"
বি:দ্র: কর্ণ- কবচধারী সেই কিশোরের জন্ম কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন
সূর্যদেব বুঝলেন, কর্ণের এই মহানুভবতা ও মহাজাগতিক জেদকে বদলানো অসম্ভব। তিনি আকুল হয়ে বললেন—"কর্ণ! তুমি দেবতাদের গোপন চক্রান্তের কথা জানো না। এর নেপথ্যে যে অলৌকিক রহস্য আছে, তা আমি তোমাকে এখনই জানাব না, সময় এলেই সব বুঝতে পারবে। কিন্তু আবার বলছি, চাইলেও তুমি ইন্দ্রকে ও দুটি জিনিস দিয়ো না। ওই কুণ্ডল কানে থাকা অবস্থায় অর্জুন তো দূর, স্বয়ং ইন্দ্রও তোমাকে পরাস্ত করতে পারবে না। অর্জুনকে পরাজিত করতে চাইলে এ দুটি বস্তু রক্ষা করতেই হবে।"
কর্ণ অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে বললেন—"সূর্যদেব, আপনার প্রতি আমার ভক্তি কতখানি তা আপনার অজানা নয়। আমার স্ত্রী, পুত্র, সুহৃদ কিংবা এই নিজের শরীরের চেয়েও আপনি আমার বেশি প্রিয়। কিন্তু একজন বীরের কাছে তাঁর ব্রতই পরম ধর্ম। আপনি যা বললেন, তার জন্য আপনাকে কোটি প্রণাম। দয়া করে আমার অপরাধ মার্জনা করুন এবং আশীর্বাদ করুন, যেন ইন্দ্র চাইলে আমি নিঃসংকোচে তাঁকে আমার প্রাণও দান করতে পারি।"
সূর্যদেব এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পুত্রের এই মহামানবীয় জেদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এক নতুন কৌশল বাতলে দিলেন—"তবে শোনো কর্ণ, তুমি যদি তা দানই করে দাও, তবে নিজের বিজয়ের জন্য ইন্দ্রের কাছ থেকে বিনিময় চেয়ে নিও। বোলো—'দেবরাজ! আপনি আমাকে আপনার শত্রুসসংহারকারী অমোঘ শক্তি প্রদান করুন, তবেই আমি কবচ-কুণ্ডল দেব।' মনে রেখো, ইন্দ্রের এই 'বাসবী শক্তি' অত্যন্ত প্রবল। শত্রুকে সম্পূর্ণ বিনাশ না করা পর্যন্ত তা নিক্ষেপকারীর কাছে ফিরে আসে না।"
কথাগুলি শেষ করেই ভাস্কর অন্তর্হিত হলেন।
পরদিন প্রভাতে স্নান ও জপ সমাপ্ত হওয়ার পর কর্ণ পরম ভক্তিতে সূর্যদেবের ধ্যান করলেন। ধ্যানে সূর্যদেব মৃদু হেসে নিশ্চিত করলেন—রাতের সেই দৃশ্য কোনো অর্থহীন স্বপ্ন ছিল না, এক মহাজাগতিক সত্য। কর্ণও বুঝতে পারলেন, নিয়তি তাঁর দরজায় কড়া নাড়ছে। মৃত্যুর বিনিময়ে যশের অমরত্ব কিনে নিতে এবং দেবরাজের থেকে সেই অমোঘ শক্তি লাভ করতে দানবীর কর্ণ শান্ত ও দৃঢ়চিত্তে ইন্দ্রের প্রতীক্ষা করতে লাগলেন।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৬৪তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ৬৩তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment