ধর্মরাজের মর্ত্যবাস: অণিমাণ্ডব্যের ক্রোধ ও বিদুরের জন্ম

 


ধর্মরাজের মর্ত্যবাস: অণিমাণ্ডব্যের ক্রোধ ও বিদুরের জন্ম

ইতিহাসের চাকা ঘোরে আপন নিয়মে, কিন্তু তার নেপথ্যে থাকে ছোট ছোট কিছু মুহূর্তের অভিঘাত। মহাভারতের সেই বিশাল ক্যানভাসে বিদুর এক আশ্চর্য চরিত্র। তিনি দাসীপুত্র, অথচ তাঁর ধমনীতে বইছিল ধর্মের বিশুদ্ধতম স্রোত। কেন এক পরম জ্ঞানীকে শূদ্রাণীর গর্ভে আসতে হলো, তার উত্তর লুকিয়ে আছে মহর্ষি মাণ্ডব্যের অপমানে।


ঋষির মৌনব্রত ও নিয়তির নিষ্ঠুর খেলা

বহু কাল আগের কথা। মহর্ষি মাণ্ডব্য ছিলেন এক অসাধারণ মানুষ—ধৈর্য যাঁর ভূষণ আর সত্য যাঁর আশ্রয়। নিজের আশ্রমের বাইরে এক বিশাল বৃক্ষের তলে তিনি দু’হাত তুলে ঊর্ধ্ববাহু হয়ে মৌনব্রত পালন করছিলেন। ধ্যানের এমন এক শিখরে তিনি পৌঁছেছিলেন যে, চারপাশের জগৎ তাঁর কাছে তখন ধূসর কুয়াশামাত্র।

ঠিক সেই সময়, একদল দস্যু রাজকোষ লুঠ করে পালাচ্ছিল। পেছনে ধেয়ে আসছে ক্রুদ্ধ রাজসৈন্য। প্রাণভয়ে দস্যুরা ঋষির আশ্রমে ঢুকে লুণ্ঠিত সামগ্রীসহ লুকিয়ে পড়ল। সেনারা এসে ঋষিকে প্রশ্ন করল চোরদের হদিস নিয়ে। কিন্তু মাণ্ডব্য তখন অন্য জগতে, তাঁর মুখে কুলুপ আঁটা।

সৈন্যরা তল্লাশি চালিয়ে দস্যুদের ধরল, আর ভাবল এই নিশ্চুপ সাধুই বোধহয় চোরদের সর্দার। রাজদরবারে বিচারের বালাই রইল না। এক লহমায় হুকুম হয়ে গেল—সবকটাকে শূলে চড়াও।

শূলবিদ্ধ ঋষি ও রাজার অনুতাপ

মাণ্ডব্যকে শূলে বিদ্ধ করা হলো। কিন্তু তপোবল এক অলৌকিক প্রাচীর তৈরি করেছিল তাঁর চারদিকে। যন্ত্রণার বদলে তাঁর ঠোঁটে তখন জপমন্ত্র। দিন যায়, মাস যায়—ঋষির মৃত্যু নেই। এই খবর যখন রাজার কানে পৌঁছল, তিনি শিউরে উঠলেন। এক মহাপুরুষের ওপর এমন অবিচার! রাজা ছুটে এসে ঋষির পায়ে লুটিয়ে পড়লেন।

দয়াশীল ঋষি রাজাকে ক্ষমা তো করলেন, কিন্তু শরীর থেকে শূল নামাতে গিয়ে দেখা গেল এক বিপত্তি। শূলের অগ্রভাগ বিদ্ধ হয়ে রইল তাঁর দেহের গভীরে। সেই অবস্থাতেই তিনি আবার তপস্যা শুরু করলেন, আর জগৎ তাঁকে নাম দিল—অণিমাণ্ডব্য।

যমলোকে এক কঠিন সওয়াল

নিজের ওপর হওয়া এই অবিচারের কারণ জানতে মাণ্ডব্য সশরীরে পৌঁছলেন যমলোকে। ধর্মরাজ যমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, "কোন পাপে আমার এই চরম দুর্গতি?"

ধর্মরাজ শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, "ঋষি, বাল্যকালে আপনি একটি ফড়িংকে বিদ্ধ করেছিলেন লোহার কাঁটা দিয়ে। কর্মফল বড় কঠিন, তাকে ফাঁকি দেওয়ার সাধ্য কারও নেই।"

মাণ্ডব্য জ্বলে উঠলেন। এ কেমন বিচার? তিনি পালটা যুক্তি দিলেন, "শাস্ত্র বলে, বারো বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর কাজ পাপের তালিকায় পড়ে না। কারণ সে ভালো-মন্দের তফাত জানে না। আপনি লঘু পাপে গুরু দণ্ড দিয়েছেন।"

ক্রোধে মহর্ষি অভিশাপ দিলেন ধর্মরাজকে—"যিনি ধর্মের বিচারক, তিনিই যদি শাস্ত্র লঙ্ঘন করেন, তবে তাঁর দেবলোকে থাকা সাজে না। যাও ধর্মরাজ, তোমাকে মর্ত্যলোকে কোনো শূদ্রাণীর গর্ভে জন্ম নিতে হবে।"

বিদুরের মর্ত্যে আগমন

সেই অভিশাপের সূত্র ধরেই কুরুবংশের এক সংকটে ধর্মরাজ মর্ত্যে এলেন বিদুর হয়ে। কুরুকুলের বংশরক্ষার তাগিদে ব্যাসদেব যখন অম্বিকার কক্ষে আহ্বান পেলেন, ভয়াতুর অম্বিকা নিজে না গিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর এক প্রখর বুদ্ধিমতী দাসীকে।

সেই পরিচারিকা অত্যন্ত ভক্তি ও আনন্দের সঙ্গে ব্যাসদেবকে বরণ করেন। ব্যাসদেবের সেই দিব্য তেজে আর ঋষির আশীর্বাদে তাঁর গর্ভে জন্ম নিলেন বিদুর। জন্মপরিচয়ে তিনি দাসীপুত্র হতে পারেন, কিন্তু আসলে তিনি ছিলেন স্বয়ং ধর্মরাজের অবতার। তাই কুরুক্ষেত্রের সেই প্রলয়নাচনের মাঝেও বিদুর ছিলেন অবিচল, শান্ত আর ন্যায়বিচারের এক নিঃসঙ্গ দ্বীপ।

মহাভারতের পাতায় এই কাহিনী কেবল অলৌকিকতা নয়, বরং আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিচারকের আসনে বসে ভুল করলে স্বয়ং দেবরাজকেও সাধারণ মানুষের জীবন বইতে হয়।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

রাজা যযাতির পতন ও মুক্তি

সত্যবতী ও ব্যাসদেব