যযাতির হাজার বছর: অন্তহীন তৃষ্ণা ও শেষ মুহূর্তের স্তব্ধতা


যযাতির হাজার বছর: অন্তহীন তৃষ্ণা ও শেষ মুহূর্তের স্তব্ধতা

যা চেয়েছিলেন, তাই পেলেন

পৃথিবীতে এক ধরণের অদ্ভুত স্বাধীনতা আছে, যা কেবল তখনই আসে যখন মানুষ যা চায় ঠিক তাই পায়। কিন্তু পাওয়ার পর সেই প্রাপ্তি তাকে তৃপ্ত করল কি না, সেটা সম্পূর্ণ আলাদা এক তর্কের বিষয়। রাজা যযাতি তাঁর হারিয়ে যাওয়া যৌবন ফিরে পেতে চেয়েছিলেন। পেয়েওছিলেন। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র পুরু কোনো শর্ত ছাড়াই, হাসিমুখে নিজের যৌবন দান করেছিল পিতাকে। শুক্রাচার্যের সেই অদ্ভুত বরদানে যযাতির সামনে তখন হাজার বছরের এক দীর্ঘ, উজ্জ্বল পথ। রাজা আবারও এক টগবগে তরুণের শরীর নিয়ে ফিরে এলেন সংসারে। শুরু হলো এক দীর্ঘ যাত্রা।

এক আদর্শ (?) রাজা

যযাতির চরিত্রে অনেক দুর্বলতা ছিল ঠিকই, কিন্তু তিনি অকৃতজ্ঞ বা নিষ্ঠুর ছিলেন না। এই হাজার বছর তিনি কেবল ভোগবিলাসে কাটিয়ে দেননি। তিনি ছিলেন এক প্রজাবৎসল শাসক। তাঁর রাজ্যে কেউ অভুক্ত থাকত না। অপরাধীর শাস্তি আর যোগ্যর সম্মান—এই দুইয়ের ভারসাম্য তিনি বজায় রেখেছিলেন নিখুঁতভাবে। যজ্ঞ করেছেন নিয়ম মেনে, অতিথিসেবা করেছেন পরম শ্রদ্ধায়। প্রজারা সুখে ছিল, রাজ্য ছিল সমৃদ্ধ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, যযাতির মতো সার্থক জীবন আর কারোর নেই।

কিন্তু মানুষের মনের গহীন অন্দরে যে চোরাবালি থাকে, তার খবর কে রাখে?

আগুনের শিখা আর ঘিয়ের পাত্র

হাজার বছরের সেই দীর্ঘ আয়ু যখন ফুরিয়ে আসছে, যযাতি একদিন স্তব্ধ হয়ে নিজের মুখোমুখি বসলেন। তিনি এক ভয়ানক সত্য আবিষ্কার করলেন। শরীরের যৌবন অটুট থাকলেও মনের কামনা একটুও কমেনি। বরং এই হাজার বছরের ভোগে সেই লালসা আরও বেড়েছে।

যযাতি উপলব্ধি করলেন, মানুষের বাসনা হলো আগুনের মতো। আগুনে যত ঘি ঢালা হয়, আগুন তত প্রবল হয়ে জ্বলে ওঠে। ঘি ঢেলে আগুন নেভানো যায় না। হাজার বছর ধরে তিনি কামনার আগুনে ঘি ঢেলে গেছেন, ভেবেছিলেন একদিন হয়তো তৃপ্তি আসবে। কিন্তু তৃপ্তি আসেনি, এসেছে আরও বড় এক ক্ষুধার বোধ। তিনি দেখলেন, সমাজের সম্পদশালী মানুষেরা আরও সম্পদ চায়, ক্ষমতাশালীরা চায় আরও প্রতিপত্তি। বার্ধক্য এলেও তাদের কামনার মুঠো আলগা হয় না। যযাতি নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা ভেবেছিলেন, কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলেন—তিনিও সেই একই তৃষ্ণার্ত শিকারে পরিণত হয়েছেন।

এটি শরীরের রোগ নয়, এ হলো আত্মার অসুখ। যযাতি বুঝলেন, যে মানুষ পাওয়ার নেশায় অন্ধ, সে আসলে মুক্ত নয়; সে এক সোনার খাঁচার বন্দি। প্রকৃত সুখ পাওয়ার মধ্যে নেই, আছে ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে।

যা ধার করা, তা ফিরিয়ে দেওয়া

যযাতি গেলেন পুত্র পুরুর কাছে। পুরু এই দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন জরাগ্রস্ত বৃদ্ধের শরীরে, অথচ এই সময়টা তাঁরই যৌবন উপভোগ করার কথা ছিল। কিন্তু তাঁর কোনো ক্ষোভ ছিল না। যযাতি পুত্রের সামনে দাঁড়িয়ে অপরাধবোধ নয়, বরং এক গভীর সত্যের উচ্চারণ করলেন।

তিনি বললেন, "বৎস পুরু, তোমার যৌবন তুমি ফিরে নাও। আমি আমার হাজার বছর দেখে নিয়েছি। বুঝেছি, ভোগের কোনো শেষ নেই।"

পুরু ফিরে পেলেন তাঁর হারানো তারুণ্য। আর যযাতির শরীরে ফিরে এল সময়ের জরা। কিন্তু এবারের এই বার্ধক্য যযাতির কাছে অভিশাপ মনে হলো না; মনে হলো এক পরম শান্তি। তিনি যেন বহু বছর পর নিজের আসল পরিচয়ে ফিরে এলেন।

রাজসভার বিতর্ক ও উত্তরসূরি

যযাতি যখন ঘোষণা করলেন যে কনিষ্ঠ পুত্র পুরুই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবে, তখন রাজসভায় গুঞ্জন উঠল। জ্যেষ্ঠ পুত্রদের বাদ দিয়ে কনিষ্ঠকে রাজা করা শাস্ত্রবিরোধী। ব্রাহ্মণ এবং মন্ত্রীরা এর কারণ জানতে চাইলেন।

যযাতি শান্ত গলায় বললেন তাঁর পাঁচ পুত্রের কথা। তিনি বিপদের দিনে সবার কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন, কিন্তু বড় চার ছেলে—যদু, তুর্বসু, দ্রুহ্যু এবং অনু—তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। তারা পিতাকে নয়, নিজের সুখকেই বড় করে দেখেছিল। অন্যদিকে পুরু একটি বারও না ভেবে নিজের সর্বস্ব দান করেছিল। যযাতি প্রশ্ন করলেন, "যে পুত্র পিতার বিপদে পাশে দাঁড়ায় না, সে কি প্রজাদের রক্ষা করতে পারবে? না কি যে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করতে জানে, সে রাজা হওয়ার যোগ্য?"

রাজসভা নীরব হয়ে গেল। যযাতির যুক্তি ছিল অকাট্য। পুরু অভিষিক্ত হলেন রাজা হিসেবে।

অভিশাপ ও ইতিহাসের গতিপথ

যযাতির অন্য পুত্রদের তিনি যে অভিশাপ দিয়েছিলেন, ইতিহাস তা ভুলল না। মহাভারতের নিয়মই তাই—এখানে নিক্ষিপ্ত কোনো শব্দই বৃথা যায় না।

 যদু- থেকে এল যদুবংশ, যাদের নিজস্ব কোনো স্থায়ী রাজ্য রইল না। এই বংশেই বহু বছর পর জন্ম নেবেন কৃষ্ণ—যিনি রাজা না হয়েও হবেন রাজচক্রবর্তী।

আর পুরু- থেকে এল পৌরব বংশ, যা পরে কুরু বংশে রূপান্তরিত হবে। এই বংশেরই দুই শাখা পাণ্ডব ও কৌরবদের নিয়ে রচিত হবে কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ।

পুরু, যে একদা 'হ্যাঁ' বলেছিল, তাঁর সেই সম্মতির ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে সমগ্র মহাভারতের মহাকাব্যিক কাঠামো।

অরণ্যের পথে

রাজ্যভার অর্পণ করে যযাতি রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করলেন। অলঙ্কার, দাসদাসী, বিলাসিতা—সব পেছনে ফেলে তিনি পা বাড়ালেন অরণ্যের দিকে। এটি কোনো পরাজয় নয়, এটি ছিল 'বানপ্রস্থ'। জীবনের তৃতীয় অধ্যায়, যেখানে মানুষ বাইরের জগত থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিজের ভেতরে তাকাতে শেখে।

অরণ্যে যযাতি কন্দমূল খেয়ে কাটালেন, কৃচ্ছ্রসাধন করলেন। যে শরীর একসময় হাজার বছর ধরে আনন্দ খুঁজেছিল, সেই শরীরকেই তিনি ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিত করলেন। অবশেষে একদিন তিনি সেই নশ্বর দেহ ত্যাগ করে স্বর্গের পথে যাত্রা করলেন।

শেষ কথা

যযাতির গল্প আমাদের শেখায় যে, যা আমরা চাই আর যা আমাদের শান্তি দেয়—এই দুয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। তিনি সব পেয়েছিলেন, কিন্তু শান্তি পাননি। শান্তি পেলেন তখন, যখন তিনি চাওয়া বন্ধ করলেন।

মহাভারত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মৃত্যু বা বার্ধক্য কোনো পরাজয় নয়। প্রকৃত পরাজয় হলো অন্তহীন কামনার দাস হয়ে বেঁচে থাকা। যযাতি অনেক দেরিতে বুঝেছিলেন, কিন্তু বুঝেছিলেন ঠিকই। আর সেই বোধটুকুই তাঁকে ইতিহাসের এক সাধারণ রাজা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে এক চিরন্তন প্রতীকে পরিণত করেছে।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:

WhatsApp করুন


Comments

  1. এখানে একটি বিশেষ লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, কৌরব এবং পাণ্ডব বংশের ধমনীতে অসুর বা দানব রক্ত প্রবাহিত ছিল। কারণ পুরুর মা ছিলেন শর্মিষ্ঠা, যিনি ছিলেন দানবরাজ বৃষপর্বার কন্যা।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

সত্যবতী ও ব্যাসদেব

রাজা যযাতির পতন ও মুক্তি

"পতন একদিনে হয় না, উত্থানও একদিনে হয় না — কিন্তু সেই একটা মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সব ঠিক করে দেয়।"