নলকুবেরের অভিশাপ: তপোবন থেকে লঙ্কার পতন


নলকুবেরের অভিশাপ: তপোবন থেকে লঙ্কার পতন

রাবণ তখন ত্ৰিভুবনবিজয়ী। স্বৰ্গ, মৰ্ত্য, পাতাল—তার রথের চাকার ধূলোয় থরথর করে কাঁপে। অহংকার যখন রক্তের শেষ কণিকায় গিয়ে পৌঁছায়, মানুষ হোক বা রাক্ষস, সে তখন নিজের জন্য ধ্বংসের বীজ বুনে ফেলে। লঙ্কাপতি রাবণের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। আর সেই ধ্বংসের সূচনা হয়েছিল এক শান্ত, স্নিগ্ধ শরতের রাতে—অভিশাপের এক অনির্বাণ শিখা হয়ে।

অপ্সরা রম্ভা ও কামান্ধ রাবণ

সেদিন রাবণ দিগবিজয়ে বেরিয়ে স্বর্গলোকের দিকে যাত্রা করছিল। পথিমধ্যে কৈলাস পর্বতের পাদদেশে তার শিবির পড়েছে। জোৎস্নাপ্লাবিত সেই রাতে চারপাশ তখন অদ্ভুত এক মায়াময় স্তব্ধতায় মগ্ন। হঠাৎই রাবণের চোখে পড়ল এক অপরূপা নারী। তিনি স্বর্গের শ্রেষ্ঠ অপ্সরা রম্ভা। রত্নখচিত অলঙ্কারের নূপুরধ্বনি আর অলৌকিক রূপের আলো ছড়িয়ে তিনি যাচ্ছিলেন তাঁর অভিসারের দিকে।

রম্ভাকে দেখামাত্র রাবণের সংযমের বাঁধ ভেঙে গেল। কামাতুর রাবণ পথ আটকে দাঁড়াল অপ্সরার।

রম্ভা চকিত হয়ে বললেন, "লঙ্কেশ্বর! আপনি আমার জ্যেষ্ঠের সমতুল্য। অধর্মের পথে পা বাড়াবেন না।"

কিন্তু কামান্ধ রাবণ সেদিন কোনো নীতিবাক্য শুনতে প্রস্তুত ছিল না। সে গর্জে উঠে বলল, "স্বর্গের অপ্সরাদের আবার কিসের ধর্ম-অধর্ম? তোমরা তো সকলের ভোগ্যা!"

রম্ভা অনুনয়-বিনয় করলেন, হাত জোর করে জানালেন যে তিনি রাবণেরই ভ্রাতুষ্পুত্র নলকুবেরের (কুবেরের পুত্র) বাগদত্তা। সেই সম্পর্কে তিনি রাবণের পুত্রবধূ সমতুল্য। কিন্তু রাবণ ততক্ষণে তার রাক্ষসসুলভ অহংকারে অন্ধ। অনুনয় উপেক্ষা করে সে বলপূর্বক রম্ভার সতীত্ব হরণ করল।

নলকুবেরের রোষ ও সেই অমর অভিশাপ

ধর্ষিতা, অপমানিতা এবং বিষাদগ্রস্ত রম্ভা ক্রন্দনরত অবস্থায় গিয়ে পৌঁছালেন নলকুবেরের আশ্রমে। তাঁর এলোমেলো চুল, ছেঁড়া অলঙ্কার আর চোখের জল দেখে দেবসেনাপতি নলকুবেরের রক্তে যেন আগুন জ্বলে উঠল। ঘটনা শোনামাত্র ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে তিনি হাতে পবিত্র জল নিলেন।

চোখের জল আর পরম ক্ষোভের বাণীতে নলকুবের উচ্চারণ করলেন এক কঠিন অভিশাপ:

 "আজ থেকে যদি রাবণ কোনো নারীকে তার অনিচ্ছায় ভোগ করতে চায়, বা বলপূর্বক কারো সতীত্ব নষ্ট করার চেষ্টা করে—তবে মুহূর্তের মধ্যে তার মস্তক সপ্তধা বিচ্ছিন্ন (সাত টুকরো) হয়ে যাবে! তার মৃত্যু ঘটবে সেই মুহূর্তেই।"

কেন এই অভিশাপই হয়ে উঠল 'অনন্য অমূল্য ধন'?

সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় বন্দী করে রাখার পর রাবণ অনেক ভয় দেখিয়েছিল, প্রলুব্ধ করেছিল, কিন্তু কখনো সীতাকে বলপূর্বক স্পর্শ করার দুঃসাহস দেখায়নি। দশাসনের মতো অতুলনীয় ক্ষমতার অধিকারী রাক্ষসরাজ কেন সীতার ওপর নিজের অধিকার ফলাতে পারল না? তার একমাত্র উত্তর—নলকুবেরের সেই চরম অভিশাপ।

ত্রিজটার মুখে এই গল্প শুনে সীতা সেদিন বুঝতে পেরেছিলেন, যে অভিশাপ লঙ্কার রাজাকে বেঁধে রেখেছে অদৃশ্য শিকলে, তা আসলে স্বয়ং মহাকালের এক সূক্ষ্ম বিচার। নলকুবেরের সেই ক্রোধের বাণীই সেদিন অশোক বনে একা বসে থাকা বৈদেহীকে রাবণের নখদর্পণের বাইরে এক অদৃশ্য বর্মের মতো সুরক্ষিত রেখেছিল।

ইতিহাসের কী অদ্ভুত খেলা! এক অপ্সরার অসম্মান আর এক প্রেমিকের চরম ক্ষোভই শেষে গিয়ে সীতার সতীত্ব রক্ষার ঢাল হয়ে দাঁড়াল, আর লঙ্কাপতির পতনকে করে তুলল অনিবার্য।

বি:দ্র: পূর্ববর্তী ভাগে যেতে এখানে ক্লিক করুন


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ