একচক্রা ও বকাসুর দহন
একচক্রা ও বকাসুর দহন
অন্ধকার অরণ্য আর অনিশ্চয়তার পথ পেরিয়ে কুন্তী ও তাঁর পাঁচ পুত্র এসে আশ্রয় নিয়েছেন একচক্রা নামের এক শান্ত জনপদে। পরিচয় গোপন রাখার দায় বড় দায়। তাই রাজকীয় তেজ লুকিয়ে পাণ্ডবরা এখন ছদ্মবেশী ব্রাহ্মণ। পরনে সাধারণ বাস, হাতে ভিক্ষাপাত্র। একচক্রার কোনো এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের কুটিরে দিন কাটে তাঁদের। দিনের শেষে যা সামান্য ভিক্ষা জোটে, মা কুন্তীর হাতের ছোঁয়ায় তাই অমৃত হয়ে ওঠে পাঁচ ভাইয়ের পাতে।
কিন্তু সেদিনের শান্ত দুপুরটা হঠাৎই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এক বুকফাটা কান্নায়।
সেদিন অর্জুন, যুধিষ্ঠিররা ঘরে ছিলেন না। দাওয়ায় একা বসে ছিলেন ভীম আর কুন্তী। হঠাৎ কুটিরের ভেতর থেকে ভেসে এল এক আর্তনাদ—সে কেবল সাধারণ দুঃখের বিলাপ নয়, এ যেন আসন্ন মৃত্যুর পদধ্বনি। গৃহস্বামী ব্রাহ্মণের ঘর থেকে উঠে আসছে এক হাহাকার।
ভীম উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর বিশাল শরীরের পেশিগুলো একবার কেঁপে উঠল। মা-র দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন, “মা, এই বিপন্ন মানুষগুলোর আশ্রয়ে আমরা পরম নিশ্চিন্তে আছি। আজ যখন এঁদের ঘরে শোকের আগুন জ্বলছে, তখন আমাদের চুপ করে থাকাটা কি ধর্ম? তুমি একবার ভেতরে যাও না, দেখো তো কী হয়েছে।”
কুন্তী ভেতরে গিয়ে দেখলেন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ব্রাহ্মণ, তাঁর স্ত্রী আর ছোট ছোট সন্তানরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছেন। কুন্তী শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে আপনাদের? এই কান্নার কারণ কী?”
প্রথমে বলতে চাননি ব্রাহ্মণ। কিন্তু কুন্তীর স্নিগ্ধ আশ্বাসে বুক হালকা করলেন তিনি। শোনালেন সেই ভয়ংকর বকাসুরের কথা। নগরের কাছেই এক গুহায় বাস করে সেই দানব। একচক্রার মানুষের ওপর সে চাপিয়ে দিয়েছে এক নৃশংস শর্ত। প্রতিদিন পালা করে এক-একটি পরিবারকে পাঠাতে হয় এক গাড়ি অন্ন, দুটি মহিষ আর একজন জলজ্যান্ত মানুষ। বকাসুর শুধু সেই খাবার খায় না, গ্রাস করে বাহক মানুষটিকেও। আর কেউ যদি তা দিতে অস্বীকার করে, তবে গোটা গ্রাম উজাড় করে দেয় সে।
আজ সেই পালা পড়েছে এই দরিদ্র ব্রাহ্মণের। সম্বল বলতে তো কেউ নেই। হয় নিজেকে যেতে হবে, নয়তো স্ত্রী বা সন্তানদের কাউকে যমের মুখে ঠেলে দিতে হবে। ত্যাগের এই করুণ প্রতিযোগিতায় পরিবারটি আজ দিশেহারা।
সব শুনে কুন্তী এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইলেন। তারপর ম্লান হেসে বললেন, “আপনারা আর কাঁদবেন না। আমার পাঁচ ছেলে। তার মধ্যে ভীম অত্যন্ত শক্তিশালী। আজ আপনাদের বদলে আমার ছেলেই যাবে সেই রাক্ষসের অন্ন নিয়ে।”
ব্রাহ্মণ আঁতকে উঠলেন, “সে কী কথা! আপনি আমাদের অতিথি। অতিথির সন্তানকে যমালয়ে পাঠিয়ে আমি কি ব্রহ্মহত্যাকারী হব? না না, তা হতে পারে না।”
কুন্তী ধীরস্বরে বললেন, “ভয় পাবেন না। ভীমের ক্ষমতা সাধারণ মানুষের অতীত। বকাসুর ওর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। ও ঠিক ফিরে আসবে।”
ভীম সব শুনে শুধু একটু হাসলেন। যুদ্ধের নাম শুনলে যাঁর রক্ত নেচে ওঠে, তাঁর কাছে এ তো এক রোমাঞ্চকর আহ্বান। পরদিন সকালেই তিনি খাবারের গাড়ি নিয়ে রওনা হলেন বকাসুরের ডেরার দিকে।
কিন্তু ভীমের কাণ্ড দেখে কে বলবে তিনি মৃত্যুর দিকে যাচ্ছেন! বনের নিস্তব্ধতা চিরে গাড়ির চাকা ঘুরছে, আর ভীম মহানন্দে বকাসুরের জন্য বরাদ্দ অন্ন নিজেই সাবাড় করতে শুরু করেছেন। যেন কোনো রাজকীয় ভোজের নিমন্ত্রণ পেয়েছেন তিনি।
গুহার সামনে যখন গাড়ি পৌঁছাল, তখন আধেক খাবারই শেষ। বকাসুর বেরিয়ে এসে এই ধৃষ্টতা দেখে ক্রোধে উন্মাদ হয়ে গেল। অট্টহাসি আর হুঙ্কারে কেঁপে উঠল বনভূমি। সে ঝাঁপিয়ে পড়ল ভীমের ওপর।
শুরু হলো এক মহাপ্রলয়ংকারী যুদ্ধ। একদিকে আসুরিক শক্তি, অন্যদিকে অমিতবিক্রমী বীর। মাটি কাঁপছে, বনস্পতিরা উপড়ে পড়ছে। কিন্তু ভীমের কাছে বকাসুর যেন খেলনা মাত্র। কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর ভীম সেই দানবকে জাপ্টে ধরলেন, তারপর তাঁর সেই বজ্রকঠিন বাহুপাশে পিষে ফেললেন বকাসুরের মেরুদণ্ড। এক ভয়াবহ আর্তনাদ করে বকাসুর নিথর হয়ে গেল।
শান্ত বিকেলে ভীম সেই মৃত রাক্ষসের দেহটা হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে এলেন নগরের তোরণে। তারপর রক্তমাখা হাতেই নিঃশব্দে ফিরে এলেন কুটিরে।
একচক্রার মানুষ সকালে উঠে দেখল তাদের দীর্ঘদিনের আতঙ্কের শেষ হয়েছে। খুশির জোয়ার নামল শহরজুড়ে। কিন্তু যিনি এই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন, সেই ছদ্মবেশী ব্রাহ্মণ যুবকটি ততক্ষণে আবার তাঁর সাধারণ জীবনে মিশে গেছেন। পাণ্ডবরা আবার ভিক্ষাপাত্র হাতে পথে বেরোলেন। বীরত্বের কোনো আস্ফালন নেই, শুধু কর্তব্যের এক প্রশান্ত তৃপ্তি নিয়ে তাঁরা আবার অন্তরালে থেকে গেলেন।
মানুষের দুঃখ মোচনের চেয়ে বড় ধর্ম আর কী আছে! বনবাসের এই কন্টকাকীর্ণ পথেও পাণ্ডবরা এভাবেই হয়ে উঠলেন আর্তের ত্রাণকর্তা।

Comments
Post a Comment