শরদ্বান ঋষি ও পথের ধারে কুড়িয়ে পাওয়া রাজপুত্তুর
শরদ্বান ঋষি ও পথের ধারে কুড়িয়ে পাওয়া রাজপুত্তুর
মহাভারতের চরিত্ররা যেন এক-একজন রহস্যের খনি। সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষের মতো তাদের জন্ম নয়, তাদের বেড়ে ওঠাও যেন কোনো এক অলৌকিক চিত্রনাট্যের অংশ। দ্রোণাচার্যের পত্নী কৃপীর কথাই ধরা যাক। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধের নেপথ্যে এই শান্ত অথচ তেজস্বিনী নারীর অবদান কম নয়। কিন্তু কৃপীর জন্মের ইতিহাস খুঁড়তে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় তাঁর পিতা শরদ্বানের কাছে, যাঁর জন্ম হয়েছিল এক অদ্ভুত উপায়ে—তির বা শর থেকে।
গৌতম মুনির পুত্র শরদ্বান। কিন্তু শাস্ত্রপাঠ বা যজ্ঞের আগুন তাঁকে কোনোদিন টানেনি। ঋষিপুত্র হলে কী হবে, তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল ধনুুর্বিদ্যা। যখন অন্য ব্রাহ্মণ বালকরা প্রদীপের আলোয় বেদপাঠে মগ্ন, শরদ্বান তখন বনের অন্ধকারে লক্ষ্যভেদ অভ্যাস করছেন। শাস্ত্রের চেয়ে অস্ত্রের ঝঙ্কারই ছিল তাঁর কাছে অধিক পবিত্র।
কঠোর তপস্যা আর নিরলস সাধনায় তিনি এমন সব দিব্যাস্ত্র আয়ত্ত করলেন, যা সাধারণ কোনো যোদ্ধার পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব। তাঁর এই ক্রমবর্ধমান শক্তি দেখে স্বর্গের রাজা ইন্দ্র প্রমাদ গুনলেন। মর্ত্যের এক ব্রাহ্মণ যদি দেবতাতুল্য শক্তিশালী হয়ে ওঠেন, তবে স্বর্গের সিংহাসন যে টলমল করবে! ইন্দ্রের অস্ত্র চিরকালই এক—বিঘ্ন ঘটানো। আর সেই বিঘ্নের নাম নারী।
শরদ্বানের তপোবনে ইন্দ্র পাঠালেন অপ্সরা জানপদীকে। জানপদী যেন এক টুকরো মায়াবী আলো হয়ে বনপথে আবির্ভূত হলেন। ধ্যানমগ্ন শরদ্বান চোখ মেলতেই দেখলেন সম্মুখে এক অপূর্ব সুন্দরী নারী। তাঁর আলুলায়িত কেশ আর মায়াবী চাউনি শরদ্বানের বছরের পর বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা সংযমের বাঁধে ফাটল ধরাল। শরদ্বান মানুষ, আর রক্ত-মাংসের মানুষের সুপ্ত কামনা হঠাৎ জেগে উঠল।
তিনি লড়াই করেছিলেন। নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শরীরের তো নিজস্ব ধর্ম আছে। নিজের অজান্তেই তাঁর রেতস্খলন হলো। লজ্জায়, অপমানে আর আত্মগ্লানিতে শরদ্বান সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। ধনুর্বাণ ফেলে রেখে তিনি গভীর অরণ্যে মিলিয়ে গেলেন। জানপদী দাঁড়িয়ে রইলেন একা।
শরদ্বানের সেই তেজ পড়েছিল একগুচ্ছ শরঘাসের ওপর। অলৌকিক ভাবে সেই তেজ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেল। জন্ম নিল দুটি শিশু—একটি পুত্র আর একটি কন্যা। নির্জন বনের ধারে ধুলোমাটির ওপর পড়ে রইল দুই দেবশিশু, যাদের খবর রাখার কেউ ছিল না।
ঠিক তখনই নিয়তি তার পাশা চালল। হস্তিনাপুরের রাজা শান্তনু মৃগয়ায় বেরিয়েছিলেন সেই পথেই। রাস্তার ধারে পড়ে থাকা দুটি শিশুকে দেখে তাঁর মন্ত্রীর কৌতূহল হলো। তিনি রাজাকে বললেন, "মহারাজ, এদের সাধারণ শিশু বলে মনে হচ্ছে না। এদের চেহারার দীপ্তি আর শান্ত ভাব দেখে মনে হয় এরা কোনো উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণের সন্তান।"
শান্তনু দয়ালু মানুষ ছিলেন। তিনি কোনো দ্বিধা না করে শিশু দুটিকে কোলে তুলে নিলেন। রাজপ্রাসাদে এনে তাদের নাম দিলেন কৃপ আর কৃপী। নিজের সন্তানের মতোই পরম মমতায় তাদের বড় করে তুলতে লাগলেন তিনি।
এদিকে অরণ্যের গভীরে শরদ্বান কিন্তু সব খবর রাখছিলেন। তপস্যার বলে তিনি জানতে পারলেন তাঁর সন্তানদের কথা এবং এও জানলেন যে রাজা শান্তনু তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। একদিন তিনি নিজেই হস্তিনাপুরে এসে হাজির হলেন। শান্তনুর কাছে পরিচয় দিয়ে বললেন, "আমি গৌতম-পুত্র শরদ্বান। এই শিশু দুটি আমারই অংশ।"
শান্তনু তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান দিলেন। শরদ্বান হস্তিনাপুরে থেকে সন্তানদের প্রকৃত শিক্ষা দিতে শুরু করলেন। যে বেদ তিনি নিজে একসময় অবহেলা করেছিলেন, তা শেখালেন কৃপ আর কৃপীকে। সঙ্গে দিলেন তাঁর আজীবনের সাধনা—অস্ত্রবিদ্যা।
কৃপ ছিলেন এক অসাধারণ মেধাবী ছাত্র। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন। কুরুবংশের কুলের মর্যাদা রক্ষায় তাঁর দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। ভীষ্ম স্বয়ং কৃপকে কৌরব ও পাণ্ডব রাজপুত্রদের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করলেন। দ্রোণাচার্য আসার আগে পর্যন্ত কৃপই ছিলেন রাজপুত্রদের প্রধান অস্ত্রগুরু, যাঁকে আমরা জানি ‘কৃপাচার্য’ নামে।
আর কৃপী? শান্ত, বিদুষী আর অসামান্য চারিত্রিক দৃঢ়তাসম্পন্ন কৃপী বিবাহ করলেন ব্রাহ্মণ বীর দ্রোণাচার্যকে। তিনি কেবল দ্রোণের পত্নী বা অশ্বত্থামার জননী ছিলেন না, বরং মহাভারতের টালমাটাল দিনগুলোতে তিনি ছিলেন এক ধীরস্থির স্তম্ভের মতো।
একগুচ্ছ শরঘাসের ওপর অযত্নে জন্মানো দুটি শিশু, যাদের পথের ধারে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন এক রাজা—সেই দুই শিশুর হাতেই তৈরি হলো ভারতের এক বিশাল ইতিহাসের ভিত্তি। নিয়তি বোধহয় একেই বলে।

Comments
Post a Comment