লক্ষ্যভেদ ও ললাটলিখন: ছদ্মবেশের আড়ালে পাঞ্চালরাজের স্বপ্নপূরণ
লক্ষ্যভেদ ও ললাটলিখন: ছদ্মবেশের আড়ালে পাঞ্চালরাজের স্বপ্নপূরণ
স্বয়ংবর সভার সেই তুমুল শোরগোল, অস্ত্রঝনঝনা আর রাজন্যবর্গের বিস্ময়মাখা চোখের পলক তখনও পুরোপুরি থিতিয়ে যায়নি। তার আগেই জনসমুদ্রের সেই উত্তাল ঢেউ কাটিয়ে তিনটে ছায়া নিঃশব্দে সরে এল বাইরে—অর্জুন, ভীম আর সদ্যপরিণীতা দ্রৌপদী। হারের গ্লানিতে জ্বলতে থাকা রাজাদের হতবাক করে দিয়ে তাঁরা পা বাড়ালেন কুমোরপাড়ার সেই নিভৃত কুটিরের দিকে, যেখানে ছদ্মবেশে দিন কাটছে তাঁদের পরিবারের।
রাজপ্রাসাদে বসে তখন গভীর চিন্তায় মগ্ন রাজা দ্রুপদ। তাঁর মন বারবার বলছে, ওই লক্ষ্যভেদ অর্জুন ছাড়া আর কারও কর্ম নয়। দ্রৌপদীও তো সেই ব্রাহ্মণ যুবকের গলাতেই মালা দিয়েছেন। কিন্তু খটকাটা তবুও যাচ্ছে না—সত্যিই কি সে অর্জুন? পাঞ্চালরাজের মনের কোণে এক অব্যক্ত সংশয় দানা বেঁধে রইল।
সত্যের সন্ধান করতে তিনি পাঠালেন পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্নকে। ধৃষ্টদ্যুম্ন সভার শেষ থেকেই গোপনে অনুসরণ করেছিলেন ওই তিনজনকে। প্রাসাদে ফিরে পিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন, “পিতা, বোন দ্রৌপদী কোনো সাধারণ ব্রাহ্মণের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়নি। যে যুবকটি লক্ষ্যভেদ করেছে, তার তেজ আর শৌর্য দেখার মতো। সে তার মা আর চার ভাইয়ের সাথে এক কুমোরের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু তাদের চালচলন, কথা বলার ভঙ্গি—সবই আভিজাত্যে মোড়া। তারা আর যাই হোক, সাধারণ মানুষ নয়। আমার বিশ্বাস, তারা কোনো মহান রাজবংশের সন্তান।”
পুত্রের মুখে এ কথা শুনে দ্রুপদের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের কুলপুরোহিতকে পাঠালেন সেই কুটিরে।
সেই জীর্ণ কুটিরে পৌঁছে পুরোহিত দেখলেন এক আশ্চর্য দৃশ্য। অভাবের মধ্যেও এক অদ্ভুত রাজকীয় গাম্ভীর্য ঘিরে আছে ঘরটিকে। জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠির অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে পুরোহিতকে অভ্যর্থনা জানালেন। পুরোহিত তখন গম্ভীর গলায় রাজকীয় বারতা দিলেন— “রাজা দ্রুপদ মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন তাঁর কন্যা যেন অর্জুনের ঘরণী হয়। কিন্তু সভায় এক ব্রাহ্মণ লক্ষ্যভেদ করায় রাজকন্যার মালা তাঁর গলাতেই উঠেছে। মহারাজের মনে আজ সংশয়—তাঁর সেই আজন্ম লালিত ইচ্ছা কি শেষ পর্যন্ত অপূর্ণই রয়ে গেল?”
যুধিষ্ঠির অবিচলিত। মুখে তাঁর স্নিগ্ধ প্রশান্তি। ধীর গলায় তিনি উত্তর দিলেন, “মান্যবর, আপনি রাজাকে জানাবেন যে তাঁর ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। চিন্তার কোনো কারণ নেই।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই দ্রুপদের পাঠানো রাজদূত এসে পৌঁছালেন সেখানে। অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে তিনি সবাইকে রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানালেন। আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে দ্বিধা করলেন না যুধিষ্ঠির। সাজানো রথে চড়লেন কুন্তী আর দ্রৌপদী, অন্য এক রথে পাঁচ ভাই। পাঞ্চালরাজ্যের রাজপথ দিয়ে সেই রাজকীয় শোভাযাত্রা যখন প্রাসাদের দিকে চলল, তখন সবার চোখেমুখে এক আশ্চর্য গরিমা।
প্রাসাদে তাঁদের অভ্যর্থনা জানানো হলো বীরের মর্যাদায়। কুন্তী আর দ্রৌপদীকে নিয়ে যাওয়া হলো অন্দরমহলে, আর পাঁচ ভাই প্রবেশ করলেন রাজসভায়। রাজা দ্রুপদ এবার সরাসরি যুধিষ্ঠিরের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “আমার একমাত্র কামনা ছিল অর্জুনকে জামাতা হিসেবে পাওয়া। আপনারা সত্য করে বলুন, আপনাদের পরিচয় কী? আপনাদের এই রাজকীয় তেজ দেখে কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছি না যে আপনারা সাধারণ কুলে জন্মেছেন।”
যুধিষ্ঠির এক পা এগিয়ে এলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ধীর অথচ বজ্রের মতো গম্ভীর। তিনি বললেন, “মহারাজ, স্বয়ংবর সভা তো কোনো বিশেষ একজনের জন্য সাজানো হয় না। এ হলো বীরত্বের পরীক্ষা, যেখানে শ্রেষ্ঠজনকেই বেছে নেওয়া হয়। আপনার নির্ধারিত কঠিন শর্ত আমার ভাই পূরণ করেছে, তাই নিয়ম মেনেই সে আপনার কন্যাকে জয় করেছে। এখানে কোনো ত্রুটি নেই।”
একটু থেমে যুধিষ্ঠির সেই পরম সত্যটি প্রকাশ করলেন, যা শোনার জন্য দ্রুপদ রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিলেন। “আমরা পাণ্ডব। যে বীর আজ লক্ষ্যভেদ করেছে, সে আপনার কাঙ্ক্ষিত সেই অর্জুন। আর অন্দরমহলে আপনার কন্যার পাশে যিনি বসে আছেন, তিনি আমাদের গর্ভধারিণী কুন্তী। সুতরাং মহারাজ, আপনার সকল ইচ্ছাই পূর্ণ হয়েছে।”
মুহূর্তের মধ্যে দ্রুপদের মনের সব মেঘ কেটে গেল। সংশয়ের বদলে সেখানে জায়গা করে নিল এক গভীর তৃপ্তি আর আনন্দ। নিয়তি তবে শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রার্থনা শুনেছে; তাঁর কন্যা খুঁজে পেয়েছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বীরকে।

Comments
Post a Comment