পান্ডবদের জন্ম এবং পান্ডুর পরলোক যাত্রা
পান্ডবদের জন্ম এবং পান্ডুর পরলোক যাত্রা
শতশৃঙ্গের সেই বিষণ্ণ বসন্ত
সেদিন আকাশ জুড়ে ছিল ঘন অমাবস্যার ছায়া। শতশৃঙ্গ পর্বতের নির্জনতায় বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। পাণ্ডু দেখলেন, একদল মুনি-ঋষি গন্তব্যহীন এক যাত্রার জন্য তৈরি হচ্ছেন। পাণ্ডু কৌতূহলী হয়ে হাত জোড় করে শুধোলেন, "আপনাদের এই যাত্রা কোথায়?"
এক ঋষি স্মিত হাসলেন, তাতে জাগতিক কোনো চপলতা ছিল না। বললেন, "আমরা ব্রহ্মলোকের পথে চলেছি, মহারাজ।"
পাণ্ডুর মনে হলো, তাঁরও তো মুক্তি দরকার। রাজপ্রাসাদের ঐশ্বর্য ত্যাগ করে তিনি অরণ্যবাসী হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতরটা যে এখনো খাঁ খাঁ করছে। তিনি দুই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ঋষিদের পিছু নিলেন। কিন্তু পথ বড় কঠিন। ঋষিরা থামিয়ে দিলেন তাঁকে। তাঁদের কণ্ঠে ছিল রুক্ষ সত্যের সুর, "এ পথ বড় দুর্গম রাজন্! কোথাও জমাট বরফের মরুভূমি, কোথাও অপ্সরাদের চপলতা। রানীদের কোমল শরীরে এই পথ সইবে না। ফিরে যান।"
পাণ্ডুর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। তিনি ম্লান স্বরে বললেন, "ঋষিবর, নিঃসন্তান মানুষের কাছে কি কোনো লোকই অবারিত নয়? পিতৃঋণ, দেবঋণ তো মিটিয়েছি, কিন্তু বংশরক্ষা না করে মনুষ্যঋণ থেকে মুক্তি পাব কী করে? আমার কি একটাও পুত্র হবে না?"
মুনিরা জানতেন নিয়তির লিখন। তাঁরা বললেন, "আপনার কপালে দেবতুল্য সন্তানের যোগ আছে মহারাজ। আপনি নিয়োগ প্রথা প্রয়োগ করুন।"
পাণ্ডুর চোখের সামনে তখন কিন্দম ঋষির সেই ভয়াবহ অভিশাপের স্মৃতি। স্ত্রীর শরীর স্পর্শ করা মানেই মৃত্যু। সেই কাঁটা তাঁকে বিঁধছে প্রতি মুহূর্তে।
কুন্তী ও গোপন মন্ত্রের আলো
পাণ্ডু একদিন নির্জনে কুন্তীকে ডাকলেন। তাঁর কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত আর্তি। কুন্তী শুনলেন স্বামীর সেই সুদূরপ্রসারী বাসনার কথা। ঠিক সেই মুহূর্তেই কুন্তী তাঁর জীবনের সেই গোপন অধ্যায়টি মেলে ধরলেন। অনেক বছর আগে, ঋষি দুর্বাসা তাঁর সেবায় তুষ্ট হয়ে এক অমোঘ মন্ত্র দিয়েছিলেন। সেই মন্ত্রে কোনো দেবতাকে স্মরণ করলেই তিনি আসতে বাধ্য হবেন।
পাণ্ডুর চোখ জ্বলে উঠল আশার আলোয়। তিনি বললেন, "তবে ধর্মরাজকে ডাকো কুন্তী। তাঁর মতো শুদ্ধ আর কে আছে?"
জ্যৈষ্ঠের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে জন্ম নিল এক দেবকান্তি শিশু—যুধিষ্ঠির। আকাশে তখন দৈববাণী হচ্ছে, এ শিশু হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শাসক। পাণ্ডুর তৃষ্ণা মেটে না। তিনি চাইলেন শক্তি। কুন্তী স্মরণ করলেন পবনদেবকে। জন্ম নিল মহাবলশালী ভীম। জনশ্রুতি আছে, জন্মের পর কুন্তী ভয়ে তাঁকে হাত থেকে ফেলে দিয়েছিলেন এক পাথরের ওপর। পাথর চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেই শিশুর গায়ে একটা আঁচড়ও লাগেনি। ঠিক সেই দিনই হস্তিনাপুরে জন্ম নিচ্ছিল এক অন্ধকারের বীজ—দুর্যোধন।
এরপর ইন্দ্রের আশীর্বাদে জন্ম নিলেন অর্জুন। পাণ্ডু যেন তাঁর জীবনের সার্থকতা ফিরে পাচ্ছেন। শতশৃঙ্গের বন তখন কচি কিশলয় আর পাঁচ বালকের হাসিতে ভরে উঠেছে। মাদ্রীর দুখও ঘুচল কুন্তীর দয়ায়। অশ্বিনীকুমারদের আহ্বানে জন্ম নিল নকুল আর সহদেব।
বসন্তের মায়া ও বিয়োগান্তক শেষ
কিন্তু নিয়তি কি এত সহজে মুক্তি দেয়? অরণ্যে এল বসন্ত। পলাশ আর শিমুলের রঙে আকাশ যেন সিঁদুর মেখেছে। মাদ্রীকে সেদিন এক অলৌকিক সুন্দরী মনে হচ্ছিল। তাঁর শরীরের স্নিগ্ধ সুবাসে বনের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
পাণ্ডু হঠাৎ করেই হিতাহিত জ্ঞান হারালেন। দীর্ঘদিনের অবদমিত কামনার তৃষ্ণা তাঁকে গ্রাস করল। তিনি মাদ্রীর হাত ধরলেন। মাদ্রী আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠলেন, "মহারাজ, অভিশাপের কথা মনে করুন! আমায় স্পর্শ করবেন না!"
কিন্তু পাণ্ডু তখন উন্মত্ত। তাঁর কণ্ঠে তখন মরণপণ বাসনা, "এই রূপ আর এই বসন্তের সামনে মৃত্যুও তুচ্ছ মাদ্রী!"
সেই মিলনের মুহূর্তেই পাণ্ডুর শরীরটা হিম হয়ে গেল। নিথর হয়ে তিনি পড়ে রইলেন ঘাসের ওপর। কুন্তী ছুটে এলেন মাদ্রীর চিৎকারে। দেখলেন, আগলে রাখা সংসারটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।
পাণ্ডুর চিতার সামনে দাঁড়িয়ে দুই নারী তখন বিচিত্র এক প্রতিযোগিতায় নামলেন। কুন্তী বললেন, "আমিই যাব সহমরণে।" কিন্তু মাদ্রী তাঁকে রুখে দিলেন। মাদ্রীর দুচোখে তখন অপরাধবোধ আর গভীর ত্যাগ। তিনি বললেন, "দিদি, মহারাজ আমার জন্যই প্রাণ দিলেন। পরলোকে তাঁর সেবা করার অধিকার আমাকেই দাও। তুমি বেঁচে থাকো, কারণ এই পাঁচটা অনাথকে দেখার মতো তোমার চেয়ে বড় হৃদয় আর কার আছে?"
পাণ্ডুর সাথে আগুনের লেলিহান শিখায় মিশে গেলেন মাদ্রী। শতশৃঙ্গ পর্বতের সেই নির্জন অরণ্যে পড়ে রইল শুধু বসন্তের এক দীর্ঘশ্বাস আর কুন্তীর আঁচলে পাঁচজন পিতৃহীন পাণ্ডব। ভারতের ইতিহাসের এক নতুন বাঁক শুরু হলো এখান থেকেই।

Comments
Post a Comment