কালান্তরের পদধ্বনি: এক মহানিষ্ক্রমণ- সত্যবতির বনবাস যাত্রা
কালান্তরের পদধ্বনি: এক মহানিষ্ক্রমণ- সত্যবতির বনবাস যাত্রা
হস্তিনাপুরের আকাশটা আজ বড় বেশি ফ্যাকাসে। মেঘ নেই, কিন্তু রোদের তেজও যেন কোনো এক বিষণ্ণ চাদরে ঢাকা। প্রাসাদের চত্বরে রথের চাকার ঘড়ঘড় শব্দটা যখন থামল, তখন বাতাস ভারী হয়ে এল এক আর্তনাদে। কুন্তী ফিরেছেন, কিন্তু তাঁর সেই দৃপ্ত পদচারণা আজ পাথরচাপা কান্নায় স্তব্ধ। সঙ্গে পাঁচটি শিশু—পিতৃহীন পাঁচ পাণ্ডব।
অম্বালিকা বাতায়নের ধারে বসে ছিলেন। সংবাদটা যখন এল যে পাণ্ডু নেই, আর তাঁর প্রিয়তমা পত্নী মাদ্রীও আগুনের শিখায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন, তখন মুহূর্তের জন্য তাঁর হৃৎস্পন্দন থমকে গেল। শরীরটা তাঁর এমনিতেই পাণ্ডুর ছিল, আজ যেন তা স্বচ্ছ পাথরের মতো সাদা হয়ে গেল। পুত্রশোকের এই দহন রাজকীয় বসনের চেয়েও অনেক বেশি ভারি, অনেক বেশি নিষ্ঠুর।
পা টলছিল, তবু তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন বড় দিদি অম্বিকার কক্ষে। সেখানে ধৃতরাষ্ট্রের পাশে অম্বিকা এক মূর্তিমতী উদ্বেগের মতো বসে ছিলেন। অম্বালিকার দীর্ঘশ্বাসের শব্দে অম্বিকা চমকে উঠলেন।
"অম্বা? পাণ্ডু এসেছে? পাণ্ডু কোথায়?" অম্বিকার গলায় এক অবর্ণনীয় শঙ্কা।
অম্বালিকা দিদির পায়ে আছড়ে পড়লেন। রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, "দিদি, আমাদের সব শেষ হয়ে গেল। পাণ্ডু আর ফিরবে না। সে তপোবনের ধুলোতেই মিশে গেল। আর মাদ্রী? সে-ও পতির একাকিত্ব সইতে পারল না। তারা চলে গেল দিদি, আমাদের এই জরাগ্রস্ত প্রাসাদে ফেলে রেখে চলে গেল।"
অম্বিকার দুই চোখের কোণ বেয়ে তখন জল গড়াতে শুরু করেছে। তিনি অম্বালিকার মাথায় হাত রেখে কেবল অস্ফুটে বললেন, "এ কী করলে ঈশ্বর! এ কী খেলা খেললে!"
অম্বালিকা ফুঁপিয়ে উঠলেন, "জান দিদি, পাণ্ডু যখন জন্মাল, ওর গায়ের রঙের জন্য কত কথা উঠেছিল। আজ সেই শরীরটা চিতাভস্ম হয়ে গেল। কুন্তী যখন প্রাসাদে ঢুকল, ওর চোখের দিকে আমি তাকাতে পারিনি। ওই শূন্যতা গঙ্গার অতল জলের চেয়েও গভীর। ওই পাঁচটা অনাথ শিশুকে নিয়ে ও এখন কোথায় দাঁড়াবে? এ কি আমাদেরই কোনো মহাপাপের ফল?"
ভীষ্মের আদেশে এবং বিদুরের সযত্ন আয়োজনে গঙ্গার পুণ্য সলিলে পাণ্ডু আর মাদ্রীর অন্ত্যেষ্টি সম্পন্ন হলো। সেই শেষ তর্পণের পর আজ কয়েকটি পূর্ণ দিন অতিক্রান্ত। ভাগীরথীর তীরে তখনো যেন শোকের একটা ভারী কুয়াশা থমকে আছে, আর সেই স্তব্ধতার একদিন রাজ প্রাসাদের ভেতরের দরজায় ছায়া পড়ল মহর্ষি ব্যাসদেবের বিকেলের ম্লান আলোয় হস্তিনাপুরের অলিন্দগুলো তখন দীর্ঘ ছায়ায় ঢাকা। রাজমাতা সত্যবতী নিজের কক্ষে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন। তাঁর সেই তেজস্বী মুখমণ্ডল আজ বিধ্বস্ত। ঠিক তখনই দরজায় ছায়া পড়ল মহর্ষি ব্যাসদেবের। তাঁর জটাজাল আর চোখের সেই অতিপ্রাকৃত দৃষ্টি সারা ঘরে এক অলৌকিক নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে দিল।
ব্যাসদেব ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বললেন, "মা, নিজেকে সামলাও। শোকের সময় অতিক্রান্ত, এখন কেবল প্রস্তুতির সময়।"
সত্যবতী হাহাকার করে উঠলেন, "ব্যাস! আমার পাণ্ডু চলে গেল! এই কি তবে শান্তনুর বংশের শেষ ইতিহাস?"
ব্যাসদেব জানলার বাইরে দিগন্তের দিকে চেয়ে শান্ত স্বরে বললেন, "মা, আমাদের সুসময় শেষ হয়ে এসেছে। পৃথিবী এখন বুড়ো হচ্ছে, তার গায়ে অধর্মের কলঙ্ক জমছে। দিন দিন শঠতা আর প্রবঞ্চনা বাড়বে, ধর্ম হবে সংকুচিত। কৌরবদের অহংকারে এক প্রলয়ংকর যুদ্ধ আসন্ন। তুমি এই সংসার মায়া ত্যাগ করো মা। নিজের সন্তানের হাতে গড়া এই বংশের তিলে তিলে বিনাশ দেখার চেয়ে অরণ্যের মৌনতাই তোমার জন্য শ্রেয়। তুমি যোগসাধনায় যাও।"
সত্যবতী দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর দীর্ঘ জীবনের সমস্ত লড়াই, আকাঙ্ক্ষা আর দম্ভ যেন এক নিমিষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। তিনি নিচু স্বরে বললেন, "ঠিক বলেছ ব্যাস। মায়া বাড়ালে কেবল যন্ত্রণাই দীর্ঘ হয়। আমি অরণ্যেই যাব।"
কথাগুলো শেষ হতে না হতেই অম্বিকা আর অম্বালিকা ঘরে ঢুকলেন। সত্যবতীর প্রস্থানের কথা শুনে তাঁরা ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। অম্বিকা বললেন, "মা, আপনিও চলে যাবেন? পাণ্ডু নেই, মাদ্রী নেই—এই বিশাল অট্টালিকা তো এখন আমাদের কাছে এক দমবন্ধ করা খাঁচা। আপনাকে ছাড়া আমরা কার আশ্রয়ে থাকব?"
অম্বালিকা রাজমাতার হাত জড়িয়ে ধরে বললেন, "আমাদেরও সঙ্গে নিন মা। আপনাকে এই বৃদ্ধ বয়সে একা অরণ্যে যেতে দেব না।"
সত্যবতী তাঁদের দিকে করুণ চোখে চাইলেন। "কিন্তু মা, কুন্তীর ওই ছোট ছোট ছেলেগুলো? ওরা তো অনাথ। তোমরা চলে গেলে ওদের মাথায় স্নেহের হাতটা কে রাখবে?"
অম্বিকা ও অম্বালিকা আজ নড়বড় নন, বরং পাথরের মতো কঠিন। অম্বিকা বললেন, "আমরা স্থির করেছি মা। প্রাসাদের এই বিষাক্ত বাতাসে আমরা আর নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। আপনার সেবায় আর ঈশ্বরের আরাধনাতেই আমাদের বাকি দিনগুলো কাটুক।"
সত্যবতী অবাক হলেন, আবার তাঁর মনে এক বিষণ্ণ তৃপ্তি খেলে গেল। তিনি বললেন, "তোমাদের এই মমতা দেখে আমি ধন্য হলাম। কিন্তু আমরা যাওয়ার আগে ভীষ্মের অনুমতি প্রয়োজন। হস্তিনাপুরের শেষ ভরসা তো সে-ই।"
তিনজন গিয়ে দাঁড়ালেন পিতামহ ভীষ্মের সামনে। গঙ্গার সেই অপরাজেয় বীর আজ যেন অনেক বেশি ক্লান্ত। তিনি সত্যবতীর অভিপ্রায় শুনলেন, দেখলেন দুই বিধবা বধূর চোখের সংকল্প। কিছুক্ষণ চোখ বুজে থেকে তিনি একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন। তারপর বললেন, "মা, তোমাদের ইচ্ছাই মহাকালের ইচ্ছা। যখন বিনাশ ঘনিয়ে আসে, তখন তপোবনই পরম আশ্রয়। আমি অনুমতি দিচ্ছি।"
বিদায়ের দিন হস্তিনাপুরের প্রতিটি ধূলিকণা যেন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। প্রজারা দেখল, রাজৈশ্বর্য আর অলংকার বিসর্জন দিয়ে তিন মহীয়সী নারী পায়ে হেঁটে শহরের সীমানা পার হয়ে যাচ্ছেন। কোনো সুসজ্জিত রথ নেই, কোনো রাজকীয় ডঙ্কা নেই—আছে শুধু এক অনন্ত বৈরাগ্য।
“রাজপথের আলো নিভে গেছে, অরণ্যের নীরবতা ডাকছে।” সত্যবতী—অম্বিকা—অম্বালিকা। তিন নারীর পদচিহ্ন মিশে গেল গঙ্গার ধারে, হিমালয়ের ছায়ায়, অরণ্যের গম্ভীর নিস্তব্ধতায়। তাদের চোখে আর রাজসিংহাসনের ঝলক নেই, আছে শুধু তপস্যার দীপ্তি। বিধবাদের নিঃসঙ্গতার রূপ নিলো আত্মার মুক্তিতে। অরণ্যের বাতাসে ভেসে উঠল এক অদৃশ্য রেখা— ইতিহাসের পাতায় লেখা হলো “ত্যাগই মহিমা, নীরবতাই মুক্তি।”
এই প্রস্থান এক ইতিহাসের যবনিকা পতন। তাঁরা যখন অরণ্যের গভীরে বিলীন হলেন, তখন হস্তিনাপুর হয়ে রইল এক নিঃসঙ্গ শ্মশান। গভীর বনে কঠোর তপস্যার শেষে একদিন তাঁরা এই নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করলেন, পেছনে পড়ে রইল এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পদধ্বনি আর এক আসন্ন মহাপ্রলয়।

Comments
Post a Comment