অর্জুনের পরীক্ষা: মহাভারতের সেই অমোঘ মুহূর্ত: যখন ব্যাধের বেশে দেখা দিলেন মহাদেব ও পাশুপাত অস্ত্র লাভ

 অর্জুনের পরীক্ষা: মহাভারতের সেই অমোঘ মুহূর্ত: যখন ব্যাধের বেশে দেখা দিলেন মহাদেব ও পাশুপাত অস্ত্র লাভ


হিমালয়ের তুষারধবল শৃঙ্গগুলো পেরিয়ে অর্জুন যখন আরও গভীরে প্রবেশ করলেন, তখন চারপাশের প্রকৃতি এক অন্য রূপ ধারণ করল। সামনেই এক আদিম, নিবিড় অরণ্য। চারপাশটা কাঁটাঝোপে ভরা, অথচ কেমন যেন একটা অদ্ভুত, গা ছমছমে সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে তার বুকে। এই জনহীন, বুনো পরিবেশেও অর্জুনের অশান্ত, চঞ্চল মনটা এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। তাঁর মনে হলো, এই অরণ্য যেন বহু যুগ ধরে শুধু তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছিল। কোনো এক না-বলা মায়ায় তিনি জড়িয়ে পড়লেন এই নির্জনতার সঙ্গে।

তপস্যার প্রস্তুতি নিতে তাঁর দেরি হলো না। কুশ ঘাস সংগ্রহ করে নিজেই বুনে নিলেন বসার আসন। পরনে হরিণের চামড়া, হাতে দণ্ড আর কমণ্ডলু নিয়ে অর্জুন মগ্ন হলেন কঠোর তপস্যায়।

প্রথম মাসে তাঁর আহার বলতে কেবল শুকনো পাতা, তাও তিন দিনে মাত্র একবার। দ্বিতীয় মাসে সেই কৃচ্ছ্রসাধন আরও বাড়ল—এবার ছয় দিনে একবার মাত্র আহার। তৃতীয় মাস আসতে আসতে পাক্ষিক ব্রত নিলেন, অর্থাৎ পনেরো দিনে একবার মাত্র কিছু মুখে দিতেন। আর চতুর্থ মাসে এসে অর্জুন সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে, দুটি বাহু আকাশের দিকে টানটান করে তুলে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন দিনের পর দিন। খাদ্য নেই, জল নেই—কেবল বাতাসটুকুই তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। প্রতিদিন ভোরে পাহাড়ি ঝোরার বরফগলা জলে স্নান করতেন তিনি। হিমালয়ের সেই কনকনে জল আর উত্তপ্ত রোদে বারবার ভিজতে ও শুকোতে শুকোতে তাঁর জটাবদ্ধ চুলগুলো কালক্রমে এক অদ্ভুত উজ্জ্বল সোনালি বর্ণ ধারণ করল।

সেই দুর্গম উচ্চতায় যে সমস্ত ঋষি ও মুনিরা বিচরণ করতেন, তাঁরা এই অলৌকিক দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এক রাজপুত্রের এমন অমানুষিক তপস্যার কথা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। অবশেষে উদ্বিগ্ন ঋষিকুল স্বয়ং দেবদেব শংকরের শরণাপন্ন হলেন।

কৈলাসে পৌঁছে তাঁরা মহাদেবকে বিনম্র কণ্ঠে বললেন, "প্রভু, পাণ্ডবদের তৃতীয় ভ্রাতা অর্জুন যে তপস্যা শুরু করেছে, তার তীব্রতা মানুষের কল্পনার বাইরে। পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সে যেন দ্বিতীয় এক সূর্যের মতো জ্বলছে। তাঁর এই কঠোর তপস্যার উত্তাপ এখন স্বর্গকেও ব্যাকুল করে তুলেছে।"

শংকর ঋষিদের কথা শুনলেন শান্ত মুখে। তাঁর অর্ধনিমীলিত চোখে কোনো আলোড়ন জাগল না। তারপর তাঁর ওষ্ঠাধরে ফুটে উঠল এক মৃদু, রহস্যময় হাসি।

তিনি শুধু বললেন, "আজ আমি অর্জুনের সেই বহুকাঙ্ক্ষিত ইচ্ছা পূরণ করব।"

ঋষিরা চলে যাওয়ার পর দেবদেব শংকর এক বিচিত্র লীলা রচলেন। মুহূর্তে তিনি নিজের দিব্যরূপ সংবরণ করে ধারণ করলেন এক কিরাত বা ব্যাধের রূপ। তামাটে, রুক্ষ ত্বক, পরনে বুনো পাতার পোশাক। তাঁর সঙ্গে এলেন দেবী পার্বতী—তিনিও সেজেছেন ব্যাধ-রমণী। আর তাঁদের অনুগামী প্রমথ গণরা রূপ নিল শিকারী ও বনচারী প্রেতাত্মাদের। পাহাড়ের গা বেয়ে তারা এমনভাবে নেমে এলো, যেন এই অরণ্যের গাছপালার মতোই তারা এই মাটির স্বাভাবিক সন্তান। কোনো আড়ম্বর নেই, কোনো দেবত্ব নেই—নিছকই একদল বুনো শিকারী।

ঠিক সেই মুহূর্তেই সেখানে এক উপদ্রব ঘটল। দুর্যোধনের চক্রান্তে ‘মুক’ নামের এক ভয়ানক অসুর এক অতিকায় বুনো শুয়োরের রূপ ধারণ করে জঙ্গল ভেঙে ধেয়ে আসছিল। তার চোখে রক্তলোলুপ হিংসা, লক্ষ্য সোজা ধ্যানমগ্ন অর্জুন।

সেই পশুর খুরের আওয়াজে মাটি কেঁপে উঠল। অর্জুন চোখ মেললেন। কিন্তু তাঁর বুকে ভয়ের কোনো রেখাপাত হলো না। অত্যন্ত চটজলদি তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘গাণ্ডীব’ ধনুতে জুড়ে নিলেন এক সর্পমুখী বাণ। ধমক দিয়ে উঠলেন, "রে দুরাচার! তপস্যারত এক নিরীহ মানুষকে আক্রমণ করতে চাস? আয় তবে, দেখবি পাণ্ডব অর্জুনের বাণের কেমন ধার!"

জ্যা-মুক্ত হলো অর্জুনের তীর।

কিন্তু ঠিক সেই একই ভগ্নাংশে, অন্য দিক থেকে ছুটে এলো কিরাতরূপী শিবের ধনুকের তীর।

দুটি তীর সমান্তরালে ছুটে গিয়ে একসঙ্গে বিঁধল সেই বরাহের শরীরে। এক বজ্রগম্ভীর আর্তনাদ করে মাটিতে আছড়ে পড়ল মায়াবী অসুর। অর্জুন এবং সেই শিকারী—দুজনেই আরও কয়েকটি বাণ মেরে সেই পতিত অসুরকে ঝাঁঝরা করে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুকের ছদ্মবেশী দেহটা নিস্পন্দ হয়ে গেল।

অর্জুন এবার ভ্রূ কুঁচকে ফিরলেন সেই শিকারীর দিকে। তাঁর কণ্ঠে ক্ষোভ ও আভিজাত্যের অহংকার, "কে তুমি? এই জনমানবহীন অরণ্যে দলবল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ? এই বুনো শুয়োরটি আমাকে আক্রমণ করতে আসছিল, সুতরাং একে বধ করার অধিকার একমাত্র আমারই ছিল। তুমি কেন মাঝখান থেকে এই বিবাদ তৈরি করলে? স্পষ্ট বলছি, যদি এই নিয়ে তর্ক বাড়াতে চাও, তবে এই পশুর মতোই তোমার গতি করব।"

কিরাতের চোখে তখন এক কৌতুকী আলো। সে অবজ্ঞার সুরে বলল, "শোনো রাজপুত্র, বুনো শুয়োরটাকে প্রথমে আমিই দেখেছি। আমার তীরেই ও মরেছে। বিশ্বাস না হলে এসে দেখে যাও কার তীর ওর মরণ-বিন্দু ছুঁয়েছে। তা, এসব ফালতু তর্ক না করে বরং একটু যুদ্ধ হয়ে যাক? দেখি কেমন তোমার মুরোদ!"

অর্জুনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। একজন সামান্য ব্যাধের মুখে এত বড় স্পর্ধা! তিনি তূণীর থেকে তীর বের করে একের পর এক নিক্ষেপ করতে লাগলেন। সেই বাণ যেমন তীব্র, তেমনই নিখুঁত—যা অতীতে বহু বড় বড় রাজাদের দর্প চূর্ণ করেছে, সৈন্যদলকে ছত্রভঙ্গ করেছে। কিন্তু এ কী অলৌকিক কাণ্ড! সেই কিরাত একচুলও নড়ল না। অর্জুনের ছোঁড়া প্রতিটি তীর সে যেন মাছি তাড়ানোর মতো তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে লাগল, আর তার ঠোঁটে লেগে রইল এক চিলতে শ্লেষের হাসি।

"বাহ্, থেমো না!" কিরাত উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল, "মারো, আরও জোরে মারো! তোমার তীরের কি এই জোর?"

অর্জুন স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাঁর কোনো বাণই এই শিকারীর গায়ে একটা আঁচড় পর্যন্ত কাটতে পারল না। দেখতে দেখতে তাঁর অক্ষয় তূণীর খালি হয়ে গেল। মরিয়া হয়ে তিনি নিজের ধনুকটাকেই গদার মতো ঘুরিয়ে আঘাত করতে গেলেন। কিন্তু কিরাত অত্যন্ত অনায়াসে, যেন কোনো শিশুর হাত থেকে খেলনা কেড়ে নেওয়ার মতো করে গাণ্ডীব ধনুটি তাঁর হাত থেকে কেড়ে নিল।

এবার অর্জুন খাপ থেকে তলোয়ার বার করলেন। কিন্তু সেই ইস্পাতের তলোয়ার কিরাতের পাথুরে শরীরে আঘাত করতেই কাঁচের মতো টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেল।

অস্ত্রহীন অর্জুন তখন নিজের বজ্রমুষ্টি পাকিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিরাত শুধু একবার—মাত্র একবার নিজের শক্ত হাত দিয়ে আঘাত করল অর্জুনকে। সেই একটি আঘাতেই অর্জুনের পৃথিবীটা দুলতে দুলতে অন্ধকার হয়ে গেল। তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

যখন অর্জুনের চেতনা ফিরল, তিনি দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইলেন। সমস্ত অস্ত্র হাতছাড়া, সারা শরীরে তীব্র যন্ত্রণা। জীবনে এই প্রথম তিনি এইভাবে, এত শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলেন। অথচ তিনি জানেনও না, কার কাছে এই পরাজয়।

কিন্তু অর্জুনের ভেতরের ক্ষত্রিয় তেজ তখনও মরেনি।

তিনি উঠে দাঁড়ালেন। অরণ্যের মাটি তুলে নিয়ে নিজের হাত দিয়ে গড়ে তুললেন দেবদেব শংকরের এক রুক্ষ মৃন্ময় মূর্তি। বনের কিছু বুনো ফুল কুড়িয়ে এনে সেই মূর্তির সামনে রাখলেন এবং পরম আকুলতায়, নিজের দীর্ঘ মাসের তপস্যার সমস্ত আর্তি ঢেলে দিয়ে প্রার্থনা করতে লাগলেন।

তখনই এক অবিশ্বাস্য অলৌকিক ঘটনা ঘটল।

অর্জুন লক্ষ্য করলেন, পূজার ফুলগুলো যখনই তিনি মাটির শিবমূর্তির মাথায় ছোঁয়াচ্ছেন, সেগুলো সেখানে থাকছে না। শূন্যে ভেসে, এক অদৃশ্য মায়ায় স্থানান্তরিত হয়ে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কিরাতের মাথায় গিয়ে জমা হচ্ছে!

অর্জুন পাথরের মতো স্থির হয়ে গেলেন।

তিনি আবার তাকালেন সেই শিকারীর দিকে। এবার আর অহংকার বা ক্রোধের চোখে নয়, অন্তরের সমস্ত চেতনা দিয়ে তিনি চেয়ে দেখলেন। এক মুহূর্তে তাঁর মনের ভেতরের সব অন্ধকার কেটে গেল।

পরম ভক্তিতে, অনুশোচনায় অর্জুন সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করলেন সেই কিরাতের পায়ের কাছে।

দেবদেব শংকর—যিনি প্রথম থেকেই কিরাতের ছদ্মবেশে অর্জুনকে পরীক্ষা করছিলেন—তিনি এবার পাণ্ডুপুত্রের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ থেকে ঝরে পড়ছে স্বর্গীয় করুণা আর স্নেহ। তাঁর কণ্ঠস্বর যেন হিমালয়ের গুহা থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে আসা কোনো গম্ভীর নাদ।

"উঠো অর্জুন। আমি প্রীত হয়েছি। এই মর্ত্যলোকে তোমার সমকক্ষ দ্বিতীয় কোনো ক্ষত্রিয় নেই। তোমার বিক্রম, তোমার সহনশীলতা আজ আমার শক্তির পরীক্ষা নিয়েছে। আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট।"

মহাদেব হাত বাড়িয়ে অর্জুনকে ভূমি থেকে তুললেন। আর ওঠার সাথে সাথেই অর্জুনের চোখের সামনে থেকে ব্যাধের রূপ মিলিয়ে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং ত্রিপুরারি, নীলকণ্ঠ মহাদেব—ত্রিনয়ন, জটাজুটধারী, ভয়ংকর অথচ পরম সুন্দর তাঁর সেই দিব্য রূপ।

"তুমি সাধারণ মানুষ নও অর্জুন, তুমি আসলে নর-নারায়ণের সেই শাশ্বত ‘নর’ ঋষি, মর্ত্যে জন্ম নিয়েছ," শিব বললেন, "আমি তোমাকে এমন জ্ঞান দেব, যা দিয়ে তুমি কেবল পৃথিবীর শত্রু নয়, দেবতাদেরও জয় করতে পারবে। আর দেব তোমাকে এমন এক অস্ত্র, যার প্রতিরোধ করার ক্ষমতা এই সৃষ্টিতে কারও নেই।"

অর্জুনের চোখ দিয়ে তখন অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তিনি শিব ও পার্বতীর চরণে মাথা রেখে গদগদ কণ্ঠে স্তব শুরু করলেন:

"হে দেবদেবেশ, হে মহাদেব, তুমিই এই নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের হিতৈষী। সমুদ্রমন্থনের সেই নীল বিষ তুমি নিজের কণ্ঠে ধারণ করেছ। তুমি সর্বব্যাপী, ত্রিনেত্র, সমস্ত সৃষ্টির আদি কারণ এবং দেবতাদের আশ্রয়স্থল। তোমাকে পরাজিত করে এমন সাধ্য কার আছে? তুমিই শিব, তুমিই বিষ্ণু। আমি তোমার চরণে প্রণাম জানাই প্রভু। এই অজ্ঞ ব্যাধের রূপ আমি চিনতে পারিনি, মূর্খতাবশত তোমার দিকেই ধনু তুলেছি। আমার এই পরম অপরাধ তুমি মার্জনা করো প্রভু।"

মহাদেব উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন—সেই হাসি অরণ্যের পাতাগুলোকে কাঁপিয়ে দিল।

"তোমার কোনো অপরাধ হয়নি অর্জুন," পরম স্নেহে তিনি অর্জুনকে বুকে টেনে নিলেন।

তারপর তাঁর মুখমণ্ডল গম্ভীর হলো। "মনে রেখো অর্জুন, কৃষ্ণের নারায়ণ রূপের সঙ্গে তোমার এই নর রূপের জুটি শাশ্বত। তোমরাই দুজনে মিলে এই পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করো। অতীতে দেবাসুর সংগ্রামে তোমরা দুজনেই ধনুকের টংকারে দানবদের দর্প চূর্ণ করেছিলে। আজ কিরাতরূপে আমি শুধু তোমার পরীক্ষা নিচ্ছিলাম। এই নাও, তোমার গাণ্ডীব আমি তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।"

মহাদেব পুনরায় গাণ্ডীব ধনুটি অর্জুনের হাতে তুলে দিলেন।

"আজ থেকে তুমি রোগমুক্ত হলে। যুদ্ধে তুমি চিরকাল অপরাজেয় থাকবে। এবার বলো, তোমার মনের কাঙ্ক্ষিত বরটি কী?"

অর্জুন এক মুহূর্তও দ্বিধা করলেন না। "প্রভু, আপনি যদি সত্যিই আমার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন, তবে আমাকে সেই অলৌকিক ‘পাশুপাত’ অস্ত্র প্রদান করুন। মহাপ্রলয়ের সময় যা এই সৃষ্টিকে ধ্বংস করতে পারে। আমাকে সেই অস্ত্রে দীক্ষিত করুন, যাতে আসন্ন ধর্মযুদ্ধে আমি অধর্মের সমস্ত শক্তিকে বিনাশ করতে পারি।"

মহাদেব স্থির দৃষ্টিতে অর্জুনের দিকে তাকালেন। "আমি তোমাকে পাশুপাত দেব, অর্জুন। কিন্তু এর প্রয়োগবিধি অত্যন্ত কঠোর। কখনো কোনো সাধারণ বা দুর্বল শত্রুর ওপর এর অপপ্রয়োগ করবে না। যখন দেখবে আর কোনো পথ অবশিষ্ট নেই, চরম সংকটে কেবল তখনই এর আবাহন করবে।"

অর্জুন পুনরায় স্নান সেরে, মনকে সম্পূর্ণ শান্ত ও পবিত্র করে শিবের সামনে এসে দাঁড়ালেন। "প্রভু, আমাকে এই অস্ত্রের দীক্ষা ও মন্ত্র দান করুন।"

মুহূর্তের মধ্যে সেই পরম শক্তিশালী পাশুপাত অস্ত্র অর্জুনের সামনে আবির্ভূত হলো। অর্জুন তা গ্রহণ করলেন। সাথে সাথে সমগ্র অরণ্য এক অলৌকিক, তীব্র আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। সেই আলোর ছটা জঙ্গল, পর্বত, গ্রাম ও নগর পেরিয়ে যেন মহাকাশ পর্যন্ত ছুঁয়ে গেল—মনে হলো যেন এক সেকেন্ডের জন্য স্বয়ং সূর্যদেব আকাশ থেকে নেমে এসেছেন এই পাহাড়ে।

পরক্ষণেই, অর্জুনের হাতে গাণ্ডীব সমর্পণ করে মহাদেব শূন্যে মিলিয়ে গেলেন।

নিস্তব্ধ অরণ্যে অর্জুন একা দাঁড়িয়ে গভীর শ্বাস নিলেন।

তিনি তখনও সেই আলোর রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেননি, এমন সময় আকাশমণ্ডল আবার আলোকময় হয়ে উঠল। স্বর্গ থেকে নেমে এলেন লোকপাল দেবতারা—জলদেবতা বরুণ, যক্ষরাজ কুবের, সূর্যপুত্র যমরাজ এবং দেবরাজ ইন্দ্র। তাঁদের সঙ্গে মন্দর পর্বত থেকে নেমে আসা দেবদূতের দল চারপাশটা স্বর্গের পারিজাত সুবাসে ভরিয়ে দিল।

সর্বপ্রথম এগিয়ে এলেন যমরাজ। তাঁর কণ্ঠস্বর সন্ধ্যার বাতাসের মতোই শান্ত ও গম্ভীর।

"অর্জুন, আমাদের দিকে তাকাও। তোমার এই অনন্য সাধারণ তপের খাতিরে আজ সমস্ত দেবতারা তোমার সামনে উপস্থিত। তোমার এই দিব্য চক্ষু দিয়ে আমাদের দর্শন করো। তুমি আর শ্রীকৃষ্ণ মিলে এই পৃথিবীর পাপের ভার লাঘব করবে। আমি তোমাকে আমার এই দণ্ড প্রদান করছি, এর আঘাত কেউ সহ্য করতে পারে না।"

অর্জুন অত্যন্ত বিনম্রতার সঙ্গে সেই দণ্ড গ্রহণ করলেন এবং তার গোপন মন্ত্র ও প্রয়োগকৌশল শিখে নিলেন।

এরপর এগিয়ে এলেন বরুণদেব। "আমি জলের দেবতা বরুণ। আমার এই ‘অমোঘ পাশ’ আজ পর্যন্ত কখনো ব্যর্থ হয়নি। তারকাসুরের সঙ্গে যুদ্ধের সময় এই পাশ দিয়েই আমি হাজার হাজার দানবকে বন্দি করেছিলাম। আজ থেকে এটি তোমার হলো।"

অর্জুন কৃতজ্ঞচিত্তে তা গ্রহণ করলেন।

যক্ষরাজ কুবের মৃদু হেসে বললেন, "অর্জুন, পূর্বজন্মে তুমি আমার পরম সুহৃদ ছিলে। আজ আমি তোমাকে আমার ‘অন্তর্ধান’ নামের এই মায়াবী অস্ত্র দিচ্ছি, যা স্বয়ং মহাদেব ত্রিপুরাসুর বধের সময় ব্যবহার করেছিলেন। তুমিই এই অস্ত্রের যোগ্য অধিকারী।"

সবশেষে মেঘমন্দ্র স্বরে কথা বলে উঠলেন দেবরাজ ইন্দ্র।

"পুত্র অর্জুন, দেবতাদের বহু কাজ এখনো তোমার হাত দিয়ে হওয়া বাকি আছে। তোমাকে অমরাবতীতে—স্বর্গে আসতে হবে। আমার সারথি মাতলি রথ নিয়ে মর্ত্যে আসবে তোমাকে নিয়ে যেতে। সেখানেই আমি তোমাকে আমার নিজস্ব বজ্রসহ সমস্ত স্বর্গীয় অস্ত্র প্রদান করব।"

একে একে সমস্ত দেবতারা পাণ্ডুপুত্রকে তাঁদের আশীর্বাদ ও অস্ত্র উপহার দিলেন। অর্জুনও শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে, প্রত্যেক দেবতার উদ্দেশ্যে যথাযথ উপাচার ও প্রণাম নিবেদন করলেন। তারপর, যেমনভাবে এসেছিলেন, তেমনই ধীরে ধীরে সেই স্বর্গীয় আলো মিলিয়ে গেল আকাশের বুকে। দেবতারা ফিরে গেলেন যাঁর যাঁর লোকে। অরণ্য আবার ফিরে পেল তার আদিম নীরবতা।

হিমালয়ের সেই নিস্তব্ধ নিঝুম বুকে অর্জুন একা দাঁড়িয়ে রইলেন। কিন্তু এখন আর তিনি নিঃসঙ্গ বা অস্ত্রহীন নন। তাঁর হাতে এখন এমন সব ধন-সম্পদ ও অস্ত্র, যা কোনো মর্ত্যের রাজার নয়—যা সরাসরি দেবতাদের নিজস্ব বৈভব। এক পরম শান্তিতে ও আত্মবিশ্বাসে অর্জুনের বুক ভরে উঠল।


আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন


বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬টি ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের দ্বাদশ পর্বের সংক্ষিপ্ত আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।


Go to all publications for full reading as per index




Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া