কৃপাচার্য, দ্রোণাচার্য, অশ্বথামার জন্ম এবং দ্রোণাচার্যের অন্তহীন অপমান :
কৃপাচার্য, দ্রোণাচার্য, অশ্বথামার জন্ম এবং দ্রোণাচার্যের অন্তহীন অপমান :
মহর্ষি গৌতমের পুত্র শরদ্বান ছিলেন আর পাঁচটা ঋষিপুত্রের চেয়ে আলাদা। যখন অন্য বালকরা আশ্রমে প্রদীপের আলোয় ঝুকে পড়ে বেদপাঠ করত, শরদ্বান তখন বনের নির্জন অন্ধকারে ধনুর গুণ টানতেন। শাস্ত্রের মন্ত্রের চেয়ে তীরের শাঁ শাঁ শব্দই তাঁর কানে বেশি মধুর লাগত। যজ্ঞের আগুনের চেয়ে তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল লক্ষ্যভেদ। কঠোর সাধনায় তিনি এমন সব মারণাস্ত্র আয়ত্ত করলেন যে স্বর্গের অধিপতি ইন্দ্রের সিংহাসন টলমল করে উঠল। ইন্দ্রের পুরনো অভ্যাস—কারও সাধনা বাড়লেই তাতে বিঘ্ন ঘটানো। আর সেই বিঘ্নের চিরকালীন নাম হলো নারী।
ইন্দ্র পাঠালেন অপ্সরা জানপদীকে। শরদ্বান তখন গভীর ধ্যানে। হঠাৎ চোখের পাতা খুলতেই দেখলেন, অরণ্যের সবুজ ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে এক মায়াবী রূপসী। তাঁর আলুলায়িত কেশ আর কামুক দৃষ্টি শরদ্বানের আজীবনের সংযমের বাঁধে ফাটল ধরাল। শরদ্বান ঋষিপুত্র হলেও মানুষ তো বটেন! তাঁর শরীরের রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। তিনি লড়াই করেছিলেন নিজের মনের সঙ্গে, কিন্তু প্রকৃতির আদিম টানকে অস্বীকার করার সাধ্য কার? নিজের অজান্তেই তাঁর রেতস্খলন হলো।
লজ্জা আর আত্মগ্লানিতে শরদ্বান সেখান থেকে পালিয়ে গেলেন গভীর অরণ্যে। তাঁর সেই তেজ গিয়ে পড়েছিল একগুচ্ছ শরঘাসের ওপর। অলৌকিক ভাবে সেই তেজ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে জন্ম নিল দুটি শিশু—একটি পুত্র আর একটি কন্যা। নিয়তি বড় অদ্ভুত। হস্তিনাপুরের রাজা শান্তনু তখন মৃগয়ায় বেরিয়েছিলেন। পথের ধারে ওই অনাথ শিশু দুটিকে দেখে তাঁর মায়া হলো। তিনি তাদের প্রাসাদে এনে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করলেন। নাম দিলেন কৃপ আর কৃপী।
শরঘাসে জন্মানো সেই অনাথ বালকের নামই পরে ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে রইল ‘কৃপাচার্য’ হিসেবে। আর কৃপী দ্রোণাচার্যের স্ত্রী হলেন, একাধারে বীর পত্নী ও বীর জননী। পথের ধুলো থেকে উঠে এসে তাঁরাই হয়ে উঠলেন কুরুবংশের প্রধান স্তম্ভ।
দ্রোণ: এক অপমানের ইতিকথা
গল্পের শুরু গঙ্গার তীরে, গঙ্গাদ্বারে। মহর্ষি ভরদ্বাজ একবার স্নান করতে গিয়ে দেখলেন অপ্সরা ঘৃতাচীকে। ঋষির সংযম টলল এবং সেই স্খলিত তেজ তিনি রক্ষা করলেন একটি মৃন্ময় পাত্র বা ‘দ্রোণ’-এ। সেখান থেকেই জন্ম নিলেন দ্রোণ। পিতৃদত্ত আশ্রমে শাস্ত্র শিখলেও দ্রোণের দু-চোখে ছিল যুদ্ধের স্বপ্ন। সেই গুরুকুলেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় পাঞ্চাল রাজপুত্র দ্রুপদের। দুজনের গলায় গলায় ভাব। আবেগের বশে দ্রুপদ একদিন বলেছিলেন, "বন্ধু, আমি যখন রাজা হব, আমার অর্ধেক রাজ্য তোমার হবে।" নিঃস্ব ব্রাহ্মণ দ্রোণ সেদিন বন্ধুর কথা পাথরকুচি বলে বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর।
সংসারে চরম দারিদ্র্য। অর্থাভাবে দ্রোণ তাঁর প্রিয় পুত্র অশ্বত্থামাকে এক ফোঁটা দুধ কিনে দিতে পারতেন না। পিটুলি গোলা জল খেয়ে যখন অবোধ অশ্বত্থামা আনন্দের চোটে নাচতে শুরু করল, তখন দ্রোণের মনে হলো তাঁর পিতৃত্ব আজ বড় বেশি লাঞ্ছিত। অপমানের জ্বালা নিয়ে তিনি গেলেন বন্ধু দ্রুপদের কাছে। কিন্তু ক্ষমতার উত্তাপ মানুষকে বদলে দেয়। রাজা দ্রুপদ অবজ্ঞার হাসি হেসে বললেন, "রাজার সঙ্গে ভিখারির বন্ধুত্ব হয় নাকি?"
সেই মুহূর্তেই দ্রোণের ভেতরের শান্ত ব্রাহ্মণটি মারা গেল। জন্ম নিল এক ভয়ঙ্কর প্রতিশোধকামী যোদ্ধা। তিনি মহেন্দ্র পর্বতে গিয়ে পরশুরামের কাছ থেকে সমস্ত দিব্যাস্ত্র গ্রহণ করলেন। হয়ে উঠলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সমরগুরু।
হস্তিনাপুরের ধুলোমাখা এক দুপুর
হস্তিনাপুরের সেই দুপুরটা ছিল আর পাঁচটা দুপুরের মতোই অলস। কৌরব আর পাণ্ডব ভাইরা মিলে গোল হয়ে বল খেলছিল। মাঠের পাশে একটা পোড়ো কুয়ো। হঠাৎ হাত ফসকে বলটা পড়ে গেল সেই অন্ধকূপের গভীরে। কিশোর রাজপুত্ররা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল। ঠিক সেই সময় দৃশ্যপটে এলেন একজন মানুষ।
উস্কোখুস্কো চুল, পরনে অতি সাধারণ ব্রাহ্মণের পোশাক, কিন্তু চোখের চাউনিটা যেন তীরের ফলার মতো তীক্ষ্ণ। তিনি শান্ত পায়ে এগিয়ে এলেন কুয়োর ধারে। কিশোরদের অসহায়তা দেখে তাঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে বাঁকা হাসি। সেই হাসিতে করুণা ছিল না, ছিল এক ধরণের অভিজ্ঞ মানুষের তাচ্ছিল্য।
তিনি বললেন, "ক্ষত্রিয় বীরদের এই অবস্থা? সামান্য একটা বল তুলতে পারছ না? যদি খাবার ব্যবস্থা করো, তবে সামান্য ঘাস দিয়েই ওটা আমি তুলে আনতে পারি।"
রাজপুত্ররা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ব্রাহ্মণ তখন ভূমি থেকে একমুঠো শরঘাস তুলে নিলেন। তারপর শুরু হলো এক জাদু। তিনি মন্ত্র পড়ে একটা ঘাস ছুঁড়লেন, সেটা তীরের মতো গিয়ে বিঁধল বলের গায়ে। তারপর দ্বিতীয় ঘাসটা বিঁধল প্রথমটার গায়ে। এভাবে একের পর এক ঘাস গেঁথে একটা লম্বা শিকল তৈরি হয়ে গেল। খুব সহজে বলটা উঠে এল উপরে।
ভীষ্ম যখন শুনলেন, তাঁর বুঝতে এক মুহূর্ত দেরি হলো না। তিনি জানতেন, এই ক্ষমতা কেবল একজনেরই থাকতে পারে—তিনি দ্রোণ। ভীষ্ম সসম্মানে তাঁকে প্রাসাদে ডেকে আনলেন। হস্তিনাপুরের এক রাজকীয় আশ্রমে ঠাঁই হলো দ্রোণের। শুরু হলো কুরুবংশের রাজপুত্রদের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা তৈরির কাজ।
কিন্তু দ্রোণ যখন অর্জুনকে লক্ষ্যভেদ শেখাতেন, তাঁর চোখের মণি তখন স্থির হয়ে থাকত সুদূর পাঞ্চালের দিকে। তাঁর প্রতিটি মন্ত্রের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল এক সুগভীর প্রতিহিংসা। মেধা যখন অবজ্ঞার শিকার হয়, তখন তা প্রলয় ঘটায়। দ্রোণাচার্যের জীবন ঠিক সেই আখ্যানেরই প্রতিচ্ছবি—যা শ্রেষ্ঠত্বের শিখর ছুঁয়েও এক আজন্ম অভিমানে দগ্ধ।
জীবন বোধ: নিয়তি কখন কাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায়, তা মানুষের বুদ্ধির অগম্য। একগুচ্ছ ঘাস আর একটা মাটির পাত্র থেকে জন্মানো দুই মানুষই শেষ পর্যন্ত লিখেছিলেন ভারতের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যের ভাগ্যলিপি।
ভীষ্মের এই নিয়োগ কি কেবল রণকৌশল ছিল, নাকি এর পেছনে কোনো সুগভীর রাজনৈতিক চালও ছিল বলে আপনার মনে হয়?

Comments
Post a Comment