অগ্নিসম্ভবা দ্রৌপদী: অপমানের দহন থেকে কুরুক্ষেত্রের বীজবপন

 


অগ্নিসম্ভবা দ্রৌপদী: অপমানের দহন থেকে কুরুক্ষেত্রের বীজবপন

বকাসুর বধের পর একচক্রা নগরীর সেই দিনগুলো ছিল শান্ত, যেন ঝড়ের আগের স্তব্ধতা। পাণ্ডবরা এখন ছদ্মবেশে, ব্রাহ্মণের সাজে। কুন্তী আর তাঁর পাঁচ পুত্র সেখানে বাস করছেন এক ব্রাহ্মণের আশ্রয়ে। তাঁদের দিন কাটে শাস্ত্রচর্চায় আর অরণ্যের নিভৃত শান্তিতে। কিন্তু নিয়তি যাঁদের জন্য কুরুক্ষেত্রের রণক্ষেত্র সাজিয়ে রেখেছে, তাঁদের কি আর নিস্তরঙ্গ জীবন মানায়?

একদিন তাঁদের কুটিরে এলেন এক পরিব্রাজক ব্রাহ্মণ। আতিথেয়তায় কোনো ত্রুটি রাখলেন না কুন্তী। সামান্য অন্নেই তুষ্ট হলেন সেই অতিথি। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে প্রদীপের ম্লান আলোয় বসে তিনি শোনাতে লাগলেন দেশ-বিদেশের বিচিত্র সব কাহিনী। কথা বলতে বলতে এক সময় প্রসঙ্গ এল পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কথা। উঠে এল যজ্ঞসেনী দ্রৌপদীর জন্মবৃত্তান্ত।

ব্রাহ্মণ বলতে লাগলেন, "রাজা দ্রুপদ অপমানের এক তীব্র দহন বুকে নিয়ে বেঁচে ছিলেন। দ্রোণাচার্যের কাছে পরাজয় তিনি ভুলতে পারেননি। একদা সখা ছিলেন তাঁরা, কিন্তু ক্ষমতার দম্ভ তাঁদের শত্রু করে দিয়েছিল। দ্রুপদ চাইছিলেন এমন এক পুত্র, যে দ্রোণকে বধ করবে।"

দ্রুপদ খুঁজে বেরিয়েছিলেন এমন এক ঋষিকে, যিনি তাঁকে এই বর এনে দেবেন। অবশেষে তিনি দেখা পেলেন কালমাষী ব্রাহ্মণদের। প্রথমে উপযাজকে অনুরোধ জানালেও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। প্রতিশোধের যজ্ঞে তিনি রাজি নন। কিন্তু তাঁর ভাই যাজ সেই দায়িত্ব নিলেন। যজ্ঞের আগুন জ্বলে উঠল দাউদাউ করে।

সেই লেলিহান শিখা থেকে একে একে উঠে এলেন দুই অলৌকিক সত্তা। প্রথমে এক দিব্য কবচধারী বীর, রথে আসীন হয়ে প্রকট হলেন—তিনিই ধৃষ্টদ্যুম্ন। আর তারপর উঠে এলেন এক কৃষ্ণবর্ণা কন্যা, যাঁর রূপের ছটায় চারপাশ ম্লান হয়ে গেল। তাঁর গায়ের বর্ণ মেঘের মতো শ্যামল, আর চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত মায়া। আকাশবাণী হলো—এই কন্যাই একদিন কৌরব বংশের বিনাশের কারণ হবে।

যাজ ও উপযাজের আশীর্বাদে পাঞ্চাল রাজমহিষী তাঁদের নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করলেন। বালিকাটির নাম রাখা হলো কৃষ্ণা, তবে জগৎ তাঁকে জানল দ্রৌপদী নামে।

ব্রাহ্মণ বিরতি নিয়ে বললেন, "আশ্চর্যের বিষয় কী জানেন? যাঁকে মারার জন্য ধৃষ্টদ্যুম্ন জন্মেছেন, সেই দ্রোণাচার্যের কাছেই তিনি অস্ত্রশিক্ষা নিলেন। দ্রোণ জানতেন এই রাজপুত্র তাঁর মৃত্যুর কারণ হবে, তবুও তিনি আচার্যের ধর্ম পালন থেকে বিচ্যুত হননি। নিয়তি এভাবেই সব আগে থেকে বুনে রাখে।"

পাণ্ডবরা নিঃশব্দে সেই কাহিনী শুনলেন। কুন্তীর চোখের কোণে বোধহয় এক পলকের জন্য খেলে গেল কোনো এক অদৃশ্য সংকেত। দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরের কথা শুনে অর্জুনের মনের গভীরে কি কোনো অস্পষ্ট দোলা লেগেছিল? সে কথা ইতিহাস বলেনি, কিন্তু সেই রাত থেকেই কুরুক্ষেত্রের মহানাটকের পরবর্তী অঙ্ক লেখা শুরু হয়ে গেল।

সূর্যোদয়ের আগেই পাণ্ডবরা অনুধাবন করলেন, একচক্রার শান্ত দিনগুলি ফুরিয়ে এসেছে। এবার যাত্রার লগ্ন। গন্তব্য—পাঞ্চাল নগরী।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র

রাজা যযাতির পতন ও মুক্তি