বিশ্বাবসুর রূপের দম্ভ, ব্রাহ্মণের অভিশাপ ও কবন্ধের মোক্ষ


বিশ্বাবসুর রূপের দম্ভ, ব্রাহ্মণের অভিশাপ ও কবন্ধের মোক্ষ

রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডের যে প্রান্তরটায় এসে রক্ত আর কান্নার গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল, ঠিক সেখানেই লুকিয়ে ছিল এক গন্ধর্বের অতীত জীবনের ইতিহাস। বিশ্বাবসু—অভিশাপের অন্ধকারে যে নামটা হারিয়ে গিয়ে একদিন হয়ে উঠেছিল কবন্ধ।

আসলে, অহংকার তো এক অদ্ভুত রোগ! সুশ্রী চেহারা আর অপরূপ কান্তির জন্য গন্ধর্বদের এমনিতেই স্বর্গে-মর্ত্যে আলাদা খাতির ছিল। বিশ্বাবসুও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাঁর সুঠাম রূপ, লাবণ্য আর গন্ধর্বসুলভ ঐশ্বরিক ক্ষমতায় তিনি এতটাই মত্ত হয়ে উঠেছিলেন যে, চারপাশের মানুষদের তুচ্ছ মনে করাটাই তাঁর অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

একদিন অরণ্যের শান্ত, নিভৃত এক কোণে ধ্যানমগ্ন ছিলেন স্থূলশিরা নামে এক ঋষি। তপস্যার তেজ আর কৃচ্ছ্রসাধনে ঋষির শরীরটা ছিল রোগা, জরাজীর্ণ ও অতি সাধারণ। অহংকারে অন্ধ বিশ্বাবসু সেই ঋষিকে দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। শুরু করলেন তামাশা। নিজের রূপের প্রদর্শনী আর ঋষির জীর্ণ চেহারা নিয়ে বিদ্রূপ করাটাই যেন তাঁর কাছে এক অদ্ভুত আনন্দের খেলা হয়ে দাঁড়াল। তিনি ঋষির মনঃসংযোগ ভঙ্গ করার জন্য নানা মায়াজাল বিস্তার করতে লাগলেন, কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে ঋষির তপস্যা নষ্ট করার চেষ্টা করতে লাগলেন।

স্থূলশিরা কিন্তু সাধারণ কোনো সাধু ছিলেন না। তাঁর ধ্যানের ব্যাঘাত ঘটায় যখন তিনি চোখ মেললেন, তখন তাঁর চোখের কোণে প্রচ্ছন্ন কোনো ক্ষোভ নয়, বরং জ্বলে উঠেছিল চরম ক্রোধের আগুন। বিশ্বাবসুর চালচলন আর রূপের অহংকার দেখে ঋষি বুঝতে পারলেন, এই গন্ধর্ব তার বাহ্যিক রূপকেই পরম সত্য বলে ধরে নিয়েছে, আর আত্মার সৌন্দর্যকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে।

স্থূলশিরা কড়া গলায় অভিশাপ দিলেন—"যে রূপের দম্ভে তুই আজ এক তপস্বীকে উপহাস করছিস, সেই রূপই তোর থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হলো! তোর এই সুন্দর গন্ধর্বদেহ বিলীন হয়ে যাক। আজ থেকে তুই এক কুৎসিত, বিকট রাক্ষসে পরিণত হবি। তোর মাথা আর ঘাড় থাকবে না, উরু আর পেটের মাঝেই আটকে থাকবে তোর মুখ আর চোখ! এক সুবিশাল, ভয়ংকর কবন্ধ রূপ নিয়ে তোকে এই দণ্ডকারণ্যে ঘুরে বেড়াতে হবে।"

অভিশাপের তীব্রতায় মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বাবসুর সমস্ত রূপ-সৌন্দর্য উবে গেল। তাঁর উজ্জ্বল ত্বক ঢেকে গেল মেঘের মতো কালো, দানবীয় চামড়ায়। মাথাটা ধড়ের ভেতরে সেঁধিয়ে গেল, বুকে ফুটল এক বিরাট চোখ আর পেটের মাঝখানে গহ্বরের মতো হাঁ করা এক মুখ। বিশ্বাবসু তখন ভুল বুঝতে পেরে স্থূলশিরার পায়ে লুটিয়ে পড়লেন, ক্ষমা ভিক্ষা করলেন অঝোর নয়নে।

ঋষির মন কিছুটা গলল, তবে অভিশাপ তো আর ফেরানো যায় না! স্থূলশিরা বললেন—"তোর এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত তোকে করতেই হবে বিশ্বাবসু। তবে শোন, চিরকাল তোকে এই বীভৎস রূপ নিয়ে বাঁচতে হবে না। যুগে যুগে যখন ধর্মের ক্ষয় হবে, তখন অযোধ্যার রাজপুত্র শ্রীরাম আসবেন এই দণ্ডকারণ্যে। যখন তিনি তোর সুবিশাল দুই বাহু কেটে তোকে বধ করবেন এবং অগ্নিদগ্ধ করে তোর দেহ ভস্ম করবেন, ঠিক তখনই তুই তোর এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবি। রামের পবিত্র অস্ত্রের স্পর্শই হবে তোর পূর্বরূপ ফিরে পাওয়ার একমাত্র পথ।"

সেইদিন থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কবন্ধ নাম ধারণ করে, পেটের ক্ষিধে মেটাতে অরণ্যের পশুপাখি আর মানুষকে নিজের দীর্ঘ বাহু দিয়ে ধরে গিলে খেয়ে বেঁচে ছিলেন বিশ্বাবসু। রূপের যে দম্ভ নিয়ে তিনি একদিন খেলা করেছিলেন, সেই রূপই হারিয়ে তিনি অপেক্ষায় ছিলেন এক চরম শাস্তির—যা আসলে ছিল তাঁর মুক্তির একমাত্র উপায়।

অবশেষে রাম ও লক্ষ্মণের খড়্গের আঘাতে যখন তাঁর মায়াবী রাক্ষসী বাহুদুটি বিচ্ছিন্ন হলো, ঠিক তখনই ভেঙে পড়ল স্থূলশিরা ঋষির সেই শতাব্দী প্রাচীন অভিশাপের আগল। রক্তমাংসের বীভৎস শরীরটার অন্তরালে ঢাকা পড়ে থাকা সেই গন্ধর্ব পুরুষ বিশ্বাবসু যেন আগুনের শিখার মতো মুক্ত হয়ে জ্বলে উঠলেন রামের চোখের সামনে।

বি:দ্র:-গন্ধর্ব পুরুষ বিশ্বাবসু কেমন করে আগুনের শিখার মতো মুক্ত হয়ে জ্বলে উঠলেন জা ন তে এখানে ক্লিক করুন।


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ