৩০তম বন পর্ব-গন্ধমাদনের মহাপ্রস্থান: বরফের চাদরে অর্জুনের খোঁজ
৩০তম বন পর্ব-গন্ধমাদনের মহাপ্রস্থান: বরফের চাদরে অর্জুনের খোঁজ
লোমশ মুনির কণ্ঠস্বর শান্ত, অথচ তার ভেতরে একটা তীক্ষ্ণ প্রজ্ঞা খেলা করে যায়। তিনি হাত বাড়িয়ে দেখালেন, "রাজন, ঐ যে জলধারা দেখছ, ওটাই মধুবিলা— লোকে তাকে সমঙ্গাও বলে। এই কর্দামিল ক্ষেত্রে একদিন রাজা ভরত অভিষিক্ত হয়েছিলেন। বৃত্রাসুরকে বধ করার পর দেবরাজ ইন্দ্র যখন ব্রহ্মহত্যার পাপে সিংহাসনচ্যুত আর শ্রীহীন হয়ে পড়েছিলেন, ( বৃত্রাসুর বধের কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন) তখন এই সমঙ্গার জলেই স্নান করে তিনি পবিত্র হন। আর ঐ যে দূরে কুয়াশায় ঘেরা পর্বতমালা, ওটাই কনখল— ঋষিদের বড় প্রিয় স্থান। মৈনাক পর্বতের ঠিক মাঝখানটিতে রয়েছে বিনশন তীর্থ। তাকিয়ে দ্যাখ যুধিষ্ঠির, কাছেই বয়ে চলেছে সুরধুনী গঙ্গা। বহু প্রাচীন কালে এই পুণ্যভূমিতেই ভগবান সনৎ কুমার সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। এখানে একটিবার ডুব দিলে মানুষের সব কলুষ ধুয়ে যায়।"
মুনি থামলেন না। প্রকৃতির এই আদিম রূপের খতিয়ান দিতে দিতে তিনি আবার বললেন, "এর পরেই পাবে পুণ্য সরোবর আর ভৃগুাতুঙ্গ পর্বত। সেখানে স্নান সেরে নেবে। তবে মনে রেখ রাজন, সামনেই স্থলশিবা মুনির আশ্রম। সেখানে পা রাখার আগে মন থেকে সমস্ত অহংকার আর ক্রোধ বিসর্জন দিতে হবে। একটু এগোলেই দেখতে পাবে ঋষি রৈভার আশ্রম— সেখানে বারো মাস গাছে গাছে ফুল আর ফল ঝুলে থাকে। ওখানকার বাতাসও মানুষের পাপ হরণ করে।"
পথ ক্রমশ খাড়া হচ্ছে। মেঘেদের ঘরবাড়ির ভেতর দিয়ে চলতে চলতে লোমশ মুনি সতর্ক করলেন, "রাজন, তুমি ইতিমধ্যেই শুনীরবীজ, মৈনাক, শ্বেত আর কাল পর্বত পার হয়ে এসেছ। এবার যেখানে আমরা পৌঁছাচ্ছি, সেখানে যুগ যুগ ধরে এক অলৌকিক আগুন জ্বলছে— সাধারণ মানুষের চোখে তা পড়ে না। এখানে ভাগীরথী সপ্তধারায় নেমে এসেছেন। বড় পবিত্র, বড় নির্মল এই স্থান। শান্ত হয়ে একটু সমাধিতে বসো, তবেই এই তীর্থের মহিমা অনুভব করতে পারবে। আমাদের আসল গন্তব্য কিন্তু মন্দরাচল। যেখানে যক্ষরাজ কুবের আর মণিভদ্রের বাস।"
একটু দম নিয়ে মুনি যুধিষ্ঠিরের চোখের দিকে চাইলেন, "সেই পর্বত বড় দুর্গম। অষ্টাশি হাজার যক্ষ মণিভদ্রের সেবায় সদা জাগ্রত। গন্ধর্ব, কিন্নর আর রূপবদলকারী রাক্ষসেরা বায়ুর গতিতে সেখানে পাহারা দেয়। কুবেরের সহচর মৈত্র নামের এক ভয়ঙ্কর রাক্ষসের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। আর কৈলাস? সে তো ছ-যোজন উঁচু! তার ওপরেই দেবতাদের প্রিয় বদরিকাশ্রম। যুধিষ্ঠির, আমার তপস্যার তেজ আর ভীমের বাহুবলকে ভরসা করে তুমি এই তীর্থে অবগাহন করো। শোনো, পাহাড় ফুঁড়ে গঙ্গার আছড়ে পড়ার শব্দ পাচ্ছ? হে দেবী গঙ্গে, তুমি এই ধর্মরাজকে রক্ষা করো!"
মুনিদেবের কথা শুনে যুধিষ্ঠিরের মনে গভীর সংশয় আর দুশ্চিন্তার মেঘ ঘনিয়ে এল। তিনি ভাইদের ডেকে বললেন, "মহর্ষি লোমশ যে বর্ণনা দিলেন, তাতে স্পষ্ট এই পথ অত্যন্ত বিপজ্জনক। তোমরা সবাই দ্রৌপদীকে আগলে রাখো। এখানে শরীর আর মনকে সংযত রাখা দরকার। কিন্তু ভাবছি, দ্রৌপদীকে নিয়ে এই দুর্গম চড়াই আমরা কীভাবে ভাঙবো? তার চেয়ে বরং এক কাজ হোক— শোন সহদেব- পুরোহিত ধৌম্য, অন্যান্য ব্রাহ্মণরা, আমি, নকুল আর লোমশ মুনি পাহাড়ে উঠি। আর ভীম, তোমরা সবাই দ্রৌপদীকে নিয়ে এই হরিদ্বারের সমতলে সাবধানে অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আমরা ফিরে আসি।"
যুধিষ্ঠিরের কথা শেষ হতে না হতেই ভীমের বিশাল বুক অভিমানে আর আত্মবিশ্বাসে ফুলে উঠল। সে তীব্র প্রতিবাদ করে বলল, "রাজন! এই পাহাড় রাক্ষস-দানবে ভরা, পথ অসমতল আর দুর্গম— তা আমি জানি। কিন্তু দ্রৌপদী আপনাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকবে না, আর সহদেবও আপনার ছায়া হয়ে থাকতে চায়। আমি ওদের মনের কথা খুব ভালো করেই জানি, ওরা কেউ পিছিয়ে থাকবে না। তাছাড়া, অর্জুনকে দেখার জন্য আমাদের সবার বুক ফেটে যাচ্ছে— পাঁচ বছর কেটে গেল! তাই সবাই আপনার সঙ্গেই যাবে। যদি গুহার কারণে রথ না চলে, তবে পায়ে হেঁটে যাব। আপনি চিন্তা করবেন না। যেসব জায়গায় দ্রৌপদী হাঁটতে পারবে না, আমি তাকে নিজের কাঁধে তুলে নেব। আর মাদ্রীপুত্র নকুল-সহদেব তো এখনও বালক, সুকুমার তরুণ— ওরা যদি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ওদেরও আমি পার করে দেব!"
ভীমের এই অটল ভ্রাতৃপ্রেম আর সাহস দেখে যুধিষ্ঠিরের চোখ ভিজে এল। তিনি আর্দ্র গলায় বললেন, "ভাই ভীম, তুমি যে দ্রৌপদী আর নকুল-সহদেবকে এভাবে আগলে নিয়ে যাওয়ার সাহস দেখাচ্ছ, এতে আমার বুক জুড়িয়ে গেল। অন্য কারোর পক্ষে এমন ভাবাও অসম্ভব। তোমার কল্যাণ হোক ভাই, তোমার বল, ধর্ম আর সুযশ আরও বৃদ্ধি পাক।"
পাশে দাঁড়িয়ে দ্রৌপদীও মৃদু হাসলেন, যেন সব ক্লান্তি মুছে গেল সেই হাসিতে। তিনি বললেন, "রাজন, আমি আপনার সঙ্গেই যাব। আমার জন্য বিন্দুমাত্র উদ্বেগ রাখবেন না।"
তখন লোমশ ঋষি তাঁদের আশ্বস্ত করে বললেন, "কুন্তীনন্দন, মনে রেখ— এই গন্ধমাদন পর্বতে কেবল পায়ের জোরে ওঠা যায় না, এর জন্য প্রয়োজন তপস্যার শক্তি। এসো, আমরা সবাই মনে মনে জপ করি। তপস্যার পুণ্যেই আমরা আবার অর্জুনের দেখা পাব।"
কথা বলতে বলতেই তাঁরা এসে পৌঁছালেন রাজা সুবাহুর রাজ্যে। চারদিকে হাতি-ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি, কিরাত আর পুলিন্দ জাতির মানুষের কলরব। পাণ্ডবদের আগমনের খবর পেয়ে পুলিন্দরাজ নিজে ছুটে এলেন, পরম সমাদরে তাঁদের আতিথ্য দিলেন। সেই রাতটা রাজার প্রাসাদে কাটিয়ে, পরদিন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে পাণ্ডবরা রওনা হলেন বরফের পাহাড়ের দিকে। রথ, সারথি ইন্দ্রসেন, সমস্ত রাঁধুনি আর দ্রৌপদীর ভারী জিনিসপত্র পুলিন্দরাজের জিম্মায় রেখে তাঁরা সম্পূর্ণ পদব্রজে যাত্রা শুরু করলেন।
হাঁটতে হাঁটতে যুধিষ্ঠিরের মন আবার ব্যাকুল হয়ে উঠল। তিনি ভীমের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "ভীম, শুধু অর্জুনকে দেখার আশায় আজ পাঁচটা বছর ধরে তোমাদের নিয়ে কত নদী, বন, সরোবর ঘুরে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সেই সত্যসন্ধ, বীর ধনঞ্জয়কে এখনও চোখে দেখতে পেলাম না— এই দুঃখ বুকে পাথর হয়ে বসে আছে। অর্জুনের গুণের কথা আর কী বলব! অতি সাধারণ মানুষও যদি ওকে অপমান করে, ও হাসিমুখে ক্ষমা করে দেয়। সরল মানুষদের ও আশ্রয় দেয়, অভয় দেয়। কিন্তু কেউ যদি ছলনা করে ওর সামনে দাঁড়ায়, সে স্বয়ং ইন্দ্র হলেও রেহাই পাবে না। শরণাগতের প্রতি শত্রুর চেয়েও উদার ও। আমাদের সবার একমাত্র ভরসা তো ও-ই। তারই বাহুবলে আমরা সেই ত্রিলোকবিখ্যাত ময়সভা পেয়েছিলাম। আজ তাকে দেখার জন্যই এই গন্ধমাদনে ওঠা। কিন্তু মনে রেখ ভীম, কোনো লোভী, ক্রূর বা অশান্ত মনের মানুষ এখানে পা দিতে পারে না। অসংযমীদের এই পাহাড়ে বাঘ, সাপ আর বিষাক্ত পোকারা কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে। কিন্তু সংযমীদের তারা ছোঁয় না। তাই আমাদের খুব মিতাহারী আর শান্ত হয়ে এগোতে হবে।"
কিছুদূর যেতেই কানের পর্দায় ভেসে এল এক গুরুগম্ভীর জলতরঙ্গের শব্দ। লোমশ মুনি বললেন, "হে সৌম্য, এই সেই শীতল, পবিত্র অলকানন্দা নদী। বদরিকাশ্রম থেকে এর জন্ম। দেবর্ষিরা এর জল পান করেন, আকাশচারী বালখিল্য মুনি আর গন্ধর্বরা এর তীরে খেলা করেন। মরিচী, পুলহ, ভৃগু, অঙ্গিরার মতো ঋষিরা এখানে সামগান করেন। এই সেই নদী, যা গঙ্গাদ্বারে স্বয়ং মহাদেব তাঁর জটায় ধারণ করেছিলেন। তোমরা ভক্তিভরে এই ভগবতী ভাগীরথীকে প্রণাম করো।"
মুনিবরের কথায় পাণ্ডবরা পরম শান্তিতে অলকানন্দার জলে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন এবং এক অদ্ভুত চাঙ্গা মনে ঋষিদের সাথে আবার পা বাড়ালেন।
পথের এক জায়গায় এসে দেখা গেল এক বিশাল শ্বেতশুভ্র স্তূপ, ঠিক যেন কৈলাসের একটা টুকরো বরফ হয়ে জমে আছে। লোমশ মুনি সেদিকে আঙুল তুলে বললেন, "যুধিষ্ঠির, ঐ যে পাহাড়ের মতো সাদা স্তূপ দেখছ, ওটা কোনো পাথর নয়— ওটা নরকাসুরের হাড়ের পাহাড়। পূর্বকালে দেবরাজ ইন্দ্রের হিতের জন্য ভগবান বিষ্ণু এই দৈত্যকে বধ করেছিলেন। এই নরকাসুর দশ হাজার বছর ধরে কঠোর তপস্যা করে ইন্দ্রের আসন কেড়ে নিতে চেয়েছিল। নিজের তপবল আর বাহুবলে সে দেবতাদের ধরাকে সরা জ্ঞান করত। অতিষ্ঠ হয়ে দেবরাজ যখন বিষ্ণুর শরণ নিলেন, তখন ভগবান বিষ্ণু দেবরাজকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন, 'ইন্দ্র, ভয় পেও না। ও যতই তপস্যা করুক, ওর পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছে। আমি ওকে শীঘ্রই বধ করব।' এরপর ভগবান এক চপটাঘাতে— হ্যাঁ, মাত্র এক চড়ে সেই মহাবলশালী অসুরের প্রাণ হরণ করেন। পাহাড়ের মতো বিশাল সেই দেহটা ছিটকে পড়েছিল এখানে। তারই অস্থির স্তূপ এটি।"
মুনি একটু হেসে আবার বলতে শুরু করলেন, "ভগবান বিষ্ণুর আর একটি লীলাও এই ভূমির সাথে জড়িয়ে আছে। সত্যযুগে আদিদেব শ্রীনারায়ণ যখন যমের কাজ করতেন, তখন পৃথিবীতে কোনো মৃত্যু ছিল না। ফলে জীবের সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে, পৃথিবী সেই ভার সইতে পারলেন না। শত যোজন জলের নিচে তলিয়ে যেতে যেতে ধরিত্রী দেবী নারায়ণের কাছে প্রার্থনা করলেন, 'প্রভু, আমি আর এই ভার বইতে পারছি না। রক্ষা করো।' পৃথিবী দেবীর কাতর আর্তিতে ভগবান বরাহ রূপ ধারণ করলেন— এক শৃঙ্গবিশিষ্ট এক বিশাল যজ্ঞবরাহ। তারপর শত যোজন জলের নিচে নেমে নিজের দাঁতের ডগায় পৃথিবীকে তুলে এনে আবার জলের ওপরে স্থাপন করলেন।"
লোমশ মুনির মুখে ভগবানের এই সব অদ্ভুত ও অলৌকিক মহিমার কথা শুনতে শুনতে পাণ্ডবদের মনের সব ক্লান্তি কর্পূরের মতো উড়ে গেল। এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ আর আনন্দ বুকে নিয়ে, তাঁরা মুনির দেখানো পথ ধরে গন্ধমাদনের চড়াই বেয়ে দ্রুত এগিয়ে চললেন।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৩০তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ২৯তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment