শকুন্তলা ও ভরত-কথা
শকুন্তলা ও ভরত-কথা
তপোবনের নিভৃত ছায়ায় গান্ধর্ব মতে মিলন হয়েছিল দুষ্মন্ত আর শকুন্তলার। কোনো সাক্ষী ছিল না, ছিল শুধু বনের মর্মর আর দু’জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখ। বিদায়বেলায় রাজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—খুব শীঘ্রই রাজকীয় পালকি আসবে শকুন্তলাকে নিতে। কিন্তু রাজা চলে যাওয়ার পর তপোবনের নির্জনতা যেন আরও ঘনীভূত হলো। মহর্ষি কণ্ব আশ্রমে ফিরলে শকুন্তলা কুণ্ঠিত হলেন, পিতৃতুল্য ঋষির অনুমতি না নিয়ে এই পরিণয় তাঁর মনে অপরাধবোধ জাগাচ্ছিল। কিন্তু কণ্ব তো সাধারণ মানুষ নন, তাঁর দৃষ্টি অতীত-ভবিষ্যত চুইয়ে হৃদয়ে প্রবেশ করে। শকুন্তলার কপালে হাত রেখে তিনি শান্ত স্বরে বললেন, "ভয় নেই মা। ক্ষত্রিয় আর কন্যার এই মিলন শাস্ত্রসম্মত, এমনকি শুভ। দুষ্মন্ত ধার্মিক রাজা, তিনি তোর অমর্যাদা করবেন না।" শকুন্তলার অনুরোধে মহর্ষি রাজাকে আশীর্বাদও পাঠালেন।
কালক্রমে শকুন্তলার কোলে এক দেবশিশু এলো। উজ্জ্বল ললাট, চওড়া কাঁধ, আর দু’হাতের তেলোয় চক্রের চিহ্ন—ঠিক যেন কোনো স্বর্গের রাজপুত্র মর্ত্যে নেমে এসেছে। বালকের বয়স যখন মাত্র ছয়, তখনই তার সাহসের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। বনের বাঘ, সিংহ আর বুনো হাতিকে সে দড়ি দিয়ে বেঁধে খেলা করে। তপোবনের ঋষিরা অবাক হয়ে এই অকুতোভয় বালকের নাম রাখলেন ‘সর্বদমন’।
কণ্ব বুঝলেন, রাজপুত্রের জন্য তপোবন আর উপযুক্ত স্থান নয়। বিবাহিতা কন্যার দীর্ঘকাল পিত্রালয়ে বাস ধর্মের পরিপন্থী। তিনি শিষ্যদের আদেশ দিলেন শকুন্তলা আর তাঁর পুত্রকে হস্তিনাপুরে পৌঁছে দিতে। কিন্তু রাজসভায় পৌঁছে শকুন্তলা দেখলেন এক অন্য বাস্তব।
সিংহাসনে বসে থাকা দুষ্মন্তের চোখে কোনো চেনা আলো নেই। শকুন্তলা শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন, "মহারাজ, এই আপনার পুত্র। আপনার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুন, একে যুবরাজ হিসেবে গ্রহণ করুন।"
দুষ্মন্তের ভ্রু কুঁচকে উঠল। অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তিনি বললেন, "দুশ্চরিত্রা নারী, কার স্ত্রী তুমি? আমার কিছুই মনে নেই। তোমার সঙ্গে অর্থ, ধর্ম বা কাম—কোনো সম্পর্কই আমার নেই। আমার সামনে থেকে বিদায় হও।"
মুহূর্তের জন্য শকুন্তলা যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলেন। অপমানে তাঁর মুখ আরক্ত হলো, ঠোঁট কাঁপতে লাগল। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়লেন না। স্থির চোখে রাজার দিকে তাকিয়ে বললেন, "মহারাজ, আপনার অন্তরাত্মা জানে সত্যিটা কী। নিজেকে কলঙ্কিত করবেন না। সূর্য, চন্দ্র, বায়ু আর অগ্নি—সবাই মানুষের পাপ-পুণ্যের সাক্ষী থাকে। আপনি যদি মনে করেন নির্জনে ঘটে যাওয়া ঘটনা কেউ দেখেনি, তবে ভুল করছেন। ধর্ম আর যম আপনার হৃদয়ে বসেই সব দেখছেন।"
শকুন্তলা আরও বললেন, "পত্নী তো কেবল সঙ্গিনী নয়, সে পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী। তার মাধ্যমেই পুরুষ ধর্ম ও মোক্ষ লাভ করে। আর এই পুত্র? এ তো আপনারই শরীরের অংশ। মেনকা আমাকে জন্মের পর ত্যাগ করেছিলেন, এখন আপনিও কি সেই একই কাজ করবেন? আমার অতীত জন্মের পাপ থাকতে পারে, কিন্তু এই শিশুর কী অপরাধ?"
দুষ্মন্ত তবু নির্বিকার। তিনি শকুন্তলাকে মিথ্যেবাদী প্রতিপন্ন করতে চাইলেন। শকুন্তলা তখন শেষ কথাটি বললেন, "শত অশ্বমেধ যজ্ঞের চেয়ে একটি সত্যের মূল্য অনেক বেশি। আপনি যদি মিথ্যার সঙ্গেই বাস করতে চান, তবে আপনার সঙ্গে আমারও কোনো সম্পর্ক নেই। আপনি স্বীকার করুন বা না করুন, আমার এই পুত্রই একদিন পৃথিবী শাসন করবে।"
শকুন্তলা যখন একা ফিরে যাচ্ছেন, তখনই আকাশ বিদীর্ণ করে দৈববাণী শোনা গেল— ‘আকাশবাণী’। সমবেত ঋষি আর অমাত্যদের সামনে স্বর্গীয় স্বর ঘোষণা করল, "দুষ্মন্ত, শকুন্তলা সত্য কথা বলছে। এই পুত্র তোমারই। একে গ্রহণ করো। এর নাম হবে ভরত।"
পুরো রাজসভায় তখন আনন্দের হিল্লোল। দুষ্মন্ত তখন শকুন্তলার হাত ধরে বললেন, "শকুন্তলা, আমি জানতাম এই সত্য। কিন্তু কোনো প্রমাণ ছাড়া তোমাকে গ্রহণ করলে প্রজারা সন্দেহ করত, বালকের সিংহাসনের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠত। কেবল সত্যকে লোকসমক্ষে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই আমি এই কঠোরতা দেখিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করো।"
দুষ্মন্ত সসম্মানে শকুন্তলাকে রানির আসনে বসালেন। সর্বদমন হলেন যুবরাজ। পরবর্তীকালে এই সর্বদমনই ‘ভরত’ নামে বিশ্বজয়ী সম্রাট হয়েছিলেন। তাঁর নামানুসারেই আমাদের এই দেশের নাম হলো ‘ভারতবর্ষ’। মহাভারতের মহাকাব্যিক পাতায় শকুন্তলার সেই তেজ আর ভরতের সেই শৌর্য আজও অম্লান হয়ে আছে।

Comments
Post a Comment