ব্রাহ্মণবেশে অর্জুনের লক্ষ্যভেদ: পাঞ্চালীর স্বয়ংবর ও এক অমোঘ পরিণতির উপাখ্যান
ব্রাহ্মণবেশে অর্জুনের লক্ষ্যভেদ: পাঞ্চালীর স্বয়ংবর ও এক অমোঘ পরিণতির উপাখ্যান
পাঁচালের সেই বিশাল রাজসভা তখন থমথমে। উত্তেজনার পারদ চড়ছে, কিন্তু তার সঙ্গে মিশে আছে একরাশ হতাশা। একের পর এক দিগ্বিজয়ী বীর, দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা আর উদ্ধত ক্ষত্রিয় যোদ্ধারা মাথা নিচু করে ফিরে গেছেন। লক্ষ্যভেদ দূরে থাক, সেই অতিভারী ধনুকটিতে গুণ পরাতেই নাভিশ্বাস উঠেছে তাঁদের। দ্রৌপদীর পাণিপ্রার্থনা যেন ক্রমশ এক দুঃসাধ্য প্রহেলিকায় পরিণত হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভিড়ের মধ্য থেকে উঠে দাঁড়ালেন এক দীর্ঘদেহী যুবক। পরনে মলিন পোশাক, ললাটে ব্রাহ্মণের তেজ, কিন্তু চলনে এক অদ্ভুত রাজকীয় ছন্দ।
সভায় গুঞ্জন উঠল। কেউ অবজ্ঞায় হাসল, কেউ বা বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলল। রাজন্যবর্গের মধ্যে ফিসফাস শুরু হলো— "ক্ষত্রিয়রা যা পারল না, তা কি এক ভিখারি ব্রাহ্মণ পারবে?" কিন্তু প্রবীণ ব্রাহ্মণদের চোখে তখন অন্য প্রত্যাশা। তাঁদের মনে পড়ে যাচ্ছিল পরশুরামের দাপট কিংবা অগস্ত্যের সাগর শোষণের কথা। তপস্যার তেজে যে সব অসম্ভব সম্ভব হয়!
সেই ছদ্মবেশী ব্রাহ্মণ আর কেউ নন, স্বয়ং অর্জুন। তিনি ধনুকটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো আস্ফালন নেই। অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে তিনি ধনুকটির ওজন আর গঠন পরীক্ষা করলেন। তারপর নিমীলিত নেত্রে একবার স্মরণ করলেন দেবাদিদেব মহাদেবকে, আর মনে মনে প্রণাম জানালেন শ্রীকৃষ্ণকে। যখন তিনি চোখ খুললেন, তাঁর দৃষ্টিতে তখন শুধু শিকারীর একাগ্রতা।
অত্যন্ত অবলীলায় তিনি ধনুকটি তুললেন, যেন ওটি কোনো মারণাস্ত্র নয়, একটি ফুলের সাজি। সভাজুড়ে তখন পিনপতন নীরবতা। পরমুহূর্তেই তিনি ধনুকে গুণ পরালেন, শর নিক্ষেপ করলেন ওপরের আবর্তিত লক্ষ্যবস্তুর দিকে—তলায় জলের পাত্রে তার প্রতিবিম্ব দেখে। বিদ্যুদ্বেগে বাণ ছুটে গেল। লক্ষ্যভেদ হলো অব্যর্থভাবে।
মুহূর্তের স্তব্ধতা ভেঙে সভা ফেটে পড়ল জয়ধ্বনিতে। আকাশ থেকে যেন পুষ্পবৃষ্টি হলো। রাজা দ্রুপদ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের সামনে এক অজ্ঞাতকুলশীল ব্রাহ্মণ নয়, বরং তাঁর আজন্মের প্রার্থনা মূর্ত হয়ে উঠেছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এ সাধারণ কেউ নয়। ওদিকে লক্ষ্যভেদ হতেই কোনো আড়ম্বর ছাড়াই যুধিষ্ঠির, নকুল ও সহদেব নিঃশব্দে সভা ত্যাগ করলেন। তাঁদের গন্তব্য সেই কুম্ভকারের কুটির।
দ্রৌপদী ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখের মণি তখন এক নতুন স্বপ্নের আভায় উজ্জ্বল। বিনা দ্বিধায় তিনি সেই ছদ্মবেশী ব্রাহ্মণের গলায় বরণমালা পরিয়ে দিলেন। কিন্তু বিয়োগান্তক নাটক তখনও বাকি ছিল। পরাজিত রাজাদের মনে তখন অপমানের দাবানল। "এ তো ক্ষত্রিয়দের অপমান!" বলে তাঁরা চিৎকার করে উঠলেন। লক্ষ্যভ্রষ্ট ক্রোধ আছড়ে পড়ল রাজা দ্রুপদের ওপর।
তৎক্ষণাৎ রুখে দাঁড়ালেন অর্জুন ও ভীম। ব্রাহ্মণের শান্ত মুখাবয়ব মুছে গিয়ে বেরিয়ে এল রণদুর্মদ যোদ্ধার রূপ। কর্ণের মতো বীরের মুখোমুখি হলেন অর্জুন। সে এক অসম লড়াই! কর্ণের বাণ অর্জুনের তপোবলে যেন খেই হারিয়ে ফেলছে। বিস্মিত কর্ণ থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, "তুমি ব্রাহ্মণ হতে পারো না। এই রণকৌশল কেবল ইন্দ্র বা অর্জুনেরই থাকতে পারে। কে তুমি?"
অর্জুন শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, "আমি একজন সাধারণ ব্রাহ্মণ, যে গুরুর চরণে বসে এই বিদ্যা আয়ত্ত করেছে।"
অন্যদিকে ভীম তখন তার অমানুষিক শক্তি দিয়ে শল্যকে পরাস্ত করেছেন। গোটা সভা যখন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই কৃষ্ণের আবির্ভাব। মৃদু হেসে তিনি হাত তুললেন। তাঁর সেই গম্ভীর অথচ মোলায়েম স্বরে ঘোষিত হলো ধ্রুব সত্য— "এই ব্রাহ্মণ ন্যায্যত লক্ষ্যভেদ করেছেন। এখানে অন্যায় কিছু হয়নি। যুদ্ধ থামাও।"
কৃষ্ণের কথায় এক অলৌকিক মাদকতা ছিল। ক্রুদ্ধ রাজারা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে ফিরে গেলেন। রণাঙ্গন আবার শান্ত হলো। এরপর কোনো কোলাহল না তুলে, অর্জুন, ভীম আর দ্রৌপদী পাঞ্চাল নগরের অলিগলি পেরিয়ে সেই জীর্ণ কুটিরের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। তাঁদের পিছে পড়ে রইল রাজকীয় ঐশ্বর্য, আর সামনে পড়ে রইল এক নতুন ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ।

Comments
Post a Comment