লক্ষ্যভেদের পথে: এক অজ্ঞাতবাসের উপাখ্যান


লক্ষ্যভেদের পথে: এক অজ্ঞাতবাসের উপাখ্যান

একচক্রা ছেড়ে পাঞ্চালের পথে যখন যাত্রা শুরু হলো, আকাশ তখন ধূসর। কুন্তী আর পাঁচ ভাই পা বাড়ালেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। সঙ্গে তাঁদের কুলপুরোহিত ধৌম্য। পরনে সাধারণ ব্রাহ্মণের সাজ, কাঁধে মৃগচর্ম, হাতে কমণ্ডলু—কে বলবে এঁরাই একসময় হস্তিনাপুরের রাজৈশ্বর্যে বড় হয়েছেন? তাঁদের হাঁটাচলায় একটা শান্ত দৃঢ়তা ছিল, যেন কোনো গূঢ় সংকল্প বুকের ভেতরে পাথর হয়ে বসে আছে।

পথের ধারে দেখা হলো একদল ভ্রাম্যমাণ ব্রাহ্মণের সঙ্গে। তাঁদের চোখেমুখে কৌতূহল। যুধিষ্ঠিরকে দেখে তাঁরা থমকে দাঁড়ালেন।

"কোত্থেকে আসা হচ্ছে আপনাদের? লক্ষ্য কি সেই পাঞ্চাল?"

যুধিষ্ঠির শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, "আমরা একচক্রা থেকে আসছি। পাঞ্চাল রাজকন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরের কথা শুনলাম, তাই কৌতূহলবশত সেদিকেই পা বাড়ানো।"

ব্রাহ্মণরা হেসেই অস্থির। "তবে তো বেশ হলো! আমরাও সেদিকেই যাচ্ছি। এমন এলাহি কাণ্ড কি আর রোজ রোজ দেখা যায়? চলুন, পথটা একসাথেই কাটা যাক।"

পাণ্ডবরা মিশে গেলেন সেই ভিড়ে। ভিড়ের মাঝে থেকেও তাঁরা ছিলেন নির্লিপ্ত, ঠিক যেমন করে গভীর জল বয়ে যায় তলায় তলায়।

কয়েক দিন হাঁটার পর পাঞ্চালের তোরণ যখন দেখা দিল, চারদিকে তখন সাজ-সাজ রব। চারিদিক থেকে ধুলো উড়িয়ে রথ আসছে, আসছে হাতির পিঠে দামি হাওদা। দেশ-বিদেশের বীর আর বণিকে শহর থইথই করছে। পাণ্ডবরা কিন্তু কোনো সরাইখানায় উঠলেন না। এক কুম্ভকারের দীন কুটিরে ঠাঁই নিলেন তাঁরা। বাইরের উৎসব থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখলেন এক অদ্ভুত আড়ালে।

অথচ পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের মনে তখন অন্য এক খেলা চলছিল। তিনি মনে মনে যা চাইছিলেন, তা মুখে প্রকাশ করেননি কাউকে। তাঁর গোপন বাসনা ছিল—লক্ষ্যভেদ যদি কেউ করতে পারে, তবে সে যেন কেবল অর্জুন হয়। তিনি জানতেন অর্জুন অদ্বিতীয়। তাই লক্ষ্যভেদের শর্তটা তিনি সাজিয়েছিলেন এমনভাবে, যা সাধারণ কোনো বীরের সাধ্যের অতীত।

এক বিশাল ধনু তৈরি করা হলো—ভারী এবং অনমনীয়। আর উপরে বসানো হলো এক ঘূর্ণায়মান চক্র, যার আড়ালে থাকা লক্ষ্যবস্তুকে বিদ্ধ করতে হবে নিচের এক পাত্রের জলে তার প্রতিফলন দেখে। এ কেবল বাহুবল নয়, এ হলো একাগ্রতার চরম পরীক্ষা।

উত্তর শহরে আয়োজন হলো স্বয়ম্বরের। বিশাল সভা, রঙিন পতাকা আর ফুলের গন্ধে ম ম করছে বাতাস। টানা ষোল দিন ধরে চলল উৎসব। তারপর এল সেই অন্তিম দিন।

ভারতবর্ষের রথী-মহারথীরা এসে আসন গ্রহণ করলেন। দুর্যোধন থেকে শুরু করে অশ্বত্থামা, শল্য থেকে জরাসন্ধ—কারও দম্ভের সীমা নেই। ঠিক তাঁদেরই অদূরে ব্রাহ্মণের বেশে বসে রইলেন পাণ্ডবরা। কেউ তাঁদের চিনতে পারল না। সভায় প্রবেশ করলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। মেঘগম্ভীর স্বরে তিনি ঘোষণা করলেন, "যিনি এই ধনুতে গুণ পরিয়ে ওই লক্ষ্যভেদ করতে পারবেন, তিনিই হবেন আমার ভগিনী দ্রৌপদীর পতি।"

আকাশের দেবতারাও যেন মেঘের আড়াল থেকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। যদুকুলপতি কৃষ্ণ আর বলরামও সেখানে উপস্থিত। কৃষ্ণ মিটিমিটি হাসছেন, যেন সবটাই তাঁর চোখের সামনে লেখা কোনো এক প্রাচীন নাটক।

একে একে রাজারা উঠলেন। কিন্তু যা হওয়ার তাই হলো। কেউ ধনুতে টঙ্কার দেওয়া তো দূর, তা মাটি থেকে তুলতেও হিমশিম খেলেন। সভার দম্ভ তখন হাসির পাত্রে পরিণত হচ্ছে।

এমন সময় উঠলেন কর্ণ।

দৃপ্ত পায়ে তিনি এগিয়ে গেলেন ধনুর দিকে। অনায়াসে তুলে নিলেন সেই ভার। সভায় গুঞ্জন উঠল—তবে কি শেষ পর্যন্ত এই সূতপুত্রই বাজিমাত করবেন? কিন্তু জ্যা-মুক্ত হওয়ার আগেই দ্রৌপদীর তীব্র কণ্ঠ চিরে দিল সভার স্তব্ধতা।

"আমি সূতপুত্রকে বরণ করব না!"

কর্ণ থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখে এক ম্লান হাসি ফুটে উঠল। সূর্যের দিকে একবার তাকিয়ে তিনি ধনু নামিয়ে রাখলেন। তাঁর চোখমুখে যন্ত্রণার ছায়া থাকলেও, হাঁটাচলায় এক আশ্চর্য গাম্ভীর্য ছিল। এরপর জরাসন্ধ, শল্য—সবাই বিফল হয়ে ফিরে গেলেন। সভা জুড়ে নেমে এল এক বিষণ্ণ নীরবতা।

দ্রুপদ কি তবে যোগ্য জামাতা পাবেন না?

সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে ব্রাহ্মণদের সারি থেকে উঠে দাঁড়ালেন এক যুবক। শরীরটা সামান্য ঋজু, চোখদুটো স্থির। তিনি অর্জুন। সবার অগোচরে তাঁর মনে তখন এক অচেনা সংকল্প। তিনি পা বাড়ালেন ধনুর দিকে।

মঞ্চে তখন ইতিহাস অপেক্ষা করছে, অথচ কেউ জানে না কী হতে চলেছে। নিয়তি তখন কেবল একটি তীরের অপেক্ষায়।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন


Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা