ইন্দ্রজিৎ: স্বর্গজয়ের রক্তিম ইতিহাস
ইন্দ্রজিৎ: স্বর্গজয়ের রক্তিম ইতিহাস
লঙ্কার রাজসভায় সেদিন যে আলো জ্বলছিল, তা কোনো সাধারণ প্রদীপের আলো নয়। তা ছিল এক অহংকারী সাম্রাজ্যের দাপট আর মহাশক্তির ঔদ্ধত্য। রাক্ষসরাজ রাবণ সিংহাসনে বসে আছেন, আর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে এক তরুণ—যার চোখে মুখে আগুনের মতো তেজ, যেন সাক্ষাৎ মহাকাল নেমে এসেছে মর্ত্যে।
সেই তরুণের নাম তখন মেঘনাদ। তখনও সে ‘ইন্দ্রজিৎ’ হয়ে ওঠেনি।
রাবণের তখন প্রবল প্রতাপ। ত্রিভুবন কাঁপছে তাঁর পদভারে। কিন্তু কেবল লঙ্কায় রাজত্ব করে যাঁর মন ভরে না, সেই রাক্ষসরাজের চোখ গিয়ে পড়ল দেবলোকের ওপর। স্বর্গের অধিপতি দেবরাজ ইন্দ্রের অহংকার চূর্ণ করার জন্য রাবণ বাহিনী নিয়ে দেবলোকের দিকে যাত্রা করলেন। পিতার সেই বিশ্বজয়ের অভিযানে অনুগামী হলেন তরুণ বীর মেঘনাদ।
স্বর্গ ও লঙ্কার সেনার মধ্যে শুরু হলো এক প্রলয়ংকর যুদ্ধ। দেবতাদের তীক্ষ্ণ বাণ আর দেবরাজ ইন্দ্রের বজ্রের আঘাতে রাক্ষসসেনারা যখন ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে শুরু করল, রাবণ নিজেই নেমে এলেন রণক্ষেত্রে। ইন্দ্রের সঙ্গে রাবণের যুদ্ধ যেন দুটো প্রবল ঝড়ের মুখোমুখি সংঘর্ষ। কিন্তু প্রবীণ রাবণ একসময় ইন্দ্রের ঐরাবত আর দিব্যাস্ত্রের মহিমায় কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়লেন।
পিতার এই সংকট দেখে স্থির থাকতে পারল না মেঘনাদ। সে আর কেবল একজন রাজপুত্র রইল না, হয়ে উঠল এক দুর্বার কালবৈশাখী।
মেঘনাদ তাঁর রথ ছুটিয়ে দিলেন সরাসরি দেবরাজের সামনে। কিন্তু সাধারণ যুদ্ধের কৌশল মেঘনাদের পছন্দ ছিল না; সে ছিল মায়াযুদ্ধে পরম পারদর্শী। এক নিমেষে রথসহ শূন্যে আত্মগোপন করল মেঘনাদ। ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতারা চারদিকে তাকিয়ে কেবল শূন্য আকাশ দেখতে পেলেন, কিন্তু কোনো বীরকে দেখতে পেলেন না।
পরমুহূর্তেই শুরু হলো সেই দৃশ্য, যা স্বর্গের ইতিহাসে আগে কখনো ঘটেনি। মেঘের আড়াল থেকে মেঘনাদ বরষণ করতে লাগল হাজার হাজার দিব্যাস্ত্র। দেবসেনারা কোথায় আঘাত করবে বুঝতে পারল না। চারদিকে কেবল দেবতাদের আর্তনাদ আর রক্তস্রোত। দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর সহস্র চোখ মেলে চারিদিকে তাকালেন, কিন্তু আড়ালে থাকা সেই ছায়াবীরকে স্পর্শ করার সাধ্য তাঁর ছিল না।
অদৃশ্য মেঘনাদ একের পর এক দেবসেনাপতিকে ধরাশায়ী করে সোজা আক্রমণ করল দেবরাজ ইন্দ্রকে। তাঁর মায়াজাল আর দুর্ধর্ষ বাণের আঘাতে ইন্দ্রের অস্ত্রশস্ত্র ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। স্বর্গাধিপতি ইন্দ্র যখন সম্পূর্ণ অসহায় ও পরাস্ত, তখন মেঘনাদ মেঘের আড়াল থেকে লাফিয়ে নেমে এল। নিজ বাহুবলে দেবরাজকে বন্দি করল সে!
হ্যাঁ, স্বর্গের রাজাকে বন্দি করে নিজের রথে বেঁধে ফেলল এক মর্ত্যের রাক্ষস বীর!
বিজয়উল্লাসে মাতল রাক্ষসসেনারা। বন্দি ইন্দ্রকে রথে চেপে নিয়ে মেঘনাদ ফিরে এল লঙ্কায়। স্বর্গের অধিপতি আজ লঙ্কাপুরীর বন্দী—এ দৃশ্য দেখে রাবণ পরম আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন পুত্রকে।
কিন্তু স্বর্গের এই চরম অপমানে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন জগৎস্রষ্টা ব্রহ্মা। দেবতাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজে উপস্থিত হলেন লঙ্কায়। মেঘনাদের বীরত্বে মুগ্ধ হলেও বিশ্বসংসারের ভারসাম্য রক্ষা করা দরকার ছিল। ব্রহ্মা তরুণ মেঘনাদকে বললেন, "হে বীর, তুমি যা করেছ তা ত্রিভুবনে কেউ করতে পারেনি। দেবরাজকে মুক্ত করে দাও।"
মেঘনাদ কিন্তু অমনি অমনি ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। সে ব্রহ্মার কাছে অমরত্ব প্রার্থনা করল। ব্রহ্মা হাসলেন, বললেন, "সম্পূর্ণ অমরত্ব সৃষ্টিনিয়মের বিরুদ্ধে। তবে আমি তোমাকে বর দিচ্ছি—যুদ্ধে নামার আগে তুমি যদি নিখুঁতভাবে ইষ্টদেবতা অগ্নির যজ্ঞ সম্পন্ন করো, তবে সেই যুদ্ধে তোমাকে কেউ পরাজিত করতে পারবে না।"
মেঘনাদ সেই শর্তে রাজি হয়ে দেবরাজ ইন্দ্রকে মুক্ত করে দিল। আর ঠিক তখনই দেবাদিদেব ব্রহ্মা সেই তরুণ বীরের এক নতুন নামকরণ করলেন—*ইন্দ্রজিৎ'। অর্থাৎ, যিনি ইন্দ্রকে জয় করেছেন।
সেইদিন থেকে মেঘনাদ কেবল রাবণপুত্র রইল না, হয়ে উঠল রামায়ণের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ও রহস্যময় এক যোদ্ধা। কিন্তু মহাকাব্যের নিয়ম বড় অদ্ভুত! যে ইন্দ্রজিৎ স্বর্গ জয় করে দেবরাজকে শৃঙ্খলিত করেছিল, চরম বীরত্ব সত্ত্বেও নিয়তির এক নির্মম পরিহাসে তাকেও একদিন নিজ জন্মভূমির মাটিতেই ঢলে পড়তে হয়েছিল লক্ষ্মণের বাণে। কিন্তু লঙ্কার আকাশে সেই যে এক তরুণ ছায়াবীর ইন্দ্রকে হারিয়ে মহাকাব্যের পাতায় নিজের নাম লিখে রেখেছিল, সেই নাম—ইন্দ্রজিৎ—আজও ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করে।

Comments
Post a Comment