যযাতি, দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: এক রাজার দুই নারী ও এক পুত্রের ত্যাগ
যযাতি, দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: এক রাজার দুই নারী ও এক পুত্রের ত্যাগ
শুক্ৰাচার্যের আশ্রমের চারদিকের বনটা বড় ঘন, বড় রহস্যময়। সেই বনের গভীরে ঢুকে পড়লে সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। একদিন মৃগয়ায় বেরিয়ে রাজা যযাতি ঠিক এইরকম এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেলেন। শিকারে মত্ত হয়ে তিনি যখন একটা নির্জন প্রান্তরে এসে পৌঁছলেন, দেখলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য।
সেখানে দুই নারী দাঁড়িয়ে। একজনের চোখেমুখে আভিজাত্যের প্রখর তেজ, অন্যজন শান্ত কিন্তু ভেতরে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। যযাতি জানতে চাইলেন তাঁদের পরিচয়।
প্রথমজন সরাসরি উত্তর দিলেন। তিনি দেবযানী, অসুরগুরু শুক্রাচার্যর কন্যা। অন্যজন শর্মিষ্ঠা—অসুররাজ বৃষপর্বার মেয়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাজকন্যা শর্মিষ্ঠা সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন দেবযানীর পরিচারিকা হিসেবে। যযাতি তখনও জানতেন না এর পেছনের জটিল ইতিহাস। কিন্তু দেবযানী যখন রাজার দিকে তাকালেন, তাঁর চোখে ফুটে উঠল চেনা মানুষের উষ্ণতা।
তিনি রাজাকে চিনতেন।
সেই কুয়োর গভীর থেকে বাড়ানো হাত
দেবযানী মনে করিয়ে দিলেন পুরনো এক স্মৃতি। একদিন অরণ্যে ঘুরতে ঘুরতে দেবযানী এক পরিত্যক্ত কুয়োর গভীরে পড়ে গিয়েছিলেন। কেউ ছিল না উদ্ধারের। সেই সময় এক শিকারি এসে নিজের হাত বাড়িয়ে তাঁকে টেনে তুলেছিলেন। সেই শিকারি ছিলেন স্বয়ং যযাতি।
প্রাচীন ভারতের সেই কঠিন নিয়মের পৃথিবীতে, এক পুরুষ যখন এক নারীর হাত ধরে টেনে তোলে, সেই স্পর্শের এক নিগূঢ় অর্থ থাকে। দেবযানী মনে মনে সেই মুহূর্তেই যযাতিকে বরণ করে নিয়েছিলেন। আজ এতকাল পর সেই সংযোগ পূর্ণতা পাওয়ার সুযোগ এলো। দেবযানী প্রস্তাব দিলেন—যযাতি যেন তাঁকে বিবাহ করেন।
যযাতি দ্বিধায় পড়লেন। তিনি ক্ষত্রিয় রাজা, আর দেবযানী ব্রাহ্মণের কন্যা। এ বিবাহ শাস্ত্রসম্মত কি না, সেই আশঙ্কায় তিনি বললেন, "তোমার পিতার অনুমতি ছাড়া আমি এ প্রস্তাবে রাজি হতে পারি না।" দেবযানী নাছোড়বান্দা। তিনি সাফ জানালেন, যে পুরুষ প্রথম তাঁর দেহ স্পর্শ করেছে, সে-ই তাঁর স্বামী।
শেষ পর্যন্ত তাঁরা গেলেন মহর্ষি শুক্রাচার্যর কাছে।
পিতার অনুমতি ও এক কঠিন শর্ত
শুক্রাচার্য তাঁর আদুরে মেয়ের আবদার ফেরাতে পারলেন না। যযাতিকে দেখে তাঁর পছন্দ হলো। কিন্তু আশীর্বাদের সাথে তিনি জুড়ে দিলেন এক অমোঘ শর্ত। শর্মিষ্ঠা সহ এক হাজার দাসী দেবযানীর সাথে রাজপ্রাসাদে যাবে ঠিকই, কিন্তু যযাতি যেন ভুলেও শর্মিষ্ঠার শয্যাসঙ্গী না হন। যদি কোনোদিন এই সীমারেখা রাজা অতিক্রম করেন, তবে তার পরিণাম হবে ভয়াবহ।
যযাতি শর্ত মেনে নিলেন। মহাসমারোহে বিয়ে হলো। প্রাসাদে ফিরে দেবযানী সুখে ঘরকন্না শুরু করলেন। তাঁর কোলে এলো দুই পুত্র—যদু আর তুর্বসু। কিন্তু নিয়তি অন্য কোথাও জাল বুনছিল।
অশোকবন ও এক গোপন প্রতিশ্রুতি
রাজপ্রাসাদের অদূরে এক নিভৃত অশোকবনে শর্মিষ্ঠার থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন যযাতি। একদিন সেই বনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাজার সাথে দেখা হলো শর্মিষ্ঠার।
শর্মিষ্ঠা সেখানে দাসের বেশে ছিলেন না, ছিলেন এক রাজকন্যার মহিমায়। তিনি সরাসরি রাজাকে বললেন, "আমিও এক রাজার কন্যা। আমারও অধিকার আছে মা হওয়ার, পূর্ণ নারীজন্ম পাওয়ার। আপনি কি আমাকে শুধু দয়া করে বাঁচিয়ে রাখবেন? আমায় মাতৃত্ব দেবেন না?"
যযাতি ধর্মসঙ্কটে পড়লেন। আর্তের প্রার্থনা ফেরানো ক্ষত্রিয় ধর্ম নয়—এই যুক্তিতে তিনি নিজের প্রতিজ্ঞা ভাঙলেন। শর্মিষ্ঠার গর্ভে জন্ম নিল তিন পুত্র—দ্রুহ্যু, অনু আর পুরু।
সেই অমোঘ মুহূর্ত ও অভিশাপ
গোপন কথাটি আর গোপন থাকল না। একদিন দেবযানী তাঁর সন্তানদের নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে দেখেন, অশোকবনে তিনটি দিব্যকান্তি শিশু খেলা করছে। সন্দেহের বশে তিনি শিশুদের কাছে জানতে চাইলেন তাঁদের পিতার নাম। শিশুরা আঙুল তুলে যযাতিকে দেখিয়ে দিল।
দেবযানীর পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। অপমানে, ক্রোধে তিনি ফেটে পড়লেন। শর্মিষ্ঠার রাজকন্যা সুলভ তেজও সেদিন কম ছিল না। তিনি দেবযানীকে মনে করিয়ে দিলেন যে, ক্ষত্রিয় রাজার জন্য ক্ষত্রিয় কন্যাই যোগ্য স্ত্রী, বরং দেবযানীই জাত কুল ভেঙে বিয়ে করেছেন।
কিন্তু দেবযানী সে কথা শোনার পাত্রী নন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে পিতার আশ্রমে চলে গেলেন। যযাতি পিছু পিছু ধাবিত হলেন ক্ষমা চাইতে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শুক্রাচার্য ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে অভিশাপ দিলেন—"যৌবনের মোহে তুমি অন্ধ হয়েছ, তাই এখনই তোমার জরাগ্রস্ত বার্ধক্য আসুক।"
পলকের মধ্যে যযাতির টানটান শরীর কুঁচকে গেল, চুলে পাক ধরল, হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। এক লহমায় তেজস্বী রাজা হয়ে গেলেন এক অথর্ব বৃদ্ধ।
পুত্রের ত্যাগ ও যযাতির উপলব্ধি
যযাতি আকুল হয়ে প্রার্থনা করলেন। শুক্রাচার্য কিছুটা শান্ত হয়ে বললেন, "যদি তোমার কোনো পুত্র স্বেচ্ছায় তার যৌবন তোমাকে দেয়, তবেই তুমি আবার তরুণ হতে পারবে। বিনিময়ে তাদের সেই জরা ধারণ করতে হবে।"
যযাতি একে একে তাঁর সব ছেলেদের ডাকলেন—যদু, তুর্বসু, দ্রুহ্যু, অনু। সবাই পিছিয়ে গেল। যৌবনের সুখ বিসর্জন দিয়ে কে অকালে বৃদ্ধ হতে চায়? ক্ষুব্ধ যযাতি তাঁদের প্রত্যেককে অভিশাপ দিলেন যে তাঁদের বংশধররা কখনো রাজসিংহাসনের অধিকারী হবে না।
সবশেষে তিনি এলেন শর্মিষ্ঠার ছোট ছেলে পুরুর কাছে। পুরু মাথা নিচু করে বললেন, "পিতা, আমি আপনার জরা গ্রহণ করছি। আপনি আবার তরুণ হয়ে পৃথিবীর আনন্দ উপভোগ করুন।"
মুহূর্তের মধ্যে বিনিময় ঘটে গেল। বৃদ্ধ পুরু প্রাসাদের কোণে পড়ে রইলেন, আর নবযৌবন ফিরে পেয়ে যযাতি মেতে উঠলেন ভোগবিলাসে।
মহাভারতের এই গল্প আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, কামনা এক অগ্নিকুণ্ডের মতো—যত তাতে ঘৃতাহুতি দেওয়া হয়, তার শিখা তত বাড়ে। এক হাজার বছর ভোগ করার পর যযাতি একদিন বুঝতে পারলেন, কামনার কোনো শেষ নেই। তিনি পুরুকে ডাকলেন, তাঁর যৌবন ফিরিয়ে দিলেন এবং তাঁকে রাজ্যের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করলেন।
সেই পুরু থেকেই শুরু হয়েছিল পুরু-বংশ, যেখানে কয়েক প্রজন্ম পরে জন্ম নেবেন কুরু আর পাণ্ডবরা। আর সবকিছুর মূলে ছিল বনের সেই শান্ত নির্জনতা আর এক রাজার বাড়ানো হাতের এক মুহূর্তের স্পর্শ।
পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন

Comments
Post a Comment