দ্রৌপদীর পঞ্চপতি: নিয়তির লিখন না কি জননী কুন্তীর আজ্ঞা?


দ্রৌপদীর পঞ্চপতি: নিয়তির লিখন না কি জননী কুন্তীর আজ্ঞা?

পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের রাজসভা। চারদিকে এক থমথমে নিস্তব্ধতা, অথচ বাতাসের মদিরতায় কোথাও যেন এক চাপা আনন্দের রেশ। সিংহাসনে আসীন দ্রুপদ, মনে তাঁর প্রশ্নের পাহাড়, চোখে এক আশ্চর্য প্রত্যাশা। ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে যুধিষ্ঠির—শান্ত, অবিচল, হিমালয়ের মতো স্থির।

মৃদু অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে যুধিষ্ঠির বললেন, "মহারাজ, আপনার দীর্ঘদিনের বাসনা পূর্ণ হয়েছে। বীর অর্জুনই আপনার জামাতা।"

শুনে দ্রুপদের মুখে খেলে গেল এক অদ্ভুত তৃপ্তি। বুকের ভেতর যে সংশয়ের কাঁটাটা বিঁধে ছিল, তা এক নিমেষে উধাও। মনে মনে তো তিনি এটাই জানতেন, অর্জুন ছাড়া ওই লক্ষ্যভেদের সাধ্য আর কার! যুধিষ্ঠির এরপর একে একে শোনালেন তাঁদের জীবনের সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দিনলিপি। জতুগৃহের সেই লেলিহান শিখা থেকে তাঁদের অলৌকিক মুক্তি, ছদ্মবেশে বনে বনে ঘুরে বেড়ানো, গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের সঙ্গে সাক্ষাৎ আর হস্তিনাপুর ছেড়ে আসার পর সেই অমানুষিক কৃচ্ছ্রসাধন।

দ্রুপদ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। পাণ্ডুপুত্রদের প্রতি এই ঘোর অন্যায়ের কথা শুনে তাঁর দুচোখ রাগে জ্বলে উঠল। কৌরবদের প্রতি তাঁর কোনোকালেই প্রীতি ছিল না, দুর্যোধনের হীনতা আজ তাঁর কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন, "আমি আপনাদের পাশে আছি। হস্তিনাপুরের সিংহাসন পুনরুদ্ধারে আমি আমার সর্বশক্তি নিয়োগ করব।"

পরিবেশটা একটু হালকা হতেই দ্রুপদ উৎফুল্ল হয়ে বললেন, "তাহলে মহারাজ, এবার শুভকাজটি সেরে ফেলা যাক। অর্জুনের সঙ্গে আমার কন্যার বিবাহের আয়োজন করি।"

কিন্তু যুধিষ্ঠির শান্তভাবে এক অকল্পনীয় কথা উচ্চারণ করলেন, "মহারাজ, দ্রৌপদীকে বিবাহ করব আমি।"

দ্রুপদ মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। যুধিষ্ঠির জ্যেষ্ঠ, তাঁর প্রজ্ঞা ও ধর্মবোধ সম্পর্কে দ্রুপদ জ্ঞাত। তাই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, "তাতে আমার আপত্তি নেই। আপনি পরম ধীমান এবং ধার্মিক, আপনার হাতে কন্যাকে সম্প্রদান করা সম্মানের।"

কিন্তু এরপর যুধিষ্ঠির যা বললেন, তাতে সারা সভা স্তব্ধ হয়ে গেল। "আমার পর আমার বাকি চার ভ্রাতাও একে একে তাঁকে পত্নী হিসেবে গ্রহণ করবে।"

দ্রুপদ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। ব্যাকুল হয়ে বললেন, "এ কী কথা ধর্মরাজ! এ তো লোকচারের বিরুদ্ধে। এক পুরুষের বহু পত্নী থাকতে পারে, কিন্তু এক নারী কীভাবে পাঁচ স্বামীর ঘর করবেন? এ তো অধর্ম!"

যুধিষ্ঠির টললেন না। তাঁর কণ্ঠে সেই একই প্রশান্তি, "মহারাজ, আমি কোনোদিন ধর্মের পথ ত্যাগ করিনি। যা বলছি, তা শাস্ত্রবিরুদ্ধ নয়। উপরন্তু, এ আমাদের মাতৃআজ্ঞা। মাতা কুন্তী আমাদের আদেশ দিয়েছেন লক্ষ্য করে আনা বস্তু সমান ভাগে ভাগ করে নিতে। জননীর আজ্ঞা পালন করা যে কোনো সন্তানের কাছে পরম ধর্ম।"

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ধৃষ্টদ্যুম্নও এই প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ হলেন। এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের সৃষ্টি হলো সেই রাজসভায়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় দ্রুপদ বললেন, "আজকের মতো আলোচনা থাক। কাল সকালে ভেবে দেখা যাবে।"

রাত্রির অন্ধকার কাটতে না কাটতেই পাঞ্চালপুরীতে উপস্থিত হলেন মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব। সব শুনে তিনিও প্রথমে অবাক হলেন, "এমন বিবাহ তো আর্যসমাজে কখনো দেখা যায়নি।"

যুধিষ্ঠির এবারও অবিচল। সত্য আর কর্তব্যের আদর্শে তিনি অনড়। জননীর আজ্ঞা তাঁর কাছে শিরোধার্য। ব্যাসদেব কিছুক্ষণ চক্ষু বুজে ধ্যানমগ্ন হলেন, তারপর দ্রুপদকে অন্তরালে ডেকে নিয়ে গিয়ে এক গূঢ় রহস্য উন্মোচন করলেন।

ব্যাসদেব বললেন, "মহারাজ, দ্রৌপদী পূর্বজন্মে ছিলেন এক ঋষিকন্যা। অসামান্য রূপবতী হয়েও তিনি যোগ্য বর পাননি। ব্যাকুল হয়ে মহাদেবের আরাধনা করেছিলেন। ভোলানাথ যখন বর দিতে এলেন, তখন এই কন্যা অস্থির হয়ে পাঁচবার প্রার্থনা করেছিলেন—'আমি পতি চাই'। শিব হাসলেন, বললেন—'তথাস্তু, পরজন্মে তুমি পাঁচজন পতি লাভ করবে'।"

দ্রুপদ বিস্মিত। ব্যাসদেব ধীরলয়ে যোগ করলেন, "কন্যাটি পরে একটির বদলে পাঁচটি বর প্রার্থনা করেছিলেন বলে লজ্জিত হয়েছিলেন, কিন্তু দেবাদিদেবের বর তো বিফলে যাওয়ার নয়। এটি দৈবনির্দিষ্ট। মানুষের সাধ্য নেই নিয়তিকে খণ্ডন করার।"

সব শুনে দ্রুপদের সমস্ত সংশয় ধুয়ে মুছে গেল। তিনি সশ্রদ্ধচিত্তে বললেন, "আমি এই সত্য জানতাম না বলেই যুধিষ্ঠিরের বিরোধিতা করেছিলাম। এখন সব পরিষ্কার। কন্যা আমার নিয়তির এক অমোঘ খেলায় মহীয়সী হতে চলেছে।"

অবশেষে রাজকীয় সমারোহে বিবাহের লগ্ন স্থির হলো। পাঞ্চালীর ভবিতব্য যে পাঁচ পাণ্ডবের অর্ধাঙ্গিনী হওয়া, তা যেন এক অলৌকিক নির্দেশে সত্য হয়ে উঠল। যা একসময় অধর্ম বলে মনে হয়েছিল, নিয়তির অমোঘ টানে তা-ই ধর্মের পরম ভাষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র