অনন্তের প্রতীক্ষা: শেষনাগ

 


অনন্তের প্রতীক্ষা: শেষনাগ

 কশ্যপ মুনির দুই স্ত্রী, অথচ রেষারেষিটা ছিল একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে। উচ্চৈঃশ্রবা ঘোড়ার লেজ কালো না সাদা—এই নিয়ে বাজি ধরলেন কদ্রু। জেতার জন্য নিজের হাজার ছেলেকে হুকুম দিলেন ঘোড়ার লেজে গিয়ে সেঁটে থাকতে, যাতে সাদা লেজ কালো দেখায়। ছলনা। কিন্তু সব ছেলে সেই অন্যায়ে সায় দিল না। কদ্রু রেগে আগুন হয়ে নিজের গর্ভজাত সন্তানদেরই অভিশাপ দিলেন— "তোরা জনমেজয়ের সর্পসত্রে ভস্ম হয়ে যাবি।"

সেই হাজার সর্পসন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন শেষ। কিন্তু এই শেষের মনের গঠন ছিল অন্যরকম। তাঁর ভাইরা ছিল কুটিল, ক্রূর। বিনতা আর গরুড়ের ওপর তারা যে অকথ্য অত্যাচার চালাত, তা শেষের সহ্য হতো না। তিনি দেখলেন, তাঁর ভাইরা অন্যের যন্ত্রণায় উল্লাস পায়। একই রক্ত, একই হাজার ফণা— অথচ শেষের ভেতরে বিষের বদলে দানা বাঁধছিল এক গভীর বিতৃষ্ণা।

একদিন তিনি কারোর সাথে কোনো ঝগড়া করলেন না, কোনো দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন না। শুধু নিঃশব্দে ঘর ছাড়লেন।

কঠোর তপস্যা ও ব্রহ্মার আগমন

গন্তব্য ছিল নির্জনতা। গন্ধমাদন, বদরিকাশ্রম, গোকর্ণ— যেখানে বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কোনো কোলাহল নেই। শেষনাগ সেখানে গিয়ে একাগ্র মনে ধ্যানে বসলেন। খাওয়া বলতে প্রথমে ছিল শুকনো পাতা, তারপর শুধু জল, আর শেষে তাও বন্ধ। এক কুন্ডলী পাকিয়ে পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে রইলেন তিনি বহু বছর। চারপাশের অরণ্য বদলে গেল, ঋতুরা এল-গেল, কিন্তু শেষের ধ্যান ভাঙল না।

স্বর্গের দেবতাদের চোখে এই দৃশ্য ধরা পড়ল। তাঁরা অবাক হয়ে ভাবলেন, এই সাপটি চায় কী? ওর শরীর থেকে তো কোনো বিষাক্ত উত্তাপ বেরোচ্ছে না, বরং আগুনের শিখার মতো এক পবিত্র জ্যোতি বেরোচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মা স্বয়ং নেমে এলেন।

"বলো শেষ, তোমার মনের ইচ্ছা কী?" ব্রহ্মা মৃদু স্বরে প্রশ্ন করলেন। "কেন নিজেকে এভাবে তিলে তিলে ক্ষয় করছ?"

শেষনাগ চোখ মেললেন। তাঁর কণ্ঠে কোনো দম্ভ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত ক্লান্তি। তিনি বললেন, "প্রভু, আমি শুধু আমার ভাইদের থেকে দূরে থাকতে চাই। ওই পাপ আর কুটিলতা আমি আর নিতে পারছি না। আমাকে শুধু এইটুকু শক্তি দিন, যাতে জন্ম-জন্মান্তরে আমি ধর্মের পথে স্থির থাকতে পারি। আমার আর কিচ্ছু চাই না।"

ব্রহ্মা অনেক বর দিয়েছেন জীবনে— অমরত্ব, রাজত্ব, শত্রুবিনাশ। কিন্তু 'ভালো মানুষ' হয়ে থাকার বর চাওয়ার মতো প্রাণী পৃথিবীতে বিরল। ব্রহ্মা হাসলেন।

পৃথিবীর ভার

ব্রহ্মা বললেন, "তোমার এই স্থিরতাই আসলে ব্রহ্মাণ্ডের প্রয়োজন। দেখো শেষ, এই ধরিত্রী বড় চঞ্চল। পাহাড় নড়ছে, সমুদ্র টালমাটাল হচ্ছে। পৃথিবীকে ধরে রাখার মতো একটা ধ্রুব আধার প্রয়োজন। কোনো পাহাড় বা কোনো দেবতা এই অবিচল ধৈর্যের ভার সইতে পারবে না। একমাত্র তুমিই পারবে, কারণ তুমি নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে জয় করেছ।"

ব্রহ্মা নির্দেশ দিলেন, "তুমি পাতালে যাও। মা ধরিত্রীকে নিজের ফণার ওপর তুলে ধরো। তোমাকে হতে হবে পৃথিবীর স্তম্ভ।"

শেষ কোনো প্রশ্ন করলেন না। কোনো বিনিময় চাইলেন না। তিনি মাটির গভীরে প্রবেশ করলেন— অন্ধকার আর উত্তাপ ভেদ করে চলে গেলেন সৃষ্টির একেবারে শেষ প্রান্তে। সেখানে নিজের সহস্র ফণা বিস্তার করে তিনি পৃথিবীকে ধারণ করলেন।

মুহূর্তে পৃথিবীর কম্পন থেমে গেল। মানুষের ঘরবাড়ি, হিমালয়ের চূড়া, শিশুদের কলহাস্য আর মায়েদের দীর্ঘশ্বাস— সব কিছুর নিচে এক নিবিড় শান্তিতে স্থির হয়ে রইলেন শেষ।

বিষ্ণুর শয্যা এবং শেষের পুনর্জন্ম

পরে বিষ্ণু যখন দেখলেন এই নিঃস্বার্থ ত্যাগ, তখন তিনিও মুগ্ধ হলেন। দুই মহৎ সত্তার মধ্যে এক অদ্ভুত মিতালি তৈরি হলো। বিষ্ণু ঠিক করলেন, তিনি শেষের এই কুন্ডলীর ওপরেই বিশ্রাম নেবেন। ক্ষীরসমুদ্রে অনন্তনাগের শয্যায় শায়িত বিষ্ণুর যে মূর্তি আমরা দেখি, তা আসলে দুই সহিষ্ণু হৃদয়ের মিলন।

মহাভারতের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, এই শেষনাগই যুগে যুগে বারবার এসেছেন। রামায়ণে তিনি ছিলেন লক্ষ্মণ, মহাভারতে কৃষ্ণের অগ্রজ বলরাম। তিনি সবসময় ছায়ার মতো পাশে থাকেন, মূল কাণ্ডারি হয়েও নিজে পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে চান না। পৃথিবী যাঁকে মনে রাখেনি, অথচ যাঁর কাঁধে ভর করে পৃথিবী টিকে আছে— সেই তো আসল নায়ক।

শেষনাগ আজও আছেন। মাটির অনেক নিচে, কোনো অভিযোগ ছাড়াই তিনি সহ্য করে যাচ্ছেন পৃথিবীর সমস্ত ভার। পৃথিবী শান্ত আছে, কারণ কেউ একজন তলায় দাঁড়িয়ে অবিরাম ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। নিঃশব্দে।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতী ও ব্যাসদেব

"পতন একদিনে হয় না, উত্থানও একদিনে হয় না — কিন্তু সেই একটা মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সব ঠিক করে দেয়।"

পাণ্ডব-কথা: এক অলৌকিক জন্ম ও এক বসন্তের দীর্ঘশ্বাস