৪২তম বনপর্ব- মৃত্যুর ওপারে মহাজীবন: দেবী সরস্বতীর মুখে ব্রহ্মজ্ঞানের গূঢ় ইশারা


৪২তম বনপর্ব- মৃত্যুর ওপারে মহাজীবন: দেবী সরস্বতীর মুখে ব্রহ্মজ্ঞানের গূঢ় ইশারা

পাণ্ডবদের চোখের সামনে তখন আদিগন্ত বিস্তৃত অরণ্যের নিস্তব্ধতা। যুধিষ্ঠির কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, যেন মনের গভীরে কোনো এক অলৌকিক সুরের সন্ধান করছেন। তারপর ধীরপায়ে এগিয়ে এসে মহাত্মা মার্কণ্ডেয়ের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ালেন। অর্জুন আর ভীমও এসে বসলেন পাশে।

যুধিষ্ঠির বললেন, "মুনিবর, মানুষের জীবন তো কেবল যুদ্ধ আর জয়-পরাজয়ের বৃত্তে বাঁধা নয়। আমরা শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের সেই অলৌকিক মহিমা শুনতে চাই, যা মানুষকে মাটির পৃথিবী থেকে এক লহমায় ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে যায়। কৃপা করে সেই কথা আমাদের বলুন।"

ঋষি মার্কণ্ডেয়ের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তিনি বলতে শুরু করলেন।

এক রাজপুত্রের ভুল এবং এক আশ্চর্য বেঁচে থাকা

হৈহয় বংশের এক রাজকুমার ছিলেন— পুরপুরঞ্জয়। রূপের তো আদি-অন্ত নেই, যেন দেবরাজ ইন্দ্রের কোনো তরুণ সংস্করণ। একদিন তিনি গভীর বনে শিকারে গেলেন। ঘন ঘাস আর লতাগুল্মে ঢাকা সেই অরণ্যে আলো-ছায়ার খেলা চলছিল। হঠাৎ এক ঝোপের আড়ালে রাজকুমার দেখলেন একটি কৃষ্ণসার মৃগ। ধনুকে তীর জুড়ে লক্ষ্যভেদ করলেন তিনি। কিন্তু কাছে গিয়েই তাঁর বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল! ওটা কোনো হরিণ নয়, কৃষ্ণ মৃগচর্ম গায়ে জড়িয়ে ধ্যানমগ্ন বসে আছেন এক তরুণ মুনি।

তীরের আঘাতে মুনির দেহ নিথর। এক জনহীন অরণ্যে ব্রাহ্মণহত্যার পাপে ছটফট করতে করতে রাজকুমার জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে।

যখন তাঁর চেতনা ফিরল, তিনি পাগলের মতো ছুটে গেলেন নিজের প্রাসাদে। হৈহয় বংশের বর্ষীয়ান ক্ষত্রিয়দের কাছে গিয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে বললেন তাঁর এই চরম দুষ্কর্মের কথা। রাজ্যজুড়ে নেমে এল গভীর শোকের ছায়া। সেই নিহত মুনি কার সন্তান, তা খুঁজতে খুঁজতে ক্ষত্রিয়রা এসে পৌঁছলেন কশ্যপনন্দন মহর্ষি অরিষ্টনেমির আশ্রমে।

বৃদ্ধ ঋষি অরিষ্টনেমি পরম সমাদরে অতিথিদের বরণ করলেন, কিন্তু ক্ষত্রিয়দের মুখে তখন অপরাধের কালো মেঘ। তাঁরা বিনীত কণ্ঠে বললেন, "মুনিবর, আপনার এই পবিত্র আতিথ্য গ্রহণ করার যোগ্যতা আমাদের নেই। আমাদের এক সন্তান ঘোর অপরাধ করেছে, সে এক নিরপরাধ ব্রাহ্মণকে হত্যা করেছে।"

অরিষ্টনেমি সামান্য বিস্মিত হলেন, কিন্তু তাঁর চোখে কোনো ক্রোধের আগুন জ্বলল না। তিনি বললেন, "ব্রাহ্মণহত্যা? সেই মৃতদেহ এখন কোথায়?"

ক্ষত্রিয়রা ঋষিকে নিয়ে গেলেন সেই ঘটনাস্থলে। কিন্তু আশ্চর্য! সেখানে কোনো মৃতদেহ নেই, ঘাসের ওপর রক্তের একটা দাগ পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই। পুরপুরঞ্জয় যখন চারদিকে শূন্য চোখে তাকাচ্ছেন, তখন অরিষ্টনেমি শান্ত গলায় বললেন, "পুরপুরঞ্জয়, ওদিকে তাকাও। ওই তো আমার পুত্র, যাকে তোমরা মৃত ভেবেছিলে। সে তপোবলে বলীয়ান।"

মুনিকুমারকে অক্ষত এবং জীবিত দেখে রাজকুমার আর ক্ষত্রিয়রা বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাঁরা সমস্বরে বলে উঠলেন, "এ কেমন অলৌকিক কাণ্ড! মৃত্যু কি তবে এই ব্রাহ্মণের দুয়ারে এসে ফিরে গেছে? কোন তপস্যার বলে ইনি পুনর্জীবিত হলেন?"

ঋষি অরিষ্টনেমি মৃদু হেসে বললেন, "শোনো হে রাজন্যবর্গ, মৃত্যু আমাদের স্পর্শ করতে পারে না, কারণ আমাদের জীবন এক অন্য সত্যে বাঁধা। আমরা কখনো অসত্য বলি না, স্বধর্ম থেকে বিচ্যুত হই না। আমরা অন্যের শুভকামনা করি, কারও পিঠ পিছে তাঁর নিন্দা করি না। ঘরে অতিথি এলে আমরা নিজেরা অভুক্ত থেকে তাঁদের অন্ন-জল দিই, আর বেঁচে যাওয়া যৎসামান্য অংশ প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করি। ক্ষমা, সংযম আর পবিত্রতাই আমাদের রক্ষা কবচ। তাই যমরাজও আমাদের সমীহ করে চলেন। তোমরা নিশ্চিন্তে ফিরে যাও, ব্রহ্মহত্যার কোনো পাপ তোমাদের স্পর্শ করেনি।"

ক্ষত্রিয়রা নত মস্তকে মহর্ষিকে প্রণাম জানিয়ে স্বদেশে ফিরে গেলেন।

তাক্ষ্য মুনির সংশয় ও দেবী সরস্বতীর আবির্ভাব

গল্পের এইখানে এসে মার্কণ্ডেয় একটু থামলেন। যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, "কৌন্তেয়, এবার তোমাকে যা শোনাব, তা হলো মানুষের অস্তিত্বের আসল নির্যাস। একদা মুনিবর তাক্ষ্য পরম জ্ঞানের সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে আরাধনা করেছিলেন এবং তাঁর সামনে স্বয়ং দেবী সরস্বতী প্রকট হয়েছিলেন। তাঁদের সেই কথোপকথন মানব ইতিহাসের এক শ্রেষ্ঠ দর্শন।"

তাক্ষ্য দেবী সরস্বতীকে হাত জোড় করে প্রশ্ন করেছিলেন, "হে কল্যাণী, এই সংসারে মানুষের প্রকৃত মঙ্গল কিসে? মানুষ কীভাবে চললে কোনোদিন ধর্ম থেকে ভ্রষ্ট হয় না? তুমি আমায় পথ দেখাও।"

দেবী সরস্বতী, যাঁর কণ্ঠে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সুর ধ্বনিত হয়, তিনি বললেন, "তাক্ষ্য, যে মানুষ অকর্তব্য আর লালসাকে ত্যাগ করে পবিত্র মনে প্রতিদিন স্বাধ্যায় করে, ওঙ্কার ধ্বনিতে মনকে স্থির করে, সে মৃত্যুর পর দেবতাদেরও ঊর্ধ্বে— ব্রহ্মলোকে স্থান পায়। আর এই মর্ত্যলোকেও দানের এক মহৎ ভূমিকা রয়েছে। দান কেবল বস্তু দেওয়া নয়, তা হলো অহংকার বিসর্জন দেওয়া। যে বস্ত্র দান করে সে চন্দ্রলোকে যায়, যে সোনা দান করে সে দেবত্ব পায়।"

দেবী আরও বিস্তারিতভাবে বলতে লাগলেন, "একটি দুগ্ধবতী গাভী দান করা মানে জীবনের পুষ্টি ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে ছড়িয়ে দেওয়া। সেই গাভীর গায়ে যত লোম থাকে, দাতা তত বছর পুণ্যলোক ভোগ করে। আর দক্ষিণাসহ কপিলা গাভী দান করলে তা মানুষের ভেতরের কাম-ক্রোধের অন্ধকার দূর করে তার সাত পুরুষকে নরক থেকে রক্ষা করে। ঠিক তেমনি, ব্রাহ্মবিবাহে কন্যাদান বা ভূমিদান মানুষকে ইন্দ্রলোকের অধিকারী করে। সাত বছর ধরে যে নিয়মনিষ্ঠ হয়ে অগ্নিহোত্র যজ্ঞ করে, সে নিজের ঊর্ধ্বতন ও অধঃস্তন মোট চৌদ্দ পুরুষকে উদ্ধার করে।"

তাক্ষ্য তখন কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। তিনি বললেন, "দেবী, এই অগ্নিহোত্র বা যজ্ঞের আসল রহস্যটা কী?"

দেবী সরস্বতী তখন যজ্ঞের বাহ্যিক আড়ম্বরের আড়ালে থাকা আসল সত্যটি উন্মোচন করলেন। তিনি বললেন, "অপবিত্র শরীরে, না ধুয়ে যজ্ঞের আগুন ছোঁয়া যায় না তাক্ষ্য। কিন্তু তার চেয়েও বড় অপবিত্রতা হলো অজ্ঞানতা। যে বেদের অর্থ বোঝে না, কিংবা বোঝেও তা জীবনে আচরণ করে না, তার যজ্ঞ করার কোনো অধিকার নেই। দেবতারা দেখেন মানুষের অন্তরের ভাব। শ্রদ্ধাহীন মানুষের নিবেদন দেবতারা ছুঁয়েও দেখেন না। অজ্ঞ বা অশ্রোত্রিয় ব্যক্তি দেবতাদের কাছে অপরিচিতের মতো। তুমি কি কোনো অচেনা মানুষের হাতের অন্ন সহজে গ্রহণ করবে? দেবতারাও করেন না। তাই ধনাভিমান ত্যাগ করে, সত্যের ব্রত নিয়ে যে যজ্ঞের অবশিষ্ট প্রসাদ খায়, সে-ই পরমাত্মার দেখা পায়।"

তাক্ষ্য এবার দেবীর মায়াবী রূপের দিকে তাকালেন। তাঁর মনে এক তীব্র বিস্ময় জাগল। তিনি বললেন, "দেবী, তুমি পরম প্রজ্ঞা ও কর্মফলের অতীত এক চেতনা। কিন্তু দয়া করে বলো, প্রকৃতপক্ষে তুমি কে?"

দেবী সরস্বতী হাসলেন। সেই হাসিতে যেন জ্যোৎস্না ঝরে পড়ল অরণ্যে। তিনি বললেন, "আমি পরাপরবিদ্যারূপা সরস্বতী। তাক্ষ্য, তুমি আমায় কোনো দূর আকাশের দেবী ভেবে ভুল করো না। আমি কোনো পাথরের মূর্তিতে থাকি না, আমি বাস করি মানুষের আন্তরিক শ্রদ্ধা আর ভক্তির গভীরে। যেখানে বিনয় আছে, সেখানেই আমি প্রকাশিত হই। তুমি আজ অহংকারহীন, তাই আমার এত কাছে আসতে পেরেছ।"

ব্রহ্মাণ্ড-বৃক্ষ এবং বাসনার মায়ানদী: মোক্ষতত্ত্বের চূড়ান্ত রহস্য

তাক্ষ্য এবার তাঁর জীবনের শেষ এবং সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি করলেন। "দেবী, সাংখ্যযোগী আর কর্মযোগীরা যে সনাতন মোক্ষের কথা বলেন, যার জন্য ঋষিরা সমস্ত ইন্দ্রিয় নিগ্রহ করে তপস্যা করেন, সেই পরম মোক্ষপদটি আসলে কী? দয়া করে আমায় বুঝিয়ে বলো।"

দেবী সরস্বতীর চোখ দুটি তখন গভীর ও দূরবর্তী হয়ে গেল। তিনি এক অদ্ভুত রূপকের সাহায্যে মহাবিশ্বের শেষ সত্যটি তুলে ধরলেন:

 "তাক্ষ্য, সেই পরমপদই হলো সনাতন ব্রহ্ম। এই ব্রহ্মের বুকে এক বিশাল, অনন্ত 'ব্রহ্মাণ্ডরূপী বৃক্ষ' দাঁড়িয়ে আছে। সেই গাছের অজস্র ডালপালা, যা আসলে মানুষের ভোগবিলাসের স্থান। আর তার সুগন্ধ হলো শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধের মতো জাগতিক বিষয়।

কিন্তু মনে রেখো, এই বিশাল গাছের মূল বা শিকড়টি লুকিয়ে আছে 'অবিদ্যা' অর্থাৎ গভীর অজ্ঞানতার মধ্যে। আর সেই অজ্ঞানতার মূল থেকেই জন্ম নিয়েছে এক নিরন্তর বয়ে চলা ভোগবাসনার নদী। ওপর থেকে দেখলে সেই নদীকে ভারী সুন্দর মনে হয়, মনে হয় তার জল মধুর মতো মিষ্টি, শরীরের সব তৃষ্ণা বুঝি মিটিয়ে দেবে। কিন্তু তাক্ষ্য, ওটা মায়া!

আসলে ওই নদী পুরোপুরি সারশূন্য। ওটা শুকনো পাতার মতো শুষ্ক, বালুকণার মতো বিচ্ছিন্ন এবং মাংসের মতো অপবিত্র। ক্ষীরের মতো সুস্বাদু মনে হলেও তা মানুষের চিত্তকে নোংরা করে দেয়। এই মায়াময় বাসনার নদীকে যে মানুষ চিনে ফেলে এবং তা অতিক্রম করতে পারে, সে-ই আমার পরমপদ লাভ করে। স্বয়ং ইন্দ্র, অগ্নি আর পবন দেবতারাও যজ্ঞের মাধ্যমে এই পরমব্রহ্মেরই আরাধনা করেন।"

মার্কণ্ডেয় মুনি গল্প শেষ করে যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকালেন। বনের বাতাস তখন শান্ত। যুধিষ্ঠির বুঝলেন, দেবী সরস্বতী আসলে বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন যে, এই পৃথিবীর চাক্ষুষ সুখগুলো আসলে শুকনো পাতার মতো ধুলোয় উড়ে যায়। আসল মুক্তি নিহিত রয়েছে ভেতরের অজ্ঞানতাকে উপড়ে ফেলে সেই পরম সত্যকে চেনার মধ্যে, যা চিরন্তন এবং অবিনশ্বর।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের   ৪২তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৪১তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

 সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ