সিংহাসনের ভয়, আর এক দেবরাজের লুকিয়ে থাকার গল্প

 


সিংহাসনের ভয়, আর এক দেবরাজের লুকিয়ে থাকার গল্প

স্বর্গের সিংহাসনটা দেখতে যত ঝলমলে, ভেতরে তত ফাঁপা। সোনার জৌলুসের আড়ালে জমে থাকে শুধু ভয়, সন্দেহ, আর একটা পুরনো, আদিম আশঙ্কা। ইন্দ্র, স্বয়ং দেবরাজ, সেই সিংহাসনে বসেও কোনোদিন শান্তিতে নিঃশ্বাস ফেলতে পারেননি। তাঁর মনে সবসময় একটাই কাঁটা খচখচ করত—যদি কেউ তাঁর চেয়ে বেশি তেজস্বী হয়ে ওঠে? যদি তাঁর হাত থেকে ক্ষমতাটা কোনোদিন ফসকে যায়?

এই ভয় থেকেই শুরু হয়েছিল একটা করুণ, আর ভয়ংকর গল্প।

ত্বষ্টা নামে এক মহান প্রজাপতি ছিলেন, দেবতাদের শিল্পী। ইন্দ্রের ওপর তাঁর মনে একটা পুরনো ক্ষোভ জমে ছিল, আর সেই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নিল তাঁর ছেলে—ত্রিশিরা। তিনটে মাথা তার। একটা মুখে অবিরাম বেদ পড়ত, আরেকটা মুখে যেন সুধা খাওয়ার তেষ্টা, আর তৃতীয় মুখটা যেন গোটা পৃথিবীটাকেই গিলে নিতে চাইত—এমন তার দৃষ্টি। কিন্তু ভয়ংকর চেহারার আড়ালে ছেলেটা ছিল সংযমী, ইন্দ্রিয়জয়ী, ধর্মপরায়ণ। তার তপস্যার তেজ এমন জায়গায় পৌঁছাল যে ইন্দ্রের বুক কেঁপে উঠল সিংহাসনে বসেই।

পাপী মন বোধহয় নিজের ছায়াকেও ভয় পায়। ইন্দ্র ভাবলেন, এই ছেলের নিষ্কলুষ তপস্যা একদিন তাঁর ইন্দ্রত্ব কেড়ে নেবে। তাই শুরু হলো দেবতাদের সেই চেনা কৌশল—অপ্সরাদের পাঠানো হলো ত্রিশিরার ধ্যান ভাঙতে। তাদের রূপ, তাদের ছল, সবকিছু ঢেলে দেওয়া হলো তার সামনে। কিন্তু ত্রিশিরা টলল না। গভীর সমুদ্রের মতো স্থির রইল সে। অপ্সরারা হার মেনে ফিরে গেল ইন্দ্রের কাছে, বলল—"মহারাজ, একে টলানো আমাদের সাধ্যের বাইরে।"

তখন ইন্দ্রের ভেতরের ভয়টা বদলে গেল হিংস্র রাগে। ন্যায়-অন্যায়ের কোনো হিসেব না করে তিনি নিজেই গিয়ে শান্তভাবে বসে থাকা সেই তপস্বীর ওপর ছুড়ে দিলেন তাঁর বজ্র। যেন একটা গোটা পাহাড় ভেঙে পড়ল মাটিতে। ত্রিশিরা রক্তে ভেসে চিরকালের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। একজন নিষ্পাপ সাধককে মেরে ইন্দ্র ফিরে গেলেন স্বর্গে, যেন কোনো মহাবীরত্ব দেখিয়ে এলেন।

কিন্তু রক্তের দাগ কি অত সহজে মোছে?

ছেলের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ত্বষ্টার চোখ জ্বলে উঠল আগুনের মতো। কান্নায়, ক্ষোভে তিনি চিৎকার করে উঠলেন—"আমার নিরপরাধ ছেলেকে বিনা দোষে মারল ইন্দ্র! এবার দেখুক জগৎ আমার তপস্যার আগুন কী করতে পারে।"

ত্বষ্টা যজ্ঞের আগুনে আহুতি দিলেন, আর সেই আগুন চিরে জন্ম নিল এক প্রকাণ্ড দানব—বৃত্রাসুর। মুহূর্তের মধ্যে সে বড় হয়ে আকাশ ছুঁয়ে ফেলল। ত্বষ্টা বললেন, "যাও বৃত্র, ইন্দ্রকে শেষ করো।"

শুরু হলো স্বর্গ আর পাতালের মধ্যে এক ভয়ংকর লড়াই। বৃত্রের আক্রমণের সামনে দেবতাদের সব শক্তি যেন ম্লান হয়ে গেল। একসময় বৃত্র তো ইন্দ্রকেই গিলে ফেলল আস্ত! স্বর্গে হাহাকার পড়ে গেল। দেবতারা তখন কৌশলে বৃত্রের শরীরে এমন একটা অনুভূতি তৈরি করলেন, যাতে সে ক্লান্ত হয়ে একটা বড় হাই তোলে। সেই ফাঁক দিয়ে ইন্দ্র নিজেকে ছোট করে বেরিয়ে এলেন ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধে হারলেন। শেষে ভয় পেয়ে রণক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলেন দেবরাজ।

স্বর্গে তখন রাজা নেই, চারদিকে শুধু হাহাকার। দেবতা আর ঋষিরা মিলে গেলেন বিষ্ণুর কাছে, বললেন—"প্রভু, বৃত্র সব গ্রাস করছে, আমাদের বাঁচান।"

বিষ্ণু হেসে বললেন, "উপায় একটাই—কূটনীতি। তোমরা গিয়ে বৃত্রের সঙ্গে ইন্দ্রের একটা সন্ধি করিয়ে দাও। বাকিটা আমি দেখছি।"

ঋষিরা গিয়ে বৃত্রকে বোঝালেন—এই যুদ্ধে গোটা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, এবার বন্ধুত্ব করো। বৃত্র দানব হলেও ঋষিদের সম্মান করত। বলল, "ঠিক আছে। তবে একটা শর্ত আছে—আমাকে শুকনো বা ভেজা কোনো কিছু দিয়ে, কাঠ বা পাথর দিয়ে, চেনা কোনো অস্ত্র দিয়ে, দিনে বা রাতে মারা যাবে না। এই শর্তে রাজি থাকলে সন্ধি হবে।"

ঋষিরা রাজি হলেন। ওপর ওপর সন্ধি হলো, বৃত্র নিশ্চিন্তে ফিরে গেল। কিন্তু ইন্দ্র? তিনি তো সন্ধির আড়ালে শুধু একটা সুযোগ খুঁজছিলেন।

একদিন সন্ধেবেলা বৃত্র একা হাঁটছিল সমুদ্রের ধারে। ইন্দ্র দূর থেকে দেখে মনে মনে হিসেব কষলেন—এখন না দিন, না রাত, এই তো সন্ধিক্ষণ। আজ ছল করে হলেও একে শেষ করতে হবে, নাহলে সারাজীবন ভয়ে কাটাতে হবে।

বিষ্ণুকে স্মরণ করতেই সমুদ্রে জেগে উঠল বিশাল এক ফেনার ঢেউ। ইন্দ্রের ঠোঁটে একটা কুটিল হাসি ফুটল—এ তো না ভেজা, না শুকনো, না কাঠ, না পাথর! নিজের বজ্রের সঙ্গে সেই ফেনা মিশিয়ে তিনি সজোরে ছুড়ে দিলেন বৃত্রের দিকে। মুহূর্তে সেই আঘাতে লুটিয়ে পড়ল প্রবল পরাক্রান্ত বৃত্রাসুর।

জগৎ বেঁচে গেল। সবাই আনন্দে জয়ধ্বনি দিল। কিন্তু ইন্দ্র কি সত্যিই জিতলেন?

না। কারণ একটা জয় এসেছিল ব্রহ্মহত্যার পাপে, আর আরেকটা এসেছিল ছলনায়।

জয়ের উল্লাসের ঠিক পরেই এক গভীর গ্লানি আর অপরাধবোধ ইন্দ্রকে চেপে ধরল চারদিক থেকে। ত্রিশিরাকে অকারণে মারার পাপ, বৃত্রকে ঠকিয়ে মারার লজ্জা—দুটোই তাঁর বুকে পাথরের মতো চেপে বসল। অনুশোচনায় দিশেহারা ইন্দ্র আর সিংহাসনে বসতে পারলেন না। সব ছেড়েছুড়ে তিনি লুকিয়ে পড়লেন জগতের এক প্রান্তে, এক দূরের হ্রদের অন্ধকার জলের গভীরে।

একজন পলাতক, অপরাধী মানুষের মতো ইন্দ্র জলের নিচে গা ঢাকা দিলেন। আর অমরাবতীতে নেমে এল এক বিশাল শূন্যতা। রাজাহীন স্বর্গের তেজ নিভে গেল। গাছ শুকাল, নদী শুকাল, বৃষ্টি বন্ধ হলো, মানুষ আর পশুপাখি সবাই কষ্ট পেতে লাগল। গোটা পৃথিবী যেন এক শ্মশান হয়ে গেল। সিংহাসন খালি পড়ে রইল, কিন্তু ব্রহ্মহত্যার পাপে ছোঁয়া সেই আসনে বসার সাহস আর কোনো দেবতার হলো না।

সব হারিয়ে, পাপের অন্ধকারে ডুবে রইলেন শুধু একজন—একা, লাঞ্ছিত এক দেবরাজ, যাকে কোনো জয়ই আর মুক্তি দিতে পারল না।

পদ্মের ডাঁটার আড়ালে, আর এক অনাহূত রাজার উত্থান-পতন

স্বর্গের সিংহাসন তখন শূন্য। কিন্তু প্রকৃতি শূন্যতা সহ্য করে না, ক্ষমতা তো একদমই নয়।

ইন্দ্র তখন কোথায়? স্বর্গের আলো, অপ্সরাদের নাচ, ফুলের গন্ধ—সব ছেড়ে তিনি লুকিয়ে আছেন মানস সরোবরের এক পদ্মের সরু ডাঁটার ভেতরে। নিজেকে অতি ক্ষুদ্র করে সেই অন্ধকার সুতোর মতো জায়গায় লুকিয়ে বসে আছেন এক সময়ের মহাতেজস্বী দেবরাজ। ব্রহ্মহত্যার পাপ তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে ছায়ার মতো।

এদিকে রাজা ছাড়া স্বর্গে বৃষ্টি নেই, শস্য নেই, যজ্ঞের আহুতিও পৌঁছাচ্ছে না দেবতাদের কাছে। জগৎ যখন প্রায় ধ্বংসের মুখে, ব্রহ্মা আর ঋষিরা মিলে ঠিক করলেন—মর্ত্যের এক ধার্মিক রাজাকে ডেকে বসানো হবে সেই খালি সিংহাসনে। তাঁরা বেছে নিলেন রাজা নহুষকে।

নহুষ প্রথমে রাজি হননি। মানুষ হয়ে দেবতাদের রাজা হওয়া কি সহজ কথা? কিন্তু দেবতাদের কাকুতি-মিনতিতে শেষে তিনি রাজি হলেন, বসলেন স্বর্গের সিংহাসনে।

কিন্তু আহা, সিংহাসন এমনই এক বিষ, যা সাধু মানুষের মাথাও ঘুরিয়ে দেয়। স্বর্গের ঐশ্বর্য, দেবতাদের বশ্যতা, ক্ষমতার নেশা—সব মিলে নহুষকে ধীরে ধীরে অন্ধ করে তুলল। মর্ত্যে যে মানুষটা ছিলেন ধার্মিক, স্বর্গে এসে তিনিই হয়ে উঠলেন উদ্ধত, ভোগে মত্ত এক স্বৈরাচারী।

ভোগের লোভ যখন সীমা ছাড়াল, নহুষের চোখ পড়ল ইন্দ্রের স্ত্রী শচীর ওপর। ঘোষণা করলেন, "আমিই এখন ইন্দ্র, তাই শচীও এখন আমার।"

শচী ভয়ে কেঁপে উঠলেন। ছুটে গেলেন গুরু বৃহস্পতির কাছে, কেঁদে বললেন, "প্রভু, বাঁচান আমাকে। এই লোকটা আমার সম্মান কাড়তে চাইছে।"

বৃহস্পতি শচীকে ভরসা দিলেন, আর একটা বুদ্ধি দিলেন। শচী গিয়ে নহুষকে নরম গলায় বললেন, "স্বর্গাধিপতি, আমি রাজি। তবে একটাই শর্ত—ইন্দ্রের রথে তো অনেকেই চড়েছে, আপনি অন্যরকম কিছু করুন। সপ্তর্ষিদের কাঁধে চড়ে পালকিতে এসে আমাকে গ্রহণ করুন। তবেই আমি আপনার হব।"

কামে অন্ধ নহুষ তখন ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা হারিয়েছেন। ভাবলেন, সপ্তর্ষিরা আমার পালকি বইবে, এর চেয়ে গর্বের আর কী হতে পারে! আদেশ দিলেন। মহর্ষি অগস্ত্যসহ সাত ঋষি বাধ্য হয়ে কাঁধে তুলে নিলেন সেই অহংকারী রাজার পালকি।

কিন্তু নহুষের তর সইছিল না। শচীর কাছে পৌঁছানোর তাড়নায় তিনি ঋষিদের তাড়া দিতে লাগলেন। পালকি ধীরে চলছিল দেখে অধৈর্য নহুষ পা দিয়ে লাথি মারলেন খর্বকায় অগস্ত্যকে, চেঁচিয়ে বললেন—"সর্প! সর্প!"—মানে তাড়াতাড়ি চলো।

একজন পূজনীয় ঋষির গায়ে লাথি!

অগস্ত্যের চোখ জ্বলে উঠল রাগে। পালকি থামিয়ে অভিশাপ দিলেন—"অহংকারী মূর্খ, তুই ঋষিদের অপমান করলি, আমাকে সাপ বললি? তবে তুই নিজেই এখন সাপ হয়ে মর্ত্যে পড়বি, দশ হাজার বছর সেই দেহে কাটাবি।"


মুহূর্তে নহুষের রূপ বদলে গেল। স্বর্গের সোনালি আলো ছেড়ে তিনি এক বিশাল অজগর হয়ে আছড়ে পড়লেন মর্ত্যের অন্ধকার জঙ্গলে।


কিন্তু আসল সমস্যাটা তো রয়েই গেল—ইন্দ্র কোথায়?


নহুষের পতনের পর দেবতারা বুঝলেন, একমাত্র ইন্দ্রই পারেন সব ঠিক করতে। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, অগস্ত্য সবাই মিলে গেলেন মানস সরোবরের তীরে। পদ্মের ডাঁটার ভেতর লুকিয়ে থাকা ভীত ইন্দ্রকে ডাকলেন স্নেহভরে।

বিষ্ণু বললেন, "ইন্দ্র, তুমি ভুল বুঝতে পেরেছ। এবার বেরিয়ে এসো। তোমার পাপ কাটাতে একটা অশ্বমেধ যজ্ঞ করো। সেই আগুনেই পুড়ে যাবে সব গ্লানি।"


ইন্দ্র ধীরে বেরিয়ে এলেন। মুখটা তখন শুকনো, চোখে দীর্ঘদিনের অন্ধকারের ছাপ। বিষ্ণুর কথামতো যজ্ঞ করলেন, আর সেই পবিত্র আগুনে ধুয়ে গেল তাঁর সব পাপ।


শুদ্ধ হয়ে ইন্দ্র আবার হাতে তুলে নিলেন বজ্র। স্বর্গের দরজা খুলে গেল। গাছে নতুন ফুল ফুটল, নদীতে জল ফিরল, মর্ত্যে নামল বৃষ্টি।

ইন্দ্র আবার গিয়ে বসলেন সিংহাসনে। কিন্তু আগের সেই অহংকারী ইন্দ্র হয়ে নয়। পাপ, গ্লানি, আর পদ্মডাঁটার সেই দীর্ঘ অন্ধকার তাঁকে একটা কথা শিখিয়ে দিয়ে গেল—সিংহাসন কখনো চিরস্থায়ী নয়, আর অহংকারের শেষটা সবসময় একটাই—পতন।

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)