এ যুগের একটি অবক্ষয়ের আখ্যান- রক্তের ঋণ ও একটি নীল তৃষ্ণা-বাস্তব ঘটনার ছায়ায় রচিত


এ যুগের একটি অবক্ষয়ের আখ্যান- রক্তের ঋণ ও একটি নীল তৃষ্ণা-বাস্তব ঘটনার ছায়ায় রচিত

সুমন মানুষটা ছিলেন খটখটে শুকনো কাঠের মতো। পুলিশের হেড কনস্টেবল, খাকি উর্দির ভেতরে একটা পুরনো আমলের নীতিবোধকে সবসময় ইস্ত্রি করে রাখতেন। কিন্তু সেই উর্দির তলায় যে একটা নরম পিতা লুকিয়ে ছিল, সেটা তিনি বুঝতে পারেননি। মেয়ে শিউলি যখন কমলের প্রেমে পড়ল, সুমনবাবু সেটাকে স্রেফ একটা অবাধ্যতা হিসেবে দেখেননি, দেখেছিলেন তাঁর এতদিনের গড়ে তোলা সংসারের শৃঙ্খলায় একটা বড়সড় ফাটল হিসেবে।

আজকালকার মেয়েদের মন বোঝা বড় দায়। তাদের কাছে আবেগ আর অধিকারের সীমানাটা বড় দ্রুত বদলে যায়। শিউলির  চোখে তখন কমল মানেই মুক্তি, আর বাবা মানে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। সেই দেয়াল টপকানোর চেয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়াটাই তার কাছে সহজ মনে হয়েছিল।

বিষের নীল নকশা

মদতদাতা হিসেবে শিউলি বেছে নিল নিজেরই ভাই চেতনকে। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা—একটা মানুষের জীবনের দাম কি আজকের দিনে এতটাই সস্তা? সেই টাকায় কেনা হলো বিষ। শিউলির  হাত কাঁপেনি। যে হাতে ছোটবেলায় বাবার আঙুল ধরে মেলায় যেত, সেই হাতেই সে তৈরি করল এক গ্লাস মিল্কশেক। উপরে ঘন ফেনা, ভেতরে মৃত্যু।

"বাবা, ডিউটিতে যাওয়ার আগে এটা খেয়ে যাও।"

সুমনবাবু জানতেন না, তাঁর আদরের মেয়েটি আসলে তাঁকে বিদায় সংবর্ধনা দিচ্ছে। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসের সামনে পৌঁছে যখন মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন তিনি, তখন কেউ ভাবেনি এটা খুন। সবাই ভাবল, 'সাডেন ইলনেস'। পুলিশের চাকরি, ধকল তো কম নয়! ফাইল বন্ধ হয়ে গেল।

উচ্চাকাঙ্ক্ষার নতুন উর্দি

বাবার মৃত্যুর পর শিউলির স্বপ্নপূরণ হলো। সেই একই পুলিশ বিভাগে চাকরি পেল সে। ঠিক এটাই সে চেয়েছিল—একদিকে সরকারি নিরাপত্তা, অন্যদিকে কমলের সঙ্গে অবাধ প্রেম। সে ভেবেছিল, রক্তের দাগ সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলা যায়। সে ভেবেছিল, বাবার চেয়ারে বসে বাবার খুনের স্মৃতি মুছে ফেলা সম্ভব।

কমল আর শিউলি বিয়ে করল। কিন্তু যে সম্পর্কের ভিত তৈরি হয় লাশের ওপর, সেখানে কি আর শান্তি থাকে? তিনটে বছর কাটতে না কাটতেই সেই 'স্বপ্নের প্রেম' তেতো হয়ে উঠল। ঝগড়া, মারামারি আর পারস্পরিক ঘৃণা ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেতে লাগল।

শেষ অঙ্ক

মানুষের পাপবোধ বড় বিচিত্র। কমল যখন শেষ পর্যন্ত থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করল, তার হাতে ছিল কল রেকর্ডিং আর ভিডিওর অকাট্য প্রমাণ। ভালোবাসার মানুষটিই হয়ে উঠল শিউলির  যমদূত।

ভালোবাসা মানে কি তবে কেবলই নিজের সুবিধাটুকু চিনে নেওয়া? আজকের প্রজন্মের এই আত্মকেন্দ্রিকতা, যেখানে নিজের সুখের জন্য জন্মদাতার রক্ত ঝরাতেও বুক কাঁপে না, তা কোনো সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। শিউলির এই কাহিনী কেবল একটি অপরাধের গল্প নয়, এটি একটি সময়ের পচনের আখ্যান।

চিন্তার খোরাক: আমরা কি এতটাই আধুনিক হয়ে গেছি যে, হৃদপিণ্ডের বদলে এখন আমাদের বুকের ভেতর কেবল একটা ক্যালকুলেটর ঘোরে? নিজের বাসনার জন্য যারা শেকড় ছিঁড়ে ফেলতে দ্বিধা করে না, তাদের জন্য কোনো সমাজই শেষ পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে না।


Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

রাজা যযাতির পতন ও মুক্তি

সত্যবতী ও ব্যাসদেব