কণিকের নীতি ও ধূর্ত শৃগালের উপাখ্যান: ক্ষমতার অন্ধকার খেলা

 


কণিকের নীতি ও ধূর্ত শৃগালের উপাখ্যান: ক্ষমতার অন্ধকার খেলা

দ্রুপদ দমনের ঠিক এক বছর পরের কথা। হস্তিনাপুরের সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে যখন চাপা গুঞ্জন চারদিকে, ঠিক তখনই ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে যুবরাজ হিসেবে অভিষিক্ত করলেন। যুধিষ্ঠির—যার চরিত্রে ছিল অদ্ভুত এক স্থৈর্য। তিনি বিনীত, বুদ্ধিদীপ্ত এবং অজাতশত্রু। প্রজারা তাকে ভালোবেসে ফেলল নিজের পিতার চেয়েও বেশি। কিন্তু এই ভালোবাসাই যেন ধৃতরাষ্ট্রের মনে বিষাদ আর ঈর্ষার কালো মেঘ হয়ে ঘনিয়ে এল।

পাণ্ডবরা তখন একেকজন অপরাজেয় বীর। ভীম বলরামের কাছে গদাযুদ্ধ আর রথচালনা শিখে ফিরেছেন মদমত্ত হাতির তেজ নিয়ে। অর্জুন হয়ে উঠেছেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ধনুর্ধর। একদিন দ্রোণাচার্য অর্জুনকে ডেকে বললেন, "বৎস, আমি ঋষি অগস্ত্যের শিষ্য অগ্নিবেশের কাছ থেকে ব্রহ্মশির অস্ত্র লাভ করেছিলাম। তা তোমাকে দিয়ে দিয়েছি । তবে মনে রেখো, গুরুর দক্ষিণাস্বরূপ আজ তোমাকে কথা দিতে হবে—প্রয়োজনে আমার বিরুদ্ধেও অস্ত্র ধরতে দ্বিধা করবে না।" অর্জুন বিনত মস্তকে গুরুর চরণ স্পর্শ করলেন। সহদেব বৃহস্পতির কাছে শিখলেন নীতিশাস্ত্র, আর নকুল হয়ে উঠলেন ক্ষিপ্র এক যোদ্ধা।

এমনকি রাজা পাণ্ডুও যাকে পরাজিত করতে পারেননি, সেই সৌবীররাজ দত্তামিত্রকে অর্জুন একাই ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন। পূর্ব আর দক্ষিণ দিগ্বিজয় করে ভীম আর অর্জুন যখন হস্তিনাপুরে রত্ন সম্ভার নিয়ে ফিরলেন, তখন সেই যশের ছটায় ধৃতরাষ্ট্রের চোখ যেন অন্ধ হয়ে এল। ঈর্ষায় জ্বলতে জ্বলতে তিনি ডাকলেন তার প্রধান কুটিল মন্ত্রী কণিককে।

ধৃতরাষ্ট্রের স্বরে ছিল এক অস্থির আর্তি, "কণিক, পাণ্ডবদের এই ঐশ্বর্য আর খ্যাতি আমাকে শান্তিতে ঘুমোতে দিচ্ছে না। তুমিই বলো, আমি কি ওদের সাথে যুদ্ধ করব নাকি বন্ধুত্বের অভিনয় চালিয়ে যাব?"

কণিক মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে ছিল রাজনীতির হিমশীতল ধূর্ততা। তিনি বললেন, "মহারাজ, আমার কথায় ক্ষুব্ধ হবেন না। মনে রাখবেন, রাজার প্রথম ধর্ম হলো দণ্ডপ্রদান। ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বসে থাকা রাজধর্ম নয়। আপনার দুর্বলতা যেন কেউ না জানে, কিন্তু অন্যের দুর্বলতা থাকবে আপনার নখদর্পণে। শত্রুকে নির্মূল করার সময় মাঝপথে থামতে নেই। শরীরে মাছের কাঁটা বিঁধে থাকলে যেমন সারাক্ষণ যন্ত্রণা দেয়, শত্রুও ঠিক তেমন।"

কণিক আরও যোগ করলেন, "শত্রু যদি আপনার কাঁধেও চেপে বসে, তবুও সুযোগ না আসা পর্যন্ত তাকে বয়ে নিয়ে যান। তারপর ঠিক সময় বুঝে মাটির পাত্রের মতো তাকে আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলুন। সাম, দান, দণ্ড, ভেদ—এই চতুর্বর্গই হলো শত্রুজয়ের শ্রেষ্ঠ উপায়।"

ধৃতরাষ্ট্র কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "কীভাবে এই নীতি প্রয়োগ করতে হয়, কণিক?"

তখন কণিক শোনালেন সেই ধূর্ত শিয়ালের কাহিনী।

এক গভীর অরণ্যে এক শেয়াল বাস করত। সে ছিল ভীষণ বুদ্ধিমান আর লোভী। আর সাথে থাকত বাঘ, নেকড়ে,  ইঁদুর,  নেউল। 

অরণ্যের নির্জনতায় তাদের লোলুপ দৃষ্টি গিয়ে পড়ল এক বিশালকায়, ক্ষিপ্রগতির কৃষ্ণসার হরিণের ওপর। বাঘ তার সর্বশক্তি দিয়ে থাবা বাড়িয়েছিল বটে, কিন্তু সেই বিদ্যুদ্গতি হরিণের নাগাল পাওয়া তার পক্ষেও অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। ব্যর্থ মনোরথ হয়ে বাঘ যখন হাল ছেড়ে দিচ্ছে, তখনই দৃশ্যপটে এল সেই ধূর্ত শিয়াল—আসল চক্রী।

​সে জানত, শুধু পেশি দিয়ে সব যুদ্ধ জয় করা যায় না। শিয়াল তখন দাবার চালের মতো ইঁদুরটিকে এগিয়ে দিল। গভীর রাতে, যখন হরিণটি গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন ইঁদুর নিঃশব্দে তার পায়ের কাছে গিয়ে নখ আর দাঁত দিয়ে হরিণের পায়ের টেন্ডন বা শিরাগুলো কুরে কুরে কেটে দিল।

​পরদিন সকালে দেখা গেল সেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ হরিণটি আর দৌড়াতে পারছে না, কেবল খোঁড়াচ্ছে। অসহায় শিকারকে বাঘ এবার অতি অনায়াসে মাটিতে ফেলে বুক চিরে দিল। শিয়ালের মস্তিষ্কের কাছে হার মানল অরণ্যের শ্রেষ্ঠ গতি।

তারা সবাই মিলে এক বিশাল কৃষ্ণসার হরিণ শিকার করল। কিন্তু খাবার সময় আসতেই শেয়াল চাল চালল।

সে বাকিদের বলল, "আপনারা স্নান সেরে আহ্নিক করে আসুন, ততক্ষণ আমি পাহারা দিচ্ছি।"

১. বাঘ যখন ফিরে এল: শেয়াল গম্ভীর মুখে বলল, "মহারাজ, ইঁদুর বলছে হরিণটা নাকি তার জন্যই ধরা পড়েছে। আপনার কোনো শক্তিই নেই।" গর্বিত বাঘ রেগে গিয়ে নিজের শিকারে আর মুখ না দিয়ে অন্য বনে চলে গেল।

২. ইঁদুর যখন এল: শেয়াল সতর্ক করে বলল, "সাবধান! নেউল তোমাকে জলখাবার হিসেবে খাওয়ার ফন্দি আঁটছে।" ভয়ে ইঁদুর গর্তে ঢুকল।

৩. নেকড়ে যখন এল: শেয়াল জানাল, "বাঘ ভীষণ রেগে আছে, এখনই তোমাকে মারতে আসবে।" নেকড়েও চম্পট দিল।

৪. শেষে রইল নেউল: শেয়াল দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলল, "বাঘ-নেকড়ে সবাই আমার ভয়ে পালিয়েছে। সাহস থাকলে আমার সাথে লড়তে পারো।" নেউল বিপদের ঝুঁকি না নিয়ে পিছু হটল।

শেষমেশ শেয়াল একাই আয়েশ করে পুরো হরিণটা খেল।

গল্প শেষ করে কণিক স্থির দৃষ্টিতে ধৃতরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, "মহারাজ, একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজাকে হতে হবে ঠিক ওই শেয়ালের মতো। অন্যের শক্তি ব্যবহার করুন, কিন্তু ভাগ দেওয়ার সময় কৌশলে তাদের সরিয়ে দিন।"

ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ চোখের কোণে এক কুটিল চিন্তার ঝিলিক খেলে গেল। কণিকের এই বিষাক্ত পরামর্শই পাণ্ডবদের নির্বাসনের সেই ভয়ঙ্কর পথটিকে প্রশস্ত করে তুলল। 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন


Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র

রাজা যযাতির পতন ও মুক্তি