পাণ্ডব-কথা: এক অলৌকিক জন্ম ও এক বসন্তের দীর্ঘশ্বাস
পাণ্ডব-কথা: এক অলৌকিক জন্ম ও এক বসন্তের দীর্ঘশ্বাস
ব্যাসদেব যাকে কৌরব বংশের অন্য এক শাখা বলেছেন, সেই পাণ্ডবদের জন্মের ইতিহাসটা অদ্ভুত। সেদিন ছিল অমাবস্যা। শতশৃঙ্গ পর্বতের নির্জনতায় মুনি-ঋষিরা সব একত্রিত হয়ে চলছেন ব্রহ্মলোকের দিকে। পাণ্ডু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনারা কোথায় চলেছেন?"
ঋষিরা থামলেন। শান্ত স্বরে বললেন, "মহারাজ, আমরা ব্রহ্মার কাছে যাচ্ছি।"
পাণ্ডু আর স্থির থাকতে পারলেন না। দুই স্ত্রীকে নিয়ে পিছু নিলেন তাঁদের। কিন্তু ঋষিরা বাধা দিয়ে বললেন, "এ বড় দুর্গম পথ রাজন্! কোথাও খাড়া পাহাড়, কোথাও গভীর উপত্যকা। কোথাও অপ্সরাদের ক্রীড়াভূমি তো কোথাও জনমানবহীন বরফের মরুভূমি। সেখানে পশু নেই, পাখি নেই—আছে শুধু বাতাস আর আমাদের তপস্যার তেজ। রানীদের নিয়ে আপনার পক্ষে এই পথ অতিক্রম করা অসম্ভব। ফিরে যান।"
পাণ্ডুর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। তিনি ম্লান হেসে বললেন, "আমি জানি, নিঃসন্তান মানুষের জন্য স্বর্গের দ্বার রুদ্ধ। মানুষের চারটে ঋণ থাকে—পিতৃঋণ, দেবঋণ, ঋষিঋণ আর মনুষ্যঋণ। যজ্ঞ দিয়ে দেবঋণ শোধ হয়, তপস্যায় ঋষিঋণ আর শ্রাদ্ধে পিতৃঋণ। আমি সব ঋণ চুকিয়েছি, কিন্তু বংশরক্ষা করতে না পেরে মনুষ্যঋণ থেকে মুক্তি পেলাম না। আমার বড় সাধ, আমার স্ত্রীদের গর্ভে এক একটি পুত্রসন্তান খেলা করুক।"
মুনিরা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখলেন। বললেন, "মহারাজ, আপনার কপালে দেবতুল্য সন্তানের যোগ আছে। আপনি দেবদত্ত অধিকার (নিয়োগ প্রথা) প্রয়োগ করার চেষ্টা করুন।"
পাণ্ডুর মন বিষণ্ণতায় ভরে গেল। ঋষি কিনদমের সেই অভিশাপ তাঁর মনে কাঁটার মতো বিঁধছে—স্ত্রীর সান্নিধ্যে এলেই তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত।
কুন্তী ও দিব্য মন্ত্র
একদিন পাণ্ডু তাঁর প্রথমা পত্নী কুন্তীকে নির্জনে ডেকে বললেন, "কুন্তী, এ বংশের প্রদীপ জ্বালাতে তোমাকেই অগ্রণী হতে হবে। তুমি ক্ষেত্রজ পুত্র লাভের চেষ্টা করো।"
কুন্তী তখন তাঁর শৈশবের এক গোপন কথা মেলে ধরলেন। কুন্তীভোজের প্রাসাদে একদিন তেজস্বী ঋষি দুর্বাসা এসেছিলেন। কুন্তীর সেবায় তুষ্ট হয়ে তিনি এক অমোঘ মন্ত্র দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, "এই মন্ত্রে তুমি যে দেবতাকে স্মরণ করবে, তিনি তোমার ইচ্ছার অধীন হয়ে তোমার কাছে আসতে বাধ্য হবেন।"
পাণ্ডু উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। তিনি বললেন, "তবে তাই হোক। তুমি ধর্মরাজকে আহ্বান করো। এই ত্রিলোকে তাঁর চেয়ে পবিত্র আর কেউ নেই। তাঁর আশীর্বাদে যে পুত্র হবে, সে হবে ধার্মিক, সত্যনিষ্ঠ। অধর্ম তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।"
কুন্তী ধ্যানমগ্ন হলেন। আকাশপথে সহাস্য মুখে আবির্ভূত হলেন ধর্মরাজ।
ধর্মরাজ বললেন: "কুন্তী, তোমার অভিলাষ কী? কেন আমায় স্মরণ করেছ?"
কুন্তী বিনীত স্বরে বললেন: "প্রভু, আমি আপনার তেজে এক পুত্র প্রার্থনা করি।"
জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে, অভিজিৎ মুহূর্তে জন্ম নিল এক দেবকান্তি শিশু। আকাশবাণী হল: "এই বালক হবে সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মাত্মা, সত্যবাদী এবং পৃথিবীর শাসক। এর নাম হবে যুধিষ্ঠির।"
কিছুদিন পর পাণ্ডু আবার বললেন, "ক্ষত্রিয় মানেই তো শক্তি। এবার এমন এক পুত্র চাও যে হবে অজেয় বীর।" কুন্তী ডাকলেন পবনদেবকে। হরিণপৃষ্ঠে চড়ে বায়ুদেব এলেন। তাঁর দানে জন্ম নিল ভীম। দৈববাণী হল: "এ হবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পুরুষ।"ভীমের জন্মের দিনই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। কুন্তী যখন কোলের শিশুকে নিয়ে বসে ছিলেন, হঠাৎ এক বাঘের গর্জনে ভয় পেয়ে তিনি শিশুকে ফেলেই দৌড় দিলেন। ভীম গিয়ে পড়লেন এক বিশাল পাথরের চাঁইয়ের ওপর। কিন্তু আশ্চর্য! ভীমের শরীরের আঘাতে সেই কঠিন পাথর ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, কিন্তু শিশুর গায়ে আঁচড়ও লাগল না। সেদিনই হস্তিনাপুরে জন্ম নিয়েছিল দুর্যোধন।
এরপর পাণ্ডু চাইলেন ইন্দ্রের মতো এক পুত্র। তিনি এক পায়ে দাঁড়িয়ে সূর্যের সামনে কঠোর তপস্যা শুরু করলেন। ইন্দ্র সন্তুষ্ট হয়ে বর দিলেন। কুন্তীর আহ্বানে ইন্দ্র এলেন এবং জন্ম নিলেন অর্জুন। আকাশবাণী হল: "এই বালক হবে শিবের মতো অপরাজেয়, ইন্দ্রের মতো যশস্বী। এ কুরুবংশকে উজ্জ্বল করবে।"
মাদ্রীর মাতৃত্ব ও বসন্তের মায়া
পাণ্ডুর অনুরোধে কুন্তী ছোট রানী মাদ্রীকেও সেই মন্ত্র দান করলেন। মাদ্রী স্মরণ করলেন দুই অশ্বিনীকুমারকে। জন্ম নিলেন নকুল ও সহদেব। পাঁচ ভাই একসাথে শতশৃঙ্গ পাহাড়ের কোলে ঋষিদের সান্নিধ্যে বড় হতে লাগল।
কিন্তু নিয়তি অলক্ষ্যে হাসছিল। বসন্ত এল অরণ্যে। পলাশ আর শিমুলের রঙে আকাশ যেন মাতাল। পাণ্ডু আর মাদ্রী বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটছিলেন। মাদ্রীকে সেদিন অপরূপা লাগছিল, তাঁর দেহ থেকে এক স্নিগ্ধ সুবাস ছড়িয়ে পড়ছিল বসন্তের হাওয়ায়।
পাণ্ডু হিতাহিত জ্ঞান হারালেন। দীর্ঘদিনের অবদমিত বাসনা তাঁকে গ্রাস করল। তিনি মাদ্রীর কোমর জড়িয়ে ধরলেন।
মাদ্রী আর্তনাদ করে উঠলেন: "মহারাজ, নিজেকে সামলান! ঋষির অভিশাপ মনে করুন। আমায় স্পর্শ করবেন না!"
পাণ্ডু তখন উন্মত্ত। তিনি কামনার ঘোরে বললেন, "মাদ্রী, এই বসন্তের মাদকতা আর তোমার রূপের সামনে মৃত্যুও তুচ্ছ। আমি আজ কোনো বিধি মানি না।"
পাণ্ডু জোর করে মাদ্রীকে বাহুপাশে টেনে নিলেন। সেই মিলনের মুহূর্তেই পাণ্ডুর দেহ নিথর হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। মাদ্রীর কান্নায় কুন্তী ছুটে এলেন। দেখলেন সব শেষ।
কুন্তী হাহাকার করে উঠলেন: "আমি ওকে আগলে রেখেছিলাম এতদিন, আজ তুমি কেন ওকে রক্ষা করলে না মাদ্রী?"
News
মাদ্রী কাঁদতে কাঁদতে বললেন: "দিদি, আমি অনেক বারণ করেছিলাম, কিন্তু মহারাজ আজ বড় অবাধ্য হয়েছিলেন। বিধাতা যা লিখেছিলেন, তাই হলো।"
পাণ্ডুর চিতার সামনে দুই রানীর মধ্যে এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা শুরু হলো। কুন্তী চাইলেন সহমরণে যেতে। কিন্তু মাদ্রী হাত জোড় করে বললেন, "দিদি, মহারাজ আমার জন্যই প্রাণ হারালেন। আমাকে ওপারে গিয়ে তাঁর সেবা করতে দাও। তুমি বেঁচে থাকো, কারণ তুমি ছাড়া এই পাঁচ পুত্রকে কে রক্ষা করবে? আমার নকুল-সহদেবকে তুমি তোমার নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি আগলে রেখো।"
শেষ পর্যন্ত পাণ্ডুর সাথে মাদ্রীই সহমরণে গেলেন। শতশৃঙ্গের অরণ্যে পড়ে রইল শুধু এক বিষণ্ণ বসন্তের দীর্ঘশ্বাস আর পাঁচ অনাথ পাণ্ডব।
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের লিঙ্কে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:
Co
n


Comments
Post a Comment