অহংকারের পতন: বৃহস্পতির শেখা শেষ পাঠ


অহংকারের পতন: বৃহস্পতির শেখা শেষ পাঠ

শান্তিপর্বের সেই বিকেলটা যেন কোনোদিন ফুরোতেই চাইছিল না। কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে শরশয্যায় শুয়ে আছেন পিতামহ ভীষ্ম, তাঁর শরীর জুড়ে অসংখ্য তীরের ক্ষত, অথচ চোখ দুটিতে এখনও সেই পুরনো তেজ। যুধিষ্ঠির বসে আছেন পাশে, মাথা নিচু, মনের ভেতরে অসংখ্য প্রশ্নের ভিড়। রাজ্যপাট পেয়েও যে শান্তি নেই, সেই শূন্যতা নিয়েই তিনি এসেছেন পিতামহের কাছে—ধর্ম বলতে ঠিক কী বোঝায়, রাজধর্ম আর মোক্ষধর্মের মধ্যে সীমারেখা কোথায়, তা জানতে।

ভীষ্ম তখন এক পুরনো গল্প বলতে শুরু করলেন। বললেন, এই একই প্রশ্ন একদিন স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রকেও পীড়া দিয়েছিল।

স্বর্গের অধিপতি তখন ইন্দ্র। তাঁর ঐশ্বর্যের সীমা নেই, ক্ষমতার সীমা নেই। অমরাবতীর সোনার প্রাসাদে বসে থাকলে মনে হয়, জগতে তাঁর চেয়ে সুখী আর কেউ নেই। অথচ রাতের গভীরে, যখন অপ্সরাদের নৃত্যগীত থেমে যায়, ইন্দ্রের মনের কোণে একটা কাঁটা খচখচ করে বেঁধে—এই যে এত ঐশ্বর্য, এত ক্ষমতা, এর অর্থ কী? ধর্ম কাকে বলে? জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যটাই বা কোথায়?

এই অস্থিরতা নিয়েই একদিন ইন্দ্র চলে এলেন দেবগুরু বৃহস্পতির আশ্রমে। বৃহস্পতি তখন সর্বশাস্ত্রে পারদর্শী, তাঁর পাণ্ডিত্যের তুলনা ত্রিভুবনে নেই। ইন্দ্র হাত জোড় করে বিনীত স্বরে বললেন—"হে গুরুদেব, আমাকে সেই পরম তত্ত্বটি বুঝিয়ে দিন, যা জানলে ধর্ম আর অর্থের প্রকৃত রূপ চেনা যায়, যা জানলে দেবতা কিংবা মানুষ, উভয়েই পরম গতি লাভ করে।"

বৃহস্পতির ঠোঁটের কোণে একটা চাপা হাসি ফুটে উঠল। এতদিনের সঞ্চিত জ্ঞান, এত শাস্ত্রপাঠ, এই তো সুযোগ তা জাহির করার। তিনি শুরু করলেন এক দীর্ঘ, জটিল বক্তৃতা—ব্যাকরণের প্যাঁচ, ন্যায়শাস্ত্রের কূট তর্ক, দর্শনের দুরূহ পরিভাষা, একের পর এক শ্লোক আওড়ে গেলেন অনর্গল। তাঁর মনে তখন একটাই ভাবনা—এই অগাধ পাণ্ডিত্যের প্রকাশে ইন্দ্র নিশ্চয় বিমুগ্ধ হবেন, চমৎকৃত হবেন তাঁর গুরুর অতুলনীয় জ্ঞানভাণ্ডার দেখে।

কিন্তু বক্তৃতা যখন থামল, ইন্দ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে বৃহস্পতি একটু থমকে গেলেন। সেই মুখে চমক নেই, মুগ্ধতা নেই—আছে শুধু একরাশ ক্লান্তি আর ধোঁয়াশা। এত শব্দ, এত তত্ত্ব, অথচ ইন্দ্রের অন্তরের অন্ধকার এতটুকু কাটেনি। কথাগুলো তাঁর মাথার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে, ছুঁতে পারেনি হৃদয়কে।

ইন্দ্র তখন আবার হাত জোড় করলেন, গলায় বিনয় থাকলেও কথাগুলো ছিল স্পষ্ট, নিরাভরণ। বললেন—"গুরুদেব, আপনার পাণ্ডিত্যের কোনো তুলনা নেই, একথা সত্য। কিন্তু এই যে জটিল শব্দের জাল আপনি বুনলেন, তা আমার মনে কোনো আলোড়ন তুলতে পারল না। আমি ধর্মের এমন একটা রূপ চাই, যা সহজ, যা সরল, যা আমি সরাসরি অনুভব করতে পারি নিজের হৃদয় দিয়ে।"

কথাগুলো শুনে বৃহস্পতি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এতকালের জীবনে, এত শিষ্য, এত সভা—কেউ কখনও তাঁর জ্ঞানের সামনে দাঁড়িয়ে এমন সংশয় প্রকাশ করেনি। মুহূর্তের জন্য তাঁর ভেতরে একটা প্রবল ধাক্কা লাগল। যা তিনি সারাজীবন ধরে সঞ্চয় করেছেন—শব্দ, শ্লোক, তর্ক—তার সবটাই কি তবে ফাঁপা? শুধু শাস্ত্র মুখস্থ করলে, শুধু পাণ্ডিত্যের অহংকার নিয়ে বসে থাকলে কি ধর্মের প্রকৃত মর্ম ছোঁয়া যায় না?

সেই নীরবতার মধ্যেই যেন একটা সত্য নিজে থেকেই উদ্ভাসিত হলো, কোনো অলৌকিক বাণীর মতো। বৃহস্পতি নিজের ভুল বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে বললেন—

 "কারণ ধর্মজ্ঞান না থাকলে, আর বড়দের সেবা না করলে, বৃহস্পতির মতো হয়েও তুমি ধর্ম আর অর্থের প্রকৃত তত্ত্ব জানতে পারবে না।"

এই কথাগুলো বলার সময় দেবগুরুর কণ্ঠে আর অহংকারের রেশমাত্র ছিল না। বরং ছিল এক গভীর বিনয়, যেন এতকালের পাণ্ডিত্যের আড়াল সরিয়ে তিনি নিজেই প্রথমবার নিজেকে দেখতে পেলেন।

শাস্ত্রের পাতা ওল্টালে যে জ্ঞান জমা হয়, তা আসলে শুধু তথ্যের স্তূপ। প্রকৃত ধর্ম কোনো তাত্ত্বিক কচকচানি নয়—তার জন্য চাই বিনয়, চাই গুরুজনের প্রতি নিঃস্বার্থ সেবা, চাই নিজের ভেতরের অহংকারকে বিসর্জন দেওয়ার সাহস। স্বয়ং দেবগুরু বৃহস্পতিকেও এই কঠিন সত্যটা শিখতে হয়েছিল সেদিন—অহংকার যেখানে শেষ হয়, প্রকৃত বোধের জন্ম ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়।

ভীষ্ম গল্প শেষ করে যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকালেন। যুধিষ্ঠিরের চোখেও তখন সেই একই আলো, যা একদিন ইন্দ্রের চোখে জ্বলে উঠেছিল—জ্ঞানের নয়, উপলব্ধির আলো।

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া