অরণ্যের আলো ও নবযাত্রার সংকল্প: পাণ্ডবদের কুলপুরোহিত বরণ
অরণ্যের আলো ও নবযাত্রার সংকল্প: পাণ্ডবদের কুলপুরোহিত বরণ
গঙ্গার তীরে রাত তখন গভীর। জ্যোৎস্নার আলোয় জলরাশি রুপোলি সাপের মতো ঝিলমিল করছে, বাতাসে বুনো ফুলের এক মায়াবী সুবাস। চারপাশ নিঝুম, শুধু মাঝেমধ্যে জলের মৃদু কলতান শোনা যাচ্ছে। সেই নির্জনতায় পাণ্ডবরা গোল হয়ে বসে আছেন গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের চারপাশে। চিত্ররথ শোনাচ্ছেন প্রাচীন ঋষিদের গল্প—সেইসব মুনি-ঋষি, যাঁদের জ্ঞান সমুদ্রের মতো গভীর, আবার ক্রোধ আগুনের মতো ভয়ংকর।
সেইসব কাহিনীর ভিড়ে মহর্ষি বশিষ্ঠের কথা শুনে অর্জুনের মনে এক অদ্ভুত আলোড়ন তৈরি হলো। চিত্ররথ থামতেই অর্জুন একটু ঝুঁকে বসে বিনীত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “গন্ধর্বরাজ, একটা কথা জানতে বড় ইচ্ছে হয়। এই পৃথিবীতে পবিত্র পুরুষদের মধ্যে কে আমাদের পথপ্রদর্শক হওয়ার যোগ্য? আমরা পুরোহিতহীন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, আমাদের কোনো আধ্যাত্মিক অভিভাবক নেই। এমন কেউ কি আছেন, যাঁকে আমরা কুলপুরোহিত হিসেবে বরণ করতে পারি? যিনি আমাদের ধর্মের পথে চালিত করবেন?”
চিত্ররথ যেন এই প্রশ্নটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তাঁর শান্ত চোখে একপলক দৃষ্টি বুলিয়ে বললেন, “নিশ্চয়ই আছেন। উৎকচাক নামে এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্রে ধৌম্য নামে এক মহাপ্রাজ্ঞ বিপ্র বাস করেন। তিনি মহর্ষি দেবল বা সুবলের অনুজ। বর্তমানে তিনি কঠোর তপস্যায় মগ্ন, সত্য আর সংযমই তাঁর ভূষণ। তোমরা যদি এমন একজনকে চাও যিনি কক্ষনো তোমাদের বিপথে যেতে দেবেন না, তবে তাঁর কাছেই যাও। বিনীতভাবে অনুরোধ করলে তিনি হয়তো তোমাদের ভার গ্রহণ করবেন।”
কথাগুলো পাণ্ডবদের মনে আশার সঞ্চার করল। চিত্ররথকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কুন্তি আর পাঁচ ভাই সেই মুহূর্তেই যাত্রার প্রস্তুতি নিলেন। বনের পথ দুর্গম, কোথাও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মহীরুহ, কোথাও বন্য পশুর ডাক স্তব্ধতাকে বিদীর্ণ করছে। কিন্তু তাঁদের মনে তখন এক অদ্ভুত সংকল্প—তাঁরা নিয়তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
কয়েকদিনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তাঁরা পৌঁছালেন উৎকচাক আশ্রমে। জায়গাটা অপার্থিব শান্ত। সেখানে পাখিরা নির্ভয়, হরিণরা মানুষের গায়ের কাছে এসে ঘোরে, আর বাতাস যেন মন্ত্রোচ্চারণের মতো ফিসফিস করে কথা বলে। সেই তপোবনের মাঝখানে ধৌম্যর কুটির।
পাণ্ডবরা যখন পৌঁছালেন, ঋষি তখন ধ্যানে মগ্ন। জটাধারী সাধারণ বেশ, কিন্তু শরীর থেকে এক দিব্য জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। ভাইয়েরা তাঁর চরণে মস্তক নত করলেন।
ধৌম্য ধীরে ধীরে চোখ মেললেন। তাঁর চাউনিতে কোনো বিস্ময় নেই, বরং এক গভীর মমতা। বললেন, “এসো কুরুবংশতিলকগণ। আমি জানি তোমরা কারা। এই ছদ্মবেশ তোমাদের আসল পরিচয় আড়াল করতে পারেনি। তোমরা পাণ্ডুপুত্র, কঠিন পথেও তোমরা বীরের মতো অবিচল।”
ঋষির আতিথ্যে তাঁদের ক্লান্তি দূর হলো। বিশ্রাম শেষে যুধিষ্ঠির হাত জোড় করে নিবেদন করলেন, “হে মহাত্মন, আমরা পথপ্রদর্শকহীন। আমাদের কোনো পুরোহিত নেই যিনি যজ্ঞকর্মে বা সংকটের মুহূর্তে আমাদের পরামর্শ দেবেন। কৃপা করে আপনি আমাদের কুলপুরোহিত হিসেবে গ্রহণ করুন।”
ধৌম্য কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। সম্ভবত তাঁদের আন্তরিকতা মেপে নিচ্ছিলেন। তারপর ঠোঁটের কোণে একটু মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন, “আমি স্বীকৃত হলাম। আজ থেকে আমিই তোমাদের ধর্মের পথে চালিত করব। আসুক না যত পরীক্ষা, আমরা একসঙ্গে ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করব।”
এক নিমেষে যেন পাণ্ডবদের মনের সমস্ত ভার নেমে গেল। ধৌম্য পাশে থাকা মানেই এক পরম আশ্রয়ের ছায়া।
সেদিন বিকেলে যখন সূর্য পাটে বসছে, আকাশটা যখন সিঁদুরের মতো লাল হয়ে এল, পাণ্ডবরা তখন শান্ত মনে একসঙ্গে বসে রইলেন। তাঁদের মনে হলো, এবার লক্ষ্য স্থির।
এবার তাঁরা পৃথিবীর মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।
এবার তাঁরা পাঞ্চাল অভিমুখে যাত্রা করবেন।
এবার তাঁরা প্রবেশ করবেন দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায়।
আর মনের গহীনে প্রত্যেকেরই তখন এক অমোঘ বিশ্বাস—কুলপুরোহিতের আশীর্বাদ আর নিজেদের সংহতি নিয়ে তাঁরা যে পথে পা বাড়াচ্ছেন, সেখানে অচিরেই তাঁদের ভাগ্যলিপি নতুন করে লেখা হবে।
ধৌম্য বনবাস থেকে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ পর্যন্ত পাণ্ডবদের ধর্মীয় উপদেষ্টা। একটি রাজকীয় বংশের জন্য আদর্শ পুরোহিত কেমন হওয়া উচিত, বশিষ্ঠের উপাখ্যান থেকে পাণ্ডবরা সেই শিক্ষাই পেয়েছিলেন।

Comments
Post a Comment