দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: দম্ভ এবং প্রতিশোধের উপাখ্যান

 


দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: দম্ভ এবং প্রতিশোধের উপাখ্যান

সব বড় অনর্থের মূলে থাকে খুব তুচ্ছ কোনো ঘটনা। দেবগুরু বৃহস্পতির ছেলে কচ তখন সঞ্জীবনী বিদ্যা শিখে স্বর্গলোকে ফিরে গেছেন, দেবতাদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। অসুররাজ বৃষপর্বার রাজ্যে তখন এক শান্ত দুপুর। সেই রাজ্যের এক সরোবরে জলকেলিতে মেতেছিলেন একদল রূপসী নারী। তাঁদের মধ্যে দুজন ছিলেন বিশেষ—একজন স্বয়ং অসুরগুরুর কন্যা দেবযানী, আর অন্যজন অসুররাজের মেয়ে শর্মিষ্ঠা। সম্পর্কে তাঁরা সখী, কিন্তু সেই সখ্যের তলায় চোরাস্রোতের মতো বইছিল আভিজাত্যের লড়াই।

ঠিক সেই সময় দেবরাজ ইন্দ্রের এক কৌতুক জাগল। তিনি বাতাসের বেশে এসে পাড়ে রাখা বসনগুলো এলোমেলো করে দিলেন। জল থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে পোশাক পরতে গিয়ে অদলবদল হয়ে গেল। দেবযানী আর শর্মিষ্ঠা একে অপরের পোশাক পরে ফেললেন।

খুব সামান্য ভুল, কিন্তু দেবযানীর কাছে তা অপমানের মতো ঠেকল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, "এ কী স্পর্ধা তোমার শর্মিষ্ঠা! তুমি আমার পোশাক পরেছ? মনে রেখো, আমার বাবা তোমার বাবার গুরু। আমার বাবা পূজ্য, আর তোমার বাবা তাঁর শিষ্য।"

শর্মিষ্ঠা সাধারণ মেয়ে নন, তিনি রাজকন্যা। তাঁর ধমনীতে যোদ্ধার রক্ত। তিনি পাল্টা আঘাত হানলেন তীক্ষ্ণ বাক্যে। বললেন, "দেবযানী, তুমি ভুলে যাচ্ছ—তোমার বাবা আমার বাবার কাছে হাত পেতে দান নেন। আমার বাবা দাতা, তোমার বাবা গ্রহীতা। বাস্তব এটাই, স্তুতি গেয়েই তোমাদের অন্ন জোটে।"

কথা কাটাকাটি গড়াল হাতাহাতিতে। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে শর্মিষ্ঠা একসময় দেবযানীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন এক গভীর অন্ধকার পাতকুয়োয়। তারপর সখীদের নিয়ে প্রাসাদে ফিরে গেলেন তিনি, ভাবলেন আপদ চুকেছে।

বনের সেই নিস্তব্ধতা ভাঙল চন্দ্রবংশীয় রাজা যযাতির পদশব্দে। মৃগয়ায় এসে তৃষ্ণার্ত রাজা কুয়োর কাছে যেতেই দেখলেন নিচে এক পরমা সুন্দরী নারী আটকে আছেন। দেবযানী রাজাকে বললেন তাঁর পরিচয়। যযাতি নিজের উত্তরীয় বাড়িয়ে দিলেন না, বরং দেবযানীর ডান হাত ধরে তাঁকে টেনে তুললেন উপরে। সে এক অদ্ভুত মুহূর্ত—অজানিতেই যেন পাকে পড়ে গেল ভবিষ্যতের এক জটিল সম্পর্কের জট। উদ্ধার পেয়ে দেবযানী ফিরে গেলেন না, বরং খবর পাঠালেন পিতা শুক্রাচার্যকে।

শুক্রাচার্য যখন এলেন, তাঁর হৃদয়ে মেয়ের ব্যথায় হাহাকার। তিনি প্রথমে চেয়েছেন শান্ত করতে। মেয়েকে বললেন, "ক্ষমা করো দেবযানী। ক্ষমা করাই তো ব্রহ্মণত্বের ধর্ম।"

কিন্তু দেবযানীর চোখে তখন জেদের আগুন। তিনি প্রশ্ন করলেন, "বাবা, শর্মিষ্ঠা কি ঠিক বলেছে? আপনি কি সত্যিই বৃষপর্বার স্তুতি করে দান গ্রহণ করেন?"

শুক্রাচার্য সগৌরবে দাঁড়িয়ে বললেন, "না। আমি কারো স্তুতি করি না। আমি জগতের মঙ্গলের জন্য মেঘকে ডাকি, বৃষ্টি আনি। দেবরাজ ইন্দ্র কিংবা রাজা যযাতি—সবাই জানে আমি অপ্রতিম। কিন্তু মনে রেখো মা, যে অপমানে স্থির থাকে, সেই প্রকৃত বিজয়ী।"

দেবযানী মানলেন না। তিনি বললেন, "দুর্বৃত্তকে ক্ষমা করা মানেই তাকে আরও নিষ্ঠুর হওয়ার লাইসেন্স দেওয়া। আমি এখানে থাকব না।"

অসুরগুরু যখন ক্রুদ্ধ হয়ে বৃষপর্বার প্রাসাদ ত্যাগ করতে চাইলেন, রাজা পড়লেন মহা বিপাকে। সঞ্জীবনী মন্ত্র জানা একমাত্র মানুষটি চলে যাওয়া মানেই অসুরদের বিনাশ। বৃষপর্বা পায়ে ধরলেন গুরুর। বললেন, "আপনি না থাকলে আমি সমুদ্রে প্রাণ বিসর্জন দেব।"

শুক্রাচার্য ঠান্ডা গলায় বললেন, "আমার থাকা না থাকা নির্ভর করছে আমার মেয়ের ওপর। তাকে সন্তুষ্ট করো।"

রাজা স্বয়ং গেলেন দেবযানীর কাছে। বললেন, "তুমি যা চাইবে, তাই দেওয়া হবে।"

দেবযানী চেয়েছিলেন এক চরম প্রতিশোধ। তিনি দাবি করলেন, "শর্মিষ্ঠাকে আমার দাসী হতে হবে। আমি যেখানে যাব, যেখানে আমার বিয়ে হবে—সেখানে সে আমার পরিচারিকা হিসেবে দশ হাজার সখী নিয়ে সঙ্গে যাবে।"

শর্মিষ্ঠা ছিলেন মহীয়সী। নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়ে দেশের স্বার্থে তিনি রাজি হলেন। রাজপোশাক ত্যাগ করে পরিচারিকার বেশে এসে দাঁড়ালেন দেবযানীর সামনে। বললেন, "আমি তোমার দাসী হলাম। তোমার সংসারে আমি তোমার সেবা করব।"

বিবাদ মিটল বটে, কিন্তু বন্ধুত্বের সেই স্বচ্ছ জল চিরতরে ঘোলা হয়ে গেল। দেবযানী জয়ী হলেন ঠিকই, কিন্তু যযাতির জীবনের আগামীর গল্প প্রমাণ করে দেবে যে, এই দম্ভের মাশুল কতখানি ভারী হতে পারে।

অহংকার আর প্রতিশোধের এই কানাগলিতে দাঁড়িয়ে সেদিন কেউ জানত না, কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধের অনেকগুলো বীজ এই পাতকুয়োর ধারেই বোনা হয়ে গিয়েছিল।

পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:

WhatsApp করুন


Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতী ও ব্যাসদেব

"পতন একদিনে হয় না, উত্থানও একদিনে হয় না — কিন্তু সেই একটা মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সব ঠিক করে দেয়।"

পাণ্ডব-কথা: এক অলৌকিক জন্ম ও এক বসন্তের দীর্ঘশ্বাস