এক ধর্মনিষ্ঠ রাজার নির্জনতা
এক ধর্মনিষ্ঠ রাজার নির্জনতা
শান্তনু আর পাঁচটা রাজার মতো ছিলেন না। তাঁর রাজ্যে হস্তিনাপুরের আকাশ ছিল মেঘমুক্ত, প্রজাদের মনে ছিল না কোনো সংশয়। কিন্তু রাজার নিজের মনের গহীনে ছিল এক অদ্ভুত নির্জনতা। দীর্ঘ ছত্রিশ বছর তিনি ব্রহ্মচর্য পালন করেছেন। সিংহাসনে বসেও তিনি ছিলেন অরণ্যচারী ঋষির মতো সংযমী। সত্য আর ধর্মের প্রতি তাঁর যে অবিচল নিষ্ঠা, তা সেকালের আর কোনো বীরের মধ্যে দেখা যেত না।
কিন্তু নিয়তি তো শান্ত বসে থাকে না, সে নিঃশব্দে জাল বোনে।
থমকে যাওয়া জাহ্নবী
সেদিন গঙ্গার তীরে একা হাঁটছিলেন শান্তনু। গঙ্গা তাঁর বহুদিনের সখী, তাঁর স্মৃতির চিরন্তন স্পন্দন। কিন্তু সেদিন ঘাটে গিয়ে রাজা থমকে দাঁড়ালেন। গঙ্গার চঞ্চল জলধারা আজ যেন কোনো মায়ায় স্থবির হয়ে গেছে। যে নদী উদ্দাম বেগে পাহাড় থেকে সমতলে নেমে আসে, সে আজ ক্লান্ত, দ্বিধাগ্রস্ত। স্রোত নেই, কেবল এক অদ্ভুত নীরবতা চারদিকে।
কৌতূহলী শান্তনু নদীর পাড় ধরে উজানে হাঁটতে লাগলেন। দেখতে চাইলেন, কিসের দাপটে মহাপ্রাণ গঙ্গা এমন অচল হয়ে পড়ল।
বাণের বাঁধ ও এক দিব্য বালক
কিছুদূর এগোতেই রাজা দেখলেন এক অভাবনীয় দৃশ্য। এক দীর্ঘকায় কিশোর দাঁড়িয়ে আছে তীরের ঠিক মাঝখানে। তার চওড়া কাঁধ, চোখে এক উজ্জ্বল জ্যোতি যা মানুষের মনে হয় না। কিশোরের হাতে একটি ধনুক, আর সে ক্ষিপ্রগতিতে একের পর এক শর নিক্ষেপ করছে নদীর বুকে। সেই অজস্র তীরের নিখুঁত বিন্যাসে তৈরি হয়েছে এক অভেদ্য বাঁধ। গঙ্গার প্রবল ধারা সেই শরশয্যায় বাধা পেয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
শান্তনু স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি বহু যুদ্ধ দেখেছেন, বহু বীরের পরাক্রম দেখেছেন, কিন্তু এমন কৌশল? এ যেন মর্ত্যের কোনো বিদ্যা নয়। পলক ফেলতেই সেই বালক যেন কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল চোখের সামনে থেকে। নদী আবার সচল হলো, কিন্তু শান্তনুর বুক ধড়ফড় করতে লাগল। তিনি জানতেন না, এই কিশোরই তাঁর সেই হারিয়ে যাওয়া সন্তান, যাকে বহু বছর আগে গঙ্গা নিয়ে গিয়েছিলেন।
জননীর প্রত্যাবর্তন
অস্থির শান্তনু কাতর স্বরে আহ্বান করলেন গঙ্গাকে। সেই ডাকে ছিল দীর্ঘ বছরের প্রতীক্ষা। মুহূর্তের মধ্যে জলরাশির ভেতর থেকে উঠে এলেন দেবী গঙ্গা। পরনে রাজকীয় বসন, মুখে শান্ত হাসি। তাঁর হাত ধরে সেই অদ্ভুত কিশোর।
গঙ্গা সস্নেহে বললেন, "মহারাজ, এই আপনার অষ্টম পুত্র। একে আমি নিজের হাতে বড় করেছি, আজ একে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।"
শান্তনু অস্ফুট স্বরে কেবল চেয়ে রইলেন। গঙ্গা তখন একে একে শোনালেন সেই বালকের অসামান্য গৌরবের কথা:
* মহর্ষি বশিষ্ঠের কাছে সে চার বেদ আয়ত্ত করেছে।
অস্ত্রবিদ্যায় সে দেবরাজ ইন্দ্রের সমকক্ষ।
অসুরগুরু শুক্রাচার্য এবং দেবগুরু বৃহস্পতির সমস্ত জ্ঞান তার নখদর্পণে।
আর রণকৌশলে? সে স্বয়ং পরশুরামের তুল্য।
গঙ্গা বললেন, "রাজা, এই দেবব্রতকে গ্রহণ করুন। এ আপনার কোল আলো করে হস্তিনাপুরে ফিরবে।"
হস্তিনাপুরের ভবিষ্যৎ
শান্তনু যখন তাঁর পুত্রকে নিয়ে প্রাসাদে ফিরলেন, তখন তাঁর আনন্দাশ্রু বাঁধ মানছিল না। দেবব্রতকে তিনি মহাসমারোহে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। হস্তিনাপুরের প্রজারা মুগ্ধ হয়ে দেখল তাদের ভবিষ্যৎ রাজাকে—যাঁর চোখে পাণ্ডিত্য, আর বাহুতে অসীম শক্তি।
চারটি বছর কেটে গেল এক অনাবিল শান্তিতে। দেবব্রতের উপস্থিতিতে রাজ্য যেন এক নতুন প্রাণ পেল। কিন্তু মহাকাব্যের চাকা তো ঘুরবেই। এই শান্তির অন্তরালে যে অন্য কোনো ঝড় অপেক্ষা করছিল, তা তখন কারোরই জানা ছিল না।
দ্রষ্টব্য: এই দেবব্রতই পরবর্তীকালে ইতিহাসের পাতায় ভীষ্ম নামে পরিচিত হন, যাঁর ত্যাগ আর বীরত্ব মহাভারতের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

Comments
Post a Comment