অমরাবতীর অলিন্দে পাঁচ বছর: অর্জুনের স্বর্গবাসের দিনলিপি
অমরাবতীর অলিন্দে পাঁচ বছর: অর্জুনের স্বর্গবাসের দিনলিপি
মানুষের জীবনে এমন একটা সময় আসে, যখন তার ভেতরের সমস্ত ভার—কর্তব্যের দায়, বনবাসের গ্লানি, পাশাখেলায় সর্বস্ব খোয়ানোর অপমান আর ভরা রাজসভায় অপমানিত দ্রৌপদীর সেই করুণ মুখ—সবকিছু মিলেমিশে এমন এক অখণ্ড পাথর হয়ে ওঠে যে, নিজের অস্তিত্ব আর সেই বোঝার তফাত করা যায় না। কাম্যক বনের ভাইদের ছেড়ে এসে যখন অর্জুন হিমালয়ের নিস্তব্ধ চূড়ায় একা দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন তাঁর পিঠেও ছিল এই অন্তহীন বোঝা। কিন্তু আজ যেন ভেতরের হাওয়াটা একটু বদলেছে। তাঁর চারপাশে ছড়িয়ে আছে এমন সব অস্ত্র, যা মর্ত্যের কোনো রাজা কোনোদিন চোখেও দেখেনি—দেবতাদের উপহার, এক অলৌকিক ঐশ্বর্যের স্মারক। অর্জুনের বুকের ভেতর এখন এক গভীর, অচঞ্চল শান্তি। কাম্যক বন থেকে যে মানুষটা বেরিয়েছিল, এই মানুষটা আর সে নয়।
তিনি এখন অপেক্ষা করছেন। একটা রথের অপেক্ষা।
মাতলির আগমন ও স্বর্গের আহ্বান
অপেক্ষা দীর্ঘ হলো না।
হঠাৎই হিমালয়ের শৃঙ্গগুলোর ওপর আকাশের আলো এমনভাবে বদলে গেল, যার সাথে সূর্যের কোনো সম্পর্ক নেই। এ এক অন্যরকম আলো—ঘন, স্থির, যার নিজস্ব একটা ওম আছে। তারপর কানে এলো সেই শব্দ। এক গভীর, গুরুগম্ভীর প্রতিধ্বনি, যা পাহাড়ের নিস্তব্ধতা চিরে গড়িয়ে গেল। এ মেঘের ডাক নয়, এ এক এমন আওয়াজ যা ভয় দেখায় না, বরং চারপাশের বাতাসকে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্যে ভরিয়ে দেয়।
ইন্দ্রের রথ নেমে এলো মর্ত্যে।
সে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। রথের দুপাশে ঝুলছে ধারালো তলোয়ার। সারথির হাতের নাগালের মধ্যেই রাখা আছে এক ভারী গদা। দৈব কৌশলে তৈরি তূণীরে গোছানো রয়েছে অব্যর্থ সব তীর। স্বর্গের আসল বজ্রগুলো সেখানে এমন অবলীলায় সাজানো, যেন কোনো সাধারণ ধনুর্বিদ্রের তূণে রাখা মামুলি বাণ। বাতাসের গতিতে ছুটে যাওয়ার অস্ত্র, এমন কিছু মারণাস্ত্র যার নামও অর্জুন জানেন না, যার ক্ষমতা কল্পনা করাও কঠিন। রথের চূড়ায় উড়ছে রঙিন পতাকা, আর সেই পতাকা দোলাচ্ছে এমন এক হাওয়া যা বোধহয় শুধু এই রথের জন্যই বয়। আর এই রথকে টেনে নিয়ে চলেছে দশ হাজার ঘোড়া—মর্ত্যের কোনো পশু নয় তারা, ঘোড়ার রূপধারী গন্ধর্ব, যাদের গতি বাতাসের চেয়েও বেশি। তাদের সম্মিলিত শক্তিতে চারপাশের আকাশ যেন সশব্দে কেঁপে উঠছে।
রথ থেকে নেমে এলেন সারথি। তাঁর নাম মাতলি। মর্ত্যের শ্রেষ্ঠ সারথিরা যেভাবে নিখুঁত দক্ষতায় আর শান্ত মর্যদায় রথ চালায়, মাতলিও ঠিক তাই করেন—তফাত শুধু এই যে, মর্ত্যের বেশিরভাগ সাম্রাজ্য তৈরি হওয়ার আগে থেকেই মাতলি এই কাজ করছেন।
তিনি অর্জুনের দিকে তাকালেন। সে চাউনিতে এক চেনা মানুষের ওম ছিল, যেন তাকে আগেই বলে দেওয়া হয়েছে যে সে কোনো এক বিশেষ মানুষকে নিতে এসেছে এবং সে কথাটা সে বিশ্বাসও করেছে।
তিনি বললেন, "হে ইন্দ্রপুত্র, দেবরাজ তোমার পথ চেয়ে আছেন। তিনি এই রথ পাঠিয়েছেন। এসো আমার সাথে।"
কথাগুলো শুনে অর্জুনের বুকের ভেতর অনেকদিন ধরে বন্ধ থাকা একটা দরজা যেন এক ঝটকায় খুলে গেল। তাঁর মন এক অনাবিল, সহজ আনন্দে ভরে উঠল। ঠিক যেমনটা হয় যখন মানুষ কোনো কিছুর জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার পর জানতে পারে যে প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। তিনি স্নান করলেন, পিতৃপুরুষ আর দেবতাদের উদ্দেশ্যে আহ্নিক সারলেন—বংশানুক্রমিক এই নিত্যকর্ম অর্জুন কোনো পরিস্থিতিতেই ভোলেন না, তা সে রাজপ্রাসাদই হোক বা নির্জন বনবাস, কিংবা স্বর্গের সারথির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মুহূর্ত। তারপর তিনি রথে উঠলেন।
রথ উড়ে চলল ওপরের দিকে।
নক্ষত্রলোকের রহস্য
আকাশের স্তরগুলো পেরিয়ে রথ যখন আরও উঁচুতে উঠতে লাগল, অর্জুনের চোখের সামনে যা ভেসে উঠল, তা তাঁর চেনা ধারণার বাইরে। সূর্য হারিয়ে গেল, চাঁদ মিলিয়ে গেল, মর্ত্যের সমস্ত আলো নিচে ছোট হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল। অথচ, চারপাশের আকাশ কিন্তু অন্ধকার নয়।
সে আকাশ আলোয় আলোয় ঝলমল করছে—হাজার হাজার জ্যোতির্ময় বস্তু স্বর্গের শূন্যতায় ভেসে চলেছে, প্রত্যেকের শরীর থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে নিজস্ব এক আভা। সেই আলোর প্রতিফলনে মেঘের ওপারের জগৎটা মর্ত্যের এক শরতের দুপুরের মতোই উজ্জ্বল, অথচ সে আলোর চরিত্র আলাদা।
অর্জুন অবাক হয়ে মাতলির দিকে ফিরলেন, "এরা কারা? আকাশের বুকে ভেসে চলা এই আলোর কণাগুলো আসলে কী, মাতলি?"
মাতলি চিরকালের চেনা পথটার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসলেন, "হে বীর, মর্ত্যের মানুষ রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে যাদের তারা বলে ডাকে, যাদের দেখে দিক ঠিক করে, যাদের নিয়ে গল্প বানায়—এরা হলো তাদেরই আসল রূপ। এরা সবাই একেকটি পুণ্যবান আত্মা। যারা পৃথিবীতে ধর্ম মেনে বেঁচে ছিলেন, সৎ কাজ করেছিলেন, এটা তাদেরই বাসস্থান।"
পুণ্যাত্মাদের সেই নক্ষত্রবিথী পেরিয়ে, রাজর্ষিদের—যারা একাধারে রাজা এবং সাধক ছিলেন—তাদের সেই আলোকময় মহল্লা পার হয়ে, সময়ের হিসেবহীন এক যাত্রার শেষে রথ এসে পৌঁছাল এক অলৌকিক তোরণে। অর্জুনের সামনে খুলে গেল ইন্দ্রলোকের আসল রূপ।
অমরাবতী: যেখানে পাপের প্রবেশ নিষেধ
অমরাবতী—দেবরাজ ইন্দ্রের রাজধানী। পুরাণকথা বা পুরোনো পুঁথিতে এর যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা আসলে রূপকের খাতিরেই তৈরি। কারণ, মুখের ভাষায় এই শহরের রূপ ধরা অসম্ভব। এ এক সুবাসিত, দিব্য নগরী। এখানকার প্রকৃতি শুধু চোখকে জুড়ায় না, মনের ভেতরের কোনো এক অজানা খিদে শান্ত করে দেয়।
এখানে শুধু পুণ্যবান আত্মাদেরই ঠাঁই হয়, তবে সবার নয়। স্বর্গে প্রবেশের নিয়ম বড় কঠিন, বড় নির্মম। যারা জীবনে কখনো তপস্যা করেনি, যারা সন্ধ্যার আহ্নিক উপাসনা বাদ দিয়েছে, কিংবা যারা ক্ষত্রিয় হয়েও যুদ্ধক্ষেত্রে পিঠ দেখিয়েছে—তাদের চোখ এই শহরের আলো সহ্য করতে পারে না। যারা দান করেনি, ব্রত রাখেনি, বেদ পড়েনি বা পবিত্র তীর্থে স্নান করেনি—অমরাবতীর দরজা তাদের জন্য বন্ধ। নিষ্ঠুর, অসংযমী আর অবিশ্বাসীদের এখানে কোনো জায়গা নেই। অর্জুন যা দেখছিলেন, তা হলো এক সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ জীবনের পরম প্রাপ্তি। এই উপলব্ধি চারপাশের সৌন্দর্যকে যেন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
আকাশ জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে হাজারো দেবযান। দেবতারা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো যাতায়াত করছেন, শান্ত ও শৃঙ্খলিত। আর ইন্দ্রের রথ শহরে ঢুকতেই খবর পৌঁছে গেল সবার আগে—কারণ অমরাবতীতে খবর ছড়ায় চিন্তার গতিতে।
অপ্সরা আর গন্ধর্বরা তাঁকে দেখতে পেল। তারা সমস্বরে অর্জুনের স্তুতি গাইতে শুরু করল।
অমরাবতীর আকাশে উপচে পড়া সেই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে অর্জুন এমন সব মুখ দেখতে পেলেন, যাদের নাম তিনি ছোটবেলা থেকে ঋষিদের মুখে শুনে এসেছেন—বিশ্বদেব, মরুৎ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, আদিত্য, বসুগণ। দেখলেন ব্রহ্মর্ষি আর রাজর্ষিদের। দেখলেন গন্ধর্বরাজ তুম্বুরুকে, যাঁর কণ্ঠের সুর তিন ভুবনে বিখ্যাত। দেখলেন দেবর্ষি নারদকে, যিনি এক লোক থেকে অন্য লোকে পাতার মতো ভেসে বেড়াতে পারেন। দেখলেন হাহা আর হুহুকে।
তারা সবাই অর্জুনকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিলেন।
অর্জুন সবাইকে যথাযথভাবে প্রণাম ও অভিবাদন জানালেন—যমনটা তাঁর শিক্ষা এবং স্বভাবের সাথে মানায়। কোনো কৃত্রিম বিনয় নয়, বরং এক সহজ, শান্ত গাম্ভীর্য নিয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন। তিনি এই বিপুল অভ্যর্থনায় আপ্লুত হলেন বটে, কিন্তু অহংকারে অন্ধ হলেন না।
আর তারপর, তিনি এলেন ইন্দ্রের সামনে।
পিতা ও পুত্রের পুনর্মিলন
ইন্দ্র অর্জুনকে নিজের পাশে টেনে নিলেন। পরম স্নেহে জড়িয়ে ধরলেন তাঁর পুত্রকে।
কিছু মিলন থাকে যেখানে অনেক নিয়মকানুন লাগে, আর কিছু মিলনে শুধু দুটো মানুষই যথেষ্ট। এটা ছিল দ্বিতীয় রকমের। ইন্দ্র তাঁর ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন এক চিরকালের অপেক্ষার পর ফিরে পাওয়া বাবার মতো, আর অর্জুনও সেই বুকের ওমে খুঁজে পেলেন এমন এক শান্তি, যা বনবাস শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও পানননি।
(অর্জুনের জন্ম বৃত্তান্ত জানতে এখানে ক্লিক করুন)
এরপর যে উৎসব হলো, তা স্বর্গের নিয়মেই রাজকীয়। তুম্বুরু তাঁর গন্ধর্ব দল নিয়ে গান ধরলেন, আর তারপর নাচতে এলেন অপ্সরাগণ।
ঘৃতাচী, মেনকা, রম্ভা, পূর্বচিত্তি, স্বয়ংপ্রভা, উর্বশী, মিশ্রকেশী, দণ্ডা, গৌরী, বরুথিনী, গোপালী, সহজন্যা, কুম্ভযোনি, প্রজাগরা, চিত্রসেনা, চিত্রলেখা, সাহা, মধুস্বরা—একে একে এবং তারপর সবাই মিলে সভাগৃহ ভরিয়ে দিলেন এক অলৌকিক ছন্দে। মর্ত্যের যেকোনো নাচকে এদের সামনে এক অপূর্ণ চেষ্টা বলে মনে হয়।
ইন্দ্রের আদেশে অর্জুনকে অতিথি হিসেবে নয়, বরং সেই পরিবারেরই একজন সদস্য হিসেবে গ্রহণ করা হলো—যা তিনি আসলে ছিলেনও।
স্বর্গের পাঠশালা: অস্ত্র ও কলাবিদ্যা
কিন্তু এই পাঁচ বছর শুধু আমোদ-প্রমোদের ছিল না। শুরু হলো কঠোর সাধনা।
ইন্দ্রের প্রাসাদে অর্জুনের আসল শিক্ষার অধ্যায় শুরু হলো। একের পর এক অস্ত্র, একের পর এক রণকৌশল তিনি আয়ত্ত করতে লাগলেন। তিনি শিখলেন দেবরাজের সবচেয়ে প্রিয় অস্ত্র—বজ্র। শুধু ছুঁড়ে দেওয়া নয়, তার স্বভাবকে চেনা, তার সীমা বোঝা, কখন সে কথা শুনবে আর কখন সে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ধ্বংস ডেকে আনবে—সেই সূক্ষ্ম তফাতটা নিজের মুঠোয় ধরে রাখা শিখলেন। তিনি শিখলেন কীভাবে চোখের পলকে আকাশ মেঘে ঢেকে দিতে হয়, কীভাবে বিদ্যুৎকে ডেকে এনে নিজের ইচ্ছেমতো চালনা করতে হয়। বায়ুমণ্ডলের যেসব যুদ্ধকৌশল এতকাল শুধু দেবতাদের একচেটিয়া ছিল, অর্জুন তা নিজের করে নিলেন।
তিনি অভ্যাস করলেন, মনের ভেতর শুষে নিলেন সবকিছু। তিনি আর কেবল একজন মর্ত্যের শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর রইলেন না, তিনি হয়ে উঠলেন এক অন্য স্তরের যোদ্ধা।
কিন্তু ইন্দ্রের পরিকল্পনা এখানেই শেষ ছিল না।
একদিন দেবরাজ অর্জুনকে ডেকে বললেন, "বৎস অর্জুন, অস্ত্র তো তুমি শিখলে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। তোমাকে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের কাছ থেকে নাচ আর গান শিখতে হবে। আর শিখতে হবে স্বর্গের সেইসব বাদ্যযন্ত্র বাজানো, মর্ত্যের মাটিতে যার কোনো অস্তিত্ব নেই।"
কথাটা শুনে অর্জুন অবাক হয়েছিলেন। তিনি একজন যোদ্ধা, স্বর্গে এসেছেন মহাশক্তিধর অস্ত্রের সন্ধানে। আর তাঁর পিতা তাঁকে বলছেন নাচ-গান শিখতে! কিন্তু অর্জুন তাঁর জীবনে একটা জিনিস ভালো করেই শিখেছিলেন—সব নির্দেশের মানে সবসময় সাথে সাথে বোঝা যায় না, কিন্তু শিক্ষাকে ফিরিয়ে দিতে নেই। তিনি মাথা পাতলেন।
চিত্রসেনের সাথে অর্জুনের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। চিত্রসেন এক অনন্য শিল্পী, যাঁর কাছে সুর আর ছন্দ কোনো বাড়তি গুণ নয়, তাঁর অস্তিত্বেরই অংশ। শুরু হলো অর্জুনের এক অন্যরকম সাধনা।
পরের কয়েকটা মাস অর্জুনের যে রূপান্তর ঘটল, তা হিমালয়ের বুকে তাঁর কঠোর তপস্যা দেখা কোনো মানুষ কল্পনাও করতে পারত না। তিনি অপ্সরাদের মতো করে হাত-পা নাড়াতে শিখলেন—সেই সহজাত ঐশ্বরিক লাবণ্য হয়তো তাঁর ছিল না, কিন্তু একজন যোদ্ধার নিখুঁত শৃঙ্খলা আর শরীরী নিয়ন্ত্রণকে তিনি ঢেলে দিলেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন শিল্পকলায়। তিনি বাদ্যযন্ত্রে সুর তুললেন, নাট্যকলা শিখলেন।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অর্জুন এই বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন। স্বয়ং চিত্রসেন তাঁর প্রশংসা করলেন, আর চিত্রসেনের তো অর্জুনকে তোষামোদ করার কোনো দরকার ছিল না।
কিন্তু এই অস্ত্রাভ্যাস, এই সুর সাধনার মাঝখানের প্রতিটা মুহূর্তে অর্জুনের মনে পড়ত তাঁর ভাইদের কথা। কাম্যক বনে বসে থাকা যুধিষ্ঠির, যাঁর সম্বল শুধু ধৈর্য আর ধর্ম। ভীম, যিনি নিজের ভেতরের ক্রোধকে পাথর চাপা দিয়ে রেখেছেন। নকুল-সহদেব। আর দ্রৌপদী—যাঁর সেই অপমানের দিনটার মুখ অর্জুন কোনো আলোর ঝলকানিতেও ভুলে থাকতে পারছিলেন না।
তিনি ফিরে যেতে চাইছিলেন। কিন্তু ইন্দ্রের আদেশ, তাই তাঁকে থাকতে হলো।
উর্বশীর প্রত্যাখ্যান এবং অভিশাপের বর্ম
এই সময়েই ঘটে গেল সেই ঘটনা, যা আপাতদৃষ্টিতে এক বিরাট বিপর্যয় মনে হলেও, আসলে ছিল এক ছদ্মবেশী আশীর্বাদ।
এক সন্ধ্যায়, স্বর্গের নাচ দেখার সময় অর্জুনের চোখ আটকে গেল উর্বশীর ওপর। তিনি এক অদ্ভুত মনোযোগ দিয়ে উর্বশীকে দেখছিলেন—সে চাউনিতে কোনো লালসা ছিল না, যদিও বাইরে থেকে দেখলে ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। অর্জুন আসলে ভাবছিলেন অন্য কথা। তিনি ভাবছিলেন তাঁদের পুরু বংশের ইতিহাসের কথা, রাজা পুরূরবা আর উর্বশীর সেই আদিম প্রেমের কথা, যেখান থেকে তাঁদের বংশের জন্ম। অর্জুনের মনে হচ্ছিল, ইন্দ্রের সভার এই সবচেয়ে রূপবতী নারী তো আসলে কোনো দূর অতীতে তাঁদের মা ছিলেন!
তিনি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন।
পাশে বসে থাকা দেবরাজ ইন্দ্র লক্ষ্য করলেন ছেলের এই চাউনি। তিনি এক বাবার মতোই ছেলের মনের হদিশ করতে চাইলেন, কিন্তু ভুল বুঝলেন। তিনি চিত্রসেনকে ডেকে আড়ালে বললেন, "উর্বশীর কাছে যাও। তাকে বলো, আমি চাই সে যেন অর্জুনের সাথে দেখা করে।"
চিত্রসেন উর্বশীর কাছে গিয়ে খবরটা দিলেন, এবং একজন গন্ধর্বসুলভ চাতুর্যের সাথে অর্জুনের রূপ ও বীরত্বের একখানা সুন্দর বর্ণনাও জুড়ে দিলেন।
উর্বশী মন দিয়ে শুনলেন। অর্জুনের বীরত্বের কথা তিনি আগে থেকেই জানতেন। এখন দেবরাজের সম্মতি পেয়ে তিনি আর কোনো দ্বিধা রাখলেন না।
তিনি চিত্রসেনকে বললেন, "আমি অর্জুনের গুণের কথা জানি। আমি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট। দেবরাজের কথায় আমার সে ইচ্ছা আরও বাড়ল। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো—আমি আজ রাতেই তাঁর কাছে যাব।"
উর্বশী সুবাসিত জলে স্নান করলেন, শ্রেষ্ঠ বসন আর অলংকারে নিজেকে সাজালেন এবং অভিসারে চললেন অর্জুনের কক্ষের দিকে।
অর্জুন দরজায় পায়ের শব্দ পেয়ে ফিরলেন। রাতের আলোয় উর্বশীকে অমন মোহময়ী রূপে নিজের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাঁর মনের ভেতর এক লহমায় অনেকগুলো চিন্তা খেলে গেল।
তিনি খানিকটা ইতস্তত করলেন। তারপর চোখ বন্ধ করলেন। উর্বশীকে প্রণাম জানালেন ঠিক যেভাবে একজন সন্তান তার গুরুজনকে প্রণাম করে—হাত দুটো জোড় করে, মাথা নিচু করে। যখন কথা বললেন, তাঁর মুখ থেকে বেরোলো এক পরম শ্রদ্ধার শব্দ—"দেবী"।
"দেবী, আমার প্রণাম গ্রহণ করুন। আমি আপনার সেবক। বলুন, কীভাবে আপনার সেবা করতে পারি?"
উর্বশী থমকে গেলেন। এ তো তাঁর চেনা মর্ত্যের পুরুষদের মতো আচরণ নয়! তিনি কোনো ভণিতা না করে সোজা কথায় নিজের মনের কথা জানালেন। বললেন যে তিনি দেবরাজের নির্দেশে এবং নিজের ইচ্ছায় অর্জুনের কাছে এসেছেন, তাঁর বীরত্বে তিনি মুগ্ধ এবং আজ রাতে তিনি অর্জুনকে নিজের করে পেতে চান।
কথাগুলো শুনে অর্জুন দুই কানে হাত চাপা দিলেন।
"দেবী! এ কথা আমার কানে তুলবেন না। আমি যখন প্রথম আপনাকে দেখেছিলাম, আমার মনে কোনো কামনার লেশ ছিল না। আমি আপনাকে আমাদের পুরু বংশের জননী হিসেবে দেখছিলাম। সেই শ্রদ্ধাতেই আমি তাকিয়ে ছিলাম, কোনো লালসায় নয়।" অর্জুন অত্যন্ত স্পষ্ট গলায় বললেন, "আপনি আমার পূর্বপুরুষদের জননী, আমার মায়ের চেয়েও বড়।"
উর্বশী হাল ছাড়লেন না। তিনি স্বর্গের নিয়ম বোঝালেন, অপ্সরাদের স্বাধীনতার কথা বললেন। বললেন যে স্বর্গের অপ্সরাদের ক্ষেত্রে মর্ত্যের মা বা পিসির মতো সম্পর্ক খাটে না। তিনি অর্জুনকে অনুরোধ করলেন তাঁর মনের আগুন শান্ত করতে।
কিন্তু অর্জুনের উত্তর নড়ল না। "আমি সত্য বলছি, দেবী। আপনি আমার কাছে মাতা কুন্তীর মতো, মাতা মাদ্রীর মতো, স্বয়ং শচীদেবীর মতো শ্রদ্ধেয়। আমি আপনার চরণে প্রণাম জানাই। আমাকে আপনার পুত্র বলে মনে করুন।"
এরপর যে নিস্তব্ধতা নামল, তা কেবল তখনই নামে যখন কোনো চরম সত্যি কথা কেউ পাথরের মতো ছুঁড়ে দেয়।
উর্বশী কেঁপে উঠলেন। যে সহজ অনুরাগ নিয়ে তিনি এসেছিলেন, তা এক মুহূর্তে তীব্র অপমানে আর ক্রোধে বিষিয়ে গেল। স্বর্গের সবচেয়ে রূপবতী নারীকে ফিরিয়ে দেওয়া হলো এক বয়স্কা মায়ের সম্মান দিয়ে! এই প্রত্যাখ্যান নিষ্ঠুর ছিল না, কিন্তু এর ভেতরের ভদ্রতাটাই উর্বশীকে বেশি আঘাত করল।
তাঁর ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
"আমি তোমার পিতা ইন্দ্রের কথায় এসেছিলাম," উর্বশী তীব্র আক্রোশে বললেন, "আমি কামনা নিয়ে এসেছিলাম, আর তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিলে! যাও, তুমি মর্ত্যে নপুংসক হয়ে থাকবে। নারীদের মাঝে নর্তক হয়ে বাঁচবে তুমি!"
উর্বশী হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। ঘরের হাওয়াটা ভারী হয়ে রইল।
(উর্বশীর জন্ম বৃত্তান্ত জানতে এখানে ক্লিক করুন)
দেবরাজের আশ্বাস
অর্জুন সাথে সাথে চিত্রসেনের কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বললেন। চিত্রসেনও বুঝলেন যে জল বেশিদূর গড়ানোর আগেই দেবরাজকে জানানো দরকার। তিনি ইন্দ্রকে সব বললেন।
ইন্দ্র অর্জুনকে ডেকে পাঠালেন।
দেবরাজ তাঁর এই ছেলের দিকে তাকালেন—যে ছেলে স্বর্গের সবচেয়ে সুন্দরী নারীর মোহকে এক নিমেষে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে, যে কামনার সামনে দাঁড়িয়ে অপর পক্ষকে মা বলে ডাকতে পারে, সে আর যাই হোক, সাধারণ মানুষ নয়। ইন্দ্রের নিজের চরিত্র অনেক জায়গাতেই জটিল ও কুটিল, কিন্তু এই মুহূর্তে ছেলের এই চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখে তাঁর মন শ্রদ্ধায় ভরে উঠল।
তিনি একটু হাসলেন, সেই হাসিটা চওড়া নয়, এক গোপন আনন্দের হাসি।
"বৎস অর্জুন, মাতা কুন্তী সত্যিই ধন্য যে তোমার মতো পুত্র পেয়েছেন। তুমি নিজের ধৈর্য দিয়ে স্বর্গের ঋষিদেরও হারিয়ে দিলে। অন্য কোনো পুরুষ হলে এই পরিস্থিতিতে ধর্মের হাজারো অজুহাত খুঁজে নিত।" ইন্দ্র একটু থামলেন, তারপর বললেন, "আর উর্বশীর এই অভিশাপ? ওটা অভিশাপ নয় অর্জুন, ওটাই তোমার সবচেয়ে বড় ভাগ্য।"
ইন্দ্র বুঝিয়ে বললেন। বনবাসের ত্রয়োদশ বছর—অর্থাৎ অজ্ঞাতবাসের সময়টা এখনো বাকি। সেই একটা বছর পাঁচ ভাইকে এমনভাবে লুকিয়ে থাকতে হবে যে, কেউ যদি চিনে ফেলে, তবে আবার বারো বছরের বনবাস শুরু হবে। অর্জুনের মতো একজন দীর্ঘদেহী, বীরযোদ্ধাকে সাধারণ পোশাকে লুকিয়ে রাখা অসম্ভব ছিল। তাঁর হাঁটাচলা, তাঁর হাতের ধনুকের দাগ—সবাই তাঁকে চিনে ফেলত।
"উর্বশীর এই অভিশাপ তোমাকে ঠিক এক বছরের জন্য এক নর্তক ক্লীবের রূপ দেবে। তুমি বিরাট রাজার প্রাসাদে 'বৃহন্নলা' সেজে রাজকুমারীদের নাচ-গান শেখাবে। কেউ তোমাকে সন্দেহও করবে না, কারণ সেটা কোনো অভিনয় হবে না, সেটাই হবে তোমার তখনকার সত্যি রূপ। আর এক বছর শেষ হতেই তুমি আবার তোমার পুরুষত্ব ফিরে পাবে।"
যেটাকে শাস্তি মনে হচ্ছিল, সেটা আসলে হয়ে উঠল এক দুর্ভেদ্য বর্ম। অর্জুনের মনের সমস্ত মেঘ কেটে গেল।
ঋষি লোমশের বিস্ময়
এর কিছুদিন পর মহর্ষি লোমশ এলেন ইন্দ্রের সভায়।
তিনি চারপাশটা দেখছিলেন নিজের অভ্যস্ত শান্ত চাউনিতে, আর তখনই তাঁর চোখ গিয়ে পড়ল ইন্দ্রের সিংহাসনের ওপর। সেখানে দেবরাজের পাশে, সেই দিব্য সিংহাসনের ঠিক অর্ধেকটা জুড়ে অত্যন্ত সহজভাবে বসে আছেন অর্জুন! যেন ওটাই তাঁর চিরকালের বসার জায়গা।
লোমশ থমকে দাঁড়ালেন।
তিনি অনেক দেখেছেন জীবনে, কিন্তু মর্ত্যের এক সাধারণ মানুষ—যে কিনা এখন বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যার ভাইয়েরা চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে—সে স্বর্গের রাজার পাশে এভাবে বসে আছে, এটা তাঁর চেনা যুক্তিতে মিলছিল না। তাঁর মনে অনেকগুলো প্রশ্ন দানা বাঁধল।
ইন্দ্র লোমশের মনের ভাব বুঝে হেসে উঠলেন।
"মহর্ষি, আপনার মনে যে প্রশ্ন জেগেছে, আমি না শুনতেই তার উত্তর দিচ্ছি।" দেবরাজ বলতে লাগলেন, "অর্জুন শুধু মানুষ নন। তিনি মানবদেহ ধারণ করেছেন ঠিকই, কিন্তু ওঁর ভেতরে রয়েছে এক পরম দিব্য সত্তা। উনি হলেন সনাতন ঋষি 'নর'—যিনি সৃষ্টির শুরু থেকে বদরিকাশ্রমে নারায়ণের পাশে বসে তপস্যা করতেন। এই যুগের প্রয়োজনে তিনি মর্ত্যে জন্ম নিয়েছেন।"
ইন্দ্র লোমশকে বোঝালেন নিবাতকবচ নামের সেই ভয়ানক অসুরদের কথা, যারা ব্রহ্মার বরে অন্ধ হয়ে দেবতাদেরও হারিয়ে দিচ্ছিল।
(নিবাতকবচের জন্ম বৃত্তান্ত জানতে এখানে ক্লিক করুন)
তিনি কৃষ্ণের কথাও বললেন। ইন্দ্র বললেন যে কৃষ্ণ চাইলে এক নিমেষে এই অসুরদের শেষ করে দিতে পারতেন, ঠিক যেমন কালিন্দী নদীর বুকে কালিয়া নাগকে তিনি অনায়াসে দমন করেছিলেন। (কালিন্দী নদীর বুকে কালিয়া নাগ দমন বৃত্তান্ত জানতে এখানে ক্লিক করুন)
কিন্তু কৃষ্ণের সেই রুদ্র রূপ যদি একবার জেগে ওঠে, তবে শুধু অসুর নয়, গোটা মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। একটা প্রদীপ জ্বালাতে কেউ দাবানল ডাকে না!
"এই কাজের জন্য অর্জুন একাই যথেষ্ট," ইন্দ্র বললেন।
তারপর ইন্দ্র কাজের কথায় এলেন। তিনি লোমশকে বললেন, "আপনি এবার মর্ত্যে যান, কাম্যক বনে। যুধিষ্ঠিরকে গিয়ে বলুন যে অর্জুন ভালো আছে, সে স্বর্গে সুরক্ষিত। সে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, সব রকম দিব্য অস্ত্র সে আয়ত্ত করেছে। অস্ত্র ছাড়াও সে নাচ, গান আর নাট্যকলাতেও পারদর্শী হয়েছে। আপনি পান্ডবদের বলুন এবার তীর্থযাত্রায় বেরোতে, তীর্থভ্রমণ করলে ওদের মন শান্ত হবে। আর আপনি নিজে মর্ত্যে থাকাকালীন ওদের আগলে রাখবেন।"
লোমশ সব শুনলেন। ঋষিরা যেভাবে মন দিয়ে কথা শোনেন, সেভাবেই শুনলেন। তারপর দেবরাজকে প্রণাম জানিয়ে মর্ত্যের দিকে রওনা হলেন।
তিনি এসেছিলেন এক বুক প্রশ্ন নিয়ে, আর ফিরে যাচ্ছেন সব উত্তর আর একটা মস্ত বড় দায়িত্ব নিয়ে। তাঁর চোখে তখনো ভাসছে সেই দৃশ্য—দেবরাজের সিংহাসনের অর্ধেকটা জুড়ে এক মর্ত্যের বীর শান্ত হয়ে বসে আছে, কোনো অহংকার নেই, কোনো বিস্ময় নেই—যেন এই সম্মান তাঁরই প্রাপ্য ছিল।
ইন্দ্রের রথ একদিন হিমালয় থেকে অর্জুনকে নিয়ে এসেছিল স্বর্গের আলোয়। আর আজ ঋষি লোমশ ফিরে যাচ্ছেন মর্ত্যের সেই অন্ধকার বনের দিকে—চার ভাই আর এক রানীর কাছে এই সুখবরটা পৌঁছে দিতে যে, তাঁদের মেজো ভাই হারিয়ে যায়নি, সে তৈরি হচ্ছে। সে এমন এক শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, যা আগামী দিনের সেই মহাসংগ্রামের জন্য বড্ড বেশি প্রয়োজন ছিল।
সব প্রস্তুতি চলছে নিজের নিয়মে। চাকা ঘুরছে মহাকালের ইশারায়।
বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬টি ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের ১৩ পর্বের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।
Go to all publications for full reading as per index

Comments
Post a Comment