এক মানসী, যে হয়তো কোনোদিন ছিলই না—অথচ যাকে মুছে ফেলার সাধ্য নেই কারো।
ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে অনেক সময় এমন কিছু নাম উঠে আসে, যাদের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় থাকলেও বাঙালির বা ভারতবাসীর আবেগে তাদের স্থান প্রশ্নাতীত। আনারকলি তেমনই এক নাম। কোনো সম্রাট বা দিগ্বিজয়ীর নাম নয়, এ এক এমন কিশোরীর গল্প, যার অপরাধ ছিল শুধু ভালোবাসা।
অন্ধকার গলি আর ডালিমের ফুল
তার আসল নাম কী ছিল, কেউ জানে না। কিন্তু ইতিহাসে সে পরিচিত ‘আনারকলি’ নামে—যার অর্থ ডালিম ফুল। সে ছিল তরুণী, লাবণ্যময়ী আর বুদ্ধিমতী। মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল আগ্রার প্রাসাদে সে হেঁটে বেড়াত এক সহজাত আভিজাত্যে। আকবরের দরবার মানেই তখন একদিকে অঢেল সম্পদ, অন্যদিকে পদে পদে বিপদ। কবি, শিল্পী আর গুপ্তচরের ভিড়ে সেখানে প্রতিটা চাহনির আড়ালে লুকিয়ে থাকত এক একটা সমীকরণ। আনারকলি এসবই জানত, যতদিন না সে অসতর্ক হয়ে পড়ল।
আর সেই অসতর্কতার নাম—শেহজাদা সেলিম।
আকবরের পুত্র সেলিম ছিলেন ঠিক যেমনটা একজন মুঘল রাজপুত্রের হওয়া উচিত—উদ্দাম, চঞ্চল এবং জীবনের প্রতি এক তীব্র তৃষ্ণায় ভরপুর। একদিন সেলিমের চোখ গিয়ে পড়ল আনারকলির ওপর। সেই যে দৃষ্টি বিনিময় হলো, তা আর সরলো না। রাজপুত্রের চোখে ছিল মুগ্ধতা, আর সেই বাঁদী কিশোরীর চোখে ছিল এক অবাধ্য স্পর্ধা।
সিংহাসন বনাম হৃদয়
এরপর শুরু হলো সেই নিষিদ্ধ প্রেম, যা আটকানোর জন্যই যেন গড়ে উঠেছিল বিশাল মুঘল সাম্রাজ্য। সোনালি কারুকাজ করা হলের আড়ালে গোপন চাউনি, প্রাসাদের ছায়ায় লুকিয়ে থাকা মুহূর্ত—সবকিছুই ছিল এক চরম ঝুঁকির খেলা। সেলিম জানতেন তিনি কী হারাতে পারেন, আর আনারকলি বোধহয় জানতেন তার পরিণতি কী হতে পারে। তবু, তারা ভালোবেসেছিলেন।
কিন্তু মুঘল সম্রাটের দেওয়ালেরও কান থাকে। খবর পৌঁছাল আকবরের কানে।
আকবর নিষ্ঠুর ছিলেন না, কিন্তু সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। যে সিংহাসন তিনি তিল তিল করে গড়েছেন, তার উত্তরাধিকারী একজন নর্তকীর প্রেমে পড়ে রাজ্যকে অস্থির করে তুলবে—এটা তিনি মানতে পারেননি। সম্রাটের ক্রোধ আছড়ে পড়ল সেই ক্ষুদ্র ও অসহায় লক্ষ্যবস্তুটির ওপর।
শাস্তি হিসেবে স্থির হলোএক মানসী, যে হয়তো কোনোদিন ছিলই না—অথচ যাকে মুছে ফেলার সাধ্য নেই কারো।
জ্যান্ত সমাধি।
আনারকলিকে প্রাসাদের দেওয়ালের ভেতর গেঁথে ফেলা হবে।
গল্প বলে, একটা একটা করে ইট গাঁথা হতে থাকল। বাইরের আলো ক্রমশ সরু হয়ে এল। বাইরের কণ্ঠস্বরগুলো প্রথমে অস্পষ্ট, তারপর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ডালিম ফুলটি চিরতরে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। যে সেলিম ভবিষ্যতে সম্রাট জাহাঙ্গীর হয়ে ইতিহাস গড়বেন, তিনি তখন অসহায়। বাবার নির্দেশের পাথুরে দেওয়ালের সামনে তার চিৎকার বা চোখের জল—কোনোটারই কোনো মূল্য ছিল না।
ইতিহাসের নীরবতা ও বিদেশি পর্যটক
এবার আসা যাক এক অদ্ভুত সত্যে। মুঘলদের কোনো দলিলে এই ঘটনার কোনো উল্লেখ নেই। আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’য় তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও আনারকলির নাম পাওয়া যায় না। এমনকি জাহাঙ্গীর তার নিজের আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরি’তে নিজের জীবনের নানা গোপন কথা অকপটে লিখলেও, আনারকলির ব্যাপারে একটি শব্দও খরচ করেননি। যে দরবারে ছোটখাটো ঘটনাও নথিভুক্ত হতো, সেখানে আনারকলিকে নিয়ে এই নীরবতা বেশ রহস্যজনক।
আনারকলির কথা প্রথম জানা যায় ১৬০৮ সালে ভারতে আসা এক ইংরেজ পর্যটক উইলিয়াম ফিঞ্চের লেখনীতে। তিনি শুনেছিলেন—একজন উপপত্নী আর রাজপুত্রের প্রেমের কথা, আর তার সেই ভয়াবহ শাস্তির কথা। পরে এডওয়ার্ড টেরি নামে আরেক পর্যটকও একই গল্প শুনিয়েছিলেন। তারা দুজনেই মুঘল নথিপত্র দেখেননি, বরং সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফেরা সেই ‘কিসসা’ বা গল্পগুলোই সংগ্রহ করেছিলেন।
ঐতিহাসিকদের মতে, আনারকলি আসলে এক লোকগাথা। লাহোরে তার একটি সমাধি আছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে খোদাই করা নাম বা তারিখগুলো নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই।
তবুও কেন সে অমর?
১৯৬০ সালে যখন বড় পর্দায় ‘মুঘল-এ-আজম’ মুক্তি পেল, গোটা ভারত কেঁদেছিল। (পরিচালনায় কে আসিফ, দিলিপ কুমার সেলিমের, মধুবালা আনারকলির ভূমিকায়) আনারকলির সেই বিদ্রোহী নাচ আর করুণ পরিণতি মানুষকে নতুন করে বুঝিয়ে দিয়েছিল, প্রেম কেন ক্ষমতার চেয়েও শক্তিশালী।
আনারকলি সত্যি কি না, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, এই কাহিনীটি একটি শাশ্বত সত্যকে তুলে ধরে—যখনই ভালোবাসা ক্ষমতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, ক্ষমতা তাকে পিষে ফেলার চেষ্টা করেছে। আনারকলি কোনো ভুল করেনি, তার একমাত্র ‘দোষ’ ছিল সে এমন একজনকে ভালোবেসেছিল, যাকে ভালোবাসা বারণ ছিল।
পৃথিবীর প্রতিটি সংস্কৃতিতে এমন একটা গল্প থাকে। সময় বদলায়, নাম বদলায়, কিন্তু প্রেক্ষাপটটা একই থাকে। মুঘল দেওয়ালের ভেতরে সেই ডালিম ফুলটি শেষ পর্যন্ত ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু কয়েক শতাব্দী ধরে সে বেঁচে আছে এদেশের মানুষের কল্পনায়, গানে, কবিতায় আর দীর্ঘশ্বাসে।
নথিভুক্ত ইতিহাসের চেয়েও মানুষের আবেগ কখনও কখনও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। দেওয়াল তুলে তাকে ঢাকা যায়নি—আনারকলি সেই দেওয়াল ভেঙেই আজও অমর হয়ে আছে।
c
on

Comments
Post a Comment