দেবব্রতর মহান ত্যাগ ও ভীষ্মের জন্ম মহারাজ শান্তনুর সাথে সত্যবতীর বিবাহ
দেবব্রতর মহান ত্যাগ ও ভীষ্মের জন্ম মহারাজ শান্তনুর সাথে সত্যবতীর বিবাহ
হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে তখন উৎসবের আমেজ। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পুত্র দেবব্রতকে ফিরে পেয়েছেন মহারাজ শান্তনু। গঙ্গার কোল থেকে ফিরে আসা এই তরুণ শুধু রূপবান নয়, অসামান্য বীর এবং প্রজ্ঞাবান। শান্তনু নিশ্চিন্ত মনে তাঁকে যুবরাজ ঘোষণা করলেন। প্রজারাও খুশি, কারণ দেবব্রতর দুচোখে আগামীর এক উজ্জ্বল ন্যায়পরায়ণ রাজার স্বপ্ন দেখা যায়। কিন্তু নিয়তি বোধহয় অলক্ষ্যে হাসছিল। শান্তনুর জীবনে প্রশান্তি দীর্ঘস্থায়ী হলো না।
যমুনাতীরের সেই মায়াবী সুগন্ধ
একদিন মৃগয়ায় গিয়ে শান্তনু যমুনার তীরে এক অলৌকিক সুগন্ধ পেলেন। ফুলের নয়, চন্দনের নয়—এ এক অচেনা মাদকতাময় ঘ্রাণ। সেই সুগন্ধ অনুসরণ করে এগোতেই তিনি দেখলেন এক পরমাসুন্দরী কন্যাকে। নাম তার সত্যবতী। মাছের পেট থেকে জন্ম নেওয়া এই কন্যার রূপ যেন বনভূমিকে আলো করে রেখেছে। ধীবররাজ দাসরাজার পালিতা কন্যা সে। শান্তনু প্রথম দর্শনেই তাঁর প্রেমে পড়লেন। স্থির করলেন, এই সত্যবতীকেই তিনি মহিষী করে প্রাসাদে নিয়ে যাবেন।
কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালেন সত্যবতীর পিতা। দাসরাজ বিনীতভাবে কিন্তু অত্যন্ত কঠিন এক শর্ত রাখলেন রাজার সামনে:
"মহারাজ, আমার কন্যাকে আপনার হাতে তুলে দিতে আপত্তি নেই। কিন্তু একটি কথা দিতে হবে—সত্যবতীর গর্ভজাত সন্তানই হবে হস্তিনাপুরের পরবর্তী রাজা। দেবব্রত নয়।"
শান্তনু থমকে গেলেন। নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় পুত্র দেবব্রতকে সিংহাসন থেকে বঞ্চিত করবেন? এ অন্যায় তিনি সইতে পারলেন না। কোনো কথা না বলে, একরাশ বিষণ্ণতা বুকে নিয়ে তিনি প্রাসাদে ফিরে এলেন।
পুত্রের সংকল্প ও সেই ভয়ঙ্কর শপথ
শান্তনু দিন দিন শুকিয়ে যেতে লাগলেন। আহার নেই, নিদ্রা নেই—এক অদ্ভুত শূন্যতা তাঁকে গ্রাস করল। পিতার এই দহন দেবব্রতর নজর এড়াল না। তিনি মন্ত্রীদের কাছ থেকে সব কথা শুনলেন। জানলেন, তাঁর রাজমুকুটই আজ পিতার সুখের পথে প্রধান অন্তরায়। দেবব্রত এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সোজা চলে গেলেন ধীবররাজ দাসের কাছে।
তিনি শান্ত গলায় বললেন, "আপনার শর্ত আমি মেনে নিচ্ছি। সত্যবতীর সন্তানই রাজা হবে।"
কিন্তু ধীবররাজ চতুর মানুষ। তিনি সংশয় প্রকাশ করে বললেন, "রাজকুমার, আপনি ধার্মিক, কথা রাখবেন। কিন্তু আপনার সন্তানরা যদি ভবিষ্যতে আমার দৌহিত্রদের সিংহাসন থেকে সরিয়ে দেয়? তবে তো রক্তপাত অবধারিত।"
সেই মুহূর্তে দেবব্রতর মুখাবয়ব এক অলৌকিক দৃপ্ততায় ভরে উঠল। পিতার সুখের জন্য তিনি এমন এক প্রতিজ্ঞা করলেন যা সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন:
"আমি আজন্ম অবিবাহিত থাকব। আজ থেকে আমি ব্রহ্মচর্য পালন করব। আমার কোনো সন্তান হবে না, সুতরাং উত্তরাধিকার নিয়ে কোনো বিরোধও থাকবে না।"
ভীষ্মের জন্ম ও পিতার বরদান
স্তব্ধ হয়ে গেল প্রকৃতি। আকাশ থেকে দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করলেন আর চারদিকে একটি শব্দই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল— 'ভীষ্ম'! 'ভীষ্ম'! অর্থাৎ, যিনি ভয়ঙ্কর প্রতিজ্ঞা পালন করেন। দেবব্রত সেই মুহূর্ত থেকে ইতিহাসে 'ভীষ্ম' নামে পরিচিত হলেন।
ভীষ্ম পরম শ্রদ্ধায় সত্যবতীকে রথে তুলে হস্তিনাপুরে নিয়ে এলেন। পিতার বিবাহ সুসম্পন্ন হলো। পুত্রের এই অবিশ্বাস্য ত্যাগে শান্তনু যেমন অভিভূত হলেন, তেমনই তাঁর বুক ফেটে কান্না এল। তিনি স্নেহাচ্ছলে দেবব্রতর মাথায় হাত রেখে বললেন:
"হে আমার নিষ্পাপ পুত্র, তুমি যা করলে তা মানুষ পারে না। আমি তোমাকে বর দিচ্ছি—তোমার ইচ্ছা না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যু তোমাকে স্পর্শ করবে না। তুমি হবে স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকারী।"
এভাবেই শুরু হলো এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি। দেবব্রত থেকে ভীষ্ম হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে শান্তনু ফিরে পেলেন তাঁর সুখ, কিন্তু হস্তিনাপুরের ইতিহাসে লেখা হয়ে গেল এক নিঃসঙ্গ মহাজীবনের উপাখ্যান।

Comments
Post a Comment