সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ
সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ
শান্তনু ও সত্যবতীর মিলনের পর সময় বয়ে গেল আপন গতিতে। যমুনার সেই মায়াবী সুগন্ধ এখন হস্তিনাপুরের অন্দরমহলে। সত্যবতী জন্ম দিলেন দুই পুত্র—চিত্রাঙ্গদ আর বিচিত্রবীর্য। বড় হচ্ছে দুই রাজপুত্র, কিন্তু তাঁদের ছায়া হয়ে আগলে রেখেছেন বড় ভাই ভীষ্ম। শান্তনুর মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসলেন চিত্রাঙ্গদ।
এক অকালমৃত্যুর উপাখ্যান
চিত্রাঙ্গদ ছিলেন তেজী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী আর দক্ষ শাসক। দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে তিনি একের পর এক রাজ্য জয় করতে লাগলেন। কিন্তু নিয়তির খেলা বোঝা বড় দায়। গন্ধর্বরাজার নামও ছিল চিত্রাঙ্গদ। মানুষের ঘরে তাঁরই নামের এক রাজা রাজত্ব করবে, এই অহংকার গন্ধর্বরাজ সইতে পারলেন না। শুরু হলো এক অসম যুদ্ধ। যমুনার তীরে তিন বছর ধরে চলল সেই সংগ্রাম। শেষ পর্যন্ত গন্ধর্বরাজের হাতে অকালে প্রাণ হারালেন হস্তিনাপুরের রাজা চিত্রাঙ্গদ। একরাশ সম্ভাবনা অকালেই ঝরে গেল।
ভীষ্মের অভিভাবকত্ব ও কাশীর রাজসভা
চিত্রাঙ্গদের মৃত্যুর পর বিচিত্রবীর্য তখন নেহাতই বালক। সিংহাসনে বসার মতো বয়স বা অভিজ্ঞতা কোনোটাই তাঁর নেই। ভীষ্ম আবার ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন। বিচিত্রবীর্যকে সিংহাসনে বসিয়ে তিনি পর্দার আড়াল থেকে রাজ্য পরিচালনা করতে লাগলেন। হস্তিনাপুর অনাথ হলো না, ভীষ্মের অটল শাসনে রাজ্য শান্ত রইল।
বিচিত্রবীর্য বড় হলেন। এবার তাঁর বিয়ের পালা। খবর এল, কাশীর রাজা তাঁর তিন কন্যা—অম্বা, অম্বিকা আর অম্বালিকার জন্য স্বয়ম্বরের আয়োজন করেছেন। সত্যবতীর অনুমতি নিয়ে ভীষ্ম চললেন কাশীতে।
বৃদ্ধ ভীষ্ম যখন স্বয়ম্বর সভায় প্রবেশ করলেন, সমবেত রাজন্যবর্গ হাসাহাসি শুরু করে দিল। তারা ভাবল, এই বুড়ো মানুষটা আবার বিয়ের লড়াইয়ে এসেছে কেন? কেউ টিপ্পনী কাটল, কেউ বা আড়ালে হাসল। কিন্তু ভীষ্ম অবিচল। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করলেন:
"আমি এই তিন কন্যাকে আমার ভাই বিচিত্রবীর্যের জন্য নিয়ে যাচ্ছি। সাহস থাকলে কেউ রুখে দাঁড়াও!"
নিমেষে হাসি থেমে গেল। শুরু হলো সংঘাত। ভীষ্মের ধনুকের টঙ্কারে একের পর এক বীর ধরাশায়ী হলেন। একাই সমস্ত রাজাকে পরাজিত করে তিনি তিন রাজকন্যাকে নিয়ে রওনা হলেন হস্তিনাপুরের দিকে।
অম্বার হৃদয়বেদনা ও বিচিত্রবীর্যের পতন
পথিমধ্যে জ্যেষ্ঠা রাজকন্যা অম্বা ভীষ্মের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে ভয় নেই, আছে এক বুক আর্তি। অম্বা বললেন, "গঙ্গাপুত্র, আপনি তো ধর্মের পথ চলেন। আমি মনে মনে রাজা শাল্বকে পতি হিসেবে বরণ করেছি। বাবাও তা জানতেন। এখন আপনিই বিচার করুন।"
ভীষ্ম বুঝলেন, যার মন অন্যের কাছে পড়ে আছে, তাকে জোর করে ভাইয়ের হাতে তুলে দেওয়া অধর্ম। তিনি পরম মমতায় অম্বাকে মুক্তি দিলেন। অম্বা ফিরে গেলেন তাঁর প্রেমিকের কাছে। আর অম্বিকা ও অম্বালিকার সঙ্গে মহা ধুমধামে বিয়ে হলো বিচিত্রবীর্যের।
কিন্তু সুখ সইল না। বিচিত্রবীর্য ছিলেন কিছুটা অসংযমী। রাজকীয় ভোগবিলাস আর অতিরিক্ত ইন্দ্রিয়পরায়ণতায় তাঁর শরীর ভেঙে পড়ল। রাজবৈদ্যরা অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু ক্ষয়কাস (যক্ষ্মা) তাঁকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিল। নিঃসন্তান অবস্থায় অকালেই মৃত্যু হলো বিচিত্রবীর্যের।
হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে আবার নেমে এল নিস্তব্ধতা। যে বংশকে রক্ষা করার জন্য ভীষ্ম নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই বংশ আজ নিঃস্ব। দুই বিধবা রানি আর শূন্য সিংহাসন নিয়ে হস্তিনাপুর এক গভীর সংকটের মুখে এসে দাঁড়াল।
পরবর্তী অধ্যায়ে: কুলরক্ষার দায় কার? সত্যবতী কি পারবেন এই সংকট মোচন করতে?

Comments
Post a Comment