রণাঙ্গনে রাজপুত্র ও এক অবজ্ঞাত বীর
রণাঙ্গনে রাজপুত্র ও এক অবজ্ঞাত বীর
সূর্য তখন পূর্বাকাশে উদিয়মান। হস্তিনাপুরের বিশাল এক রণপ্রাঙ্গণ আজ উৎসবের সাজে সেজেছে। চারিদিকে রঙিন পতপত করে উড়ছে ধ্বজা, মাচায় বসেছেন কুরুবংশের ছোট-বড় সবাই। অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের পাশে বসে বিদুর একে একে বর্ণনা করে চলেছেন মাঠের প্রতিটি দৃশ্য—কেমন করে রাজপুত্ররা কৃপাচার্য আর দ্রোণাচার্যের কাছে শিক্ষা শেষ করে আজ তাদের শৌর্য দেখাতে নেমেছে। কুন্তী আর গান্ধারী পাশাপাশি বসেছেন; কুন্তী নীচু স্বরে চোখবাঁধা গান্ধারীকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন তাঁর সন্তানদের কৃতিত্ব।
হস্তিনাপুরের সেই বিশাল প্রাঙ্গণ তখন এক মায়াবী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দুপুরের রোদে ঝকমক করছে অস্ত্রশস্ত্র। চারিদিকে গ্যালারিভর্তি মানুষ, তাদের চোখের পলক পড়ছে না। ইতিহাস যেখানে রক্ত আর ঘামের গন্ধে কথা বলে, সেদিন হস্তিনাপুর ঠিক তেমনি এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল।
দ্রোণাচার্যের সঙ্কেত পেতেই একে একে রাজপুত্ররা প্রবেশ করলেন ময়দানে। প্রথমে ছোটখাটো নিপুণতা—ঘোড়সওয়ারি, লক্ষ্যভেদ, তারপর শুরু হলো তলোয়ারের ঝনঝনানি। নকুল আর সহদেব যখন তাঁদের বিদ্যুতের মতো দ্রুত তলোয়ার চালাতে শুরু করলেন, মনে হচ্ছিল যেন বাতাস চিরে রুপোলি মাছেরা খেলা করছে। দর্শকদের হাততালিতে আকাশ ফেটে পড়ছিল। কিন্তু উত্তেজনার পারদ অন্য মাত্রা নিল যখন গদা হাতে রণক্ষেত্রে নামলেন ভীম আর দুর্যোধন।
সে এক ভয়ংকর দৃশ্য। দুজনের শরীরই যেন পাথরে খোদাই করা পাহাড়। গদার আঘাতে যখন গদা ধাক্কা খাচ্ছে, মনে হচ্ছে কোথাও বজ্রপাত হচ্ছে। কোনোটিই খেলার ছলে নয়, প্রতিটা আঘাতের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ঘৃণা আর ঈর্ষা। দুর্যোধনের চোখে তখন এক অদ্ভুত নিষ্ঠুরতা, আর ভীমের পেশিগুলো রাগে কাঁপছে। এক সময় সেই লড়াই আর মহড়া রইল না, তা হয়ে উঠল সত্যিকারের এক প্রাণঘাতী যুদ্ধ। গ্যালারিতে বসা দর্শকরাও দুভাগ হয়ে গেল—একদল চিৎকার করছে ভীমের নামে, অন্যদল দুর্যোধনের। বাতাসের আমেজটা কেমন যেন ভারী আর বিষাক্ত হয়ে উঠল।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্র বিচলিত হলেন। দ্রোণাচার্য বুঝতে পারলেন, এখনই না থামালে এই প্রাঙ্গণ রক্তে ভেসে যাবে। তিনি আদেশ দিলেন লড়াই থামানোর। অগত্যা দুই মদমত্ত হাতির মতো রাগে ফুসতে ফুসতে দুদিকে সরে গেলেন ভীম আর দুর্যোধন।
রণকৌশল প্রদর্শনের সে এক আশ্চর্য মুহূর্ত। অর্জুন যখন প্রবেশ করলেন, মনে হলো যেন সাক্ষাৎ ইন্দ্রের তেজ নেমে এসেছে মাটিতে। তাঁর তূণ থেকে নিক্ষিপ্ত বাণ যেন আকাশের বিদ্যুৎ। লক্ষ্যভেদের সেই নিখুঁত ছন্দ দেখে দর্শকদল স্তব্ধ হয়ে রইল। দ্রোণাচার্যের মুখে তখন এক আত্মতৃপ্তির হাসি—তাঁর প্রিয়তম ছাত্র তাঁকে নিরাশ করেনি।
কিন্তু সেই স্তব্ধতা ভেঙে গেল হঠাৎ।
রণাঙ্গনের প্রবেশদ্বারে দেখা গেল এক দীর্ঘদেহী যুবককে। তাঁর শরীরের সহজাত কবচ আর কুণ্ডলী থেকে যেন আগুনের আভা ঠিকরে পড়ছে। দৃপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন তিনি। কোনো ভূমিকা নেই, কোনো অনুমতি প্রার্থনা নেই—অর্জুন যা যা দেখিয়েছেন, অবিকল সেই সব বীরত্ব তিনি প্রদর্শন করলেন আরও অবলীলায়।
জনতা বিস্ময়ে হতবাক। এই আগন্তুক কে? দুর্যোধন আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত উল্লাস। তিনি যেন তিল তিল করে যাকে খুঁজছিলেন, আজ তাকেই পেয়ে গেছেন। তিনি এগিয়ে গিয়ে সেই যুবককে জড়িয়ে ধরলেন।
"হে মহাবীর, তুমি কে জানি না, কিন্তু তোমার এই বিক্রম দেখে আমি অভিভূত। আজ থেকে আমার যা কিছু আছে, সব তোমার।"
আগন্তুক যুবকের নাম কর্ণ। তাঁর স্থির দৃষ্টি তখন অর্জুনের দিকে। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, "আমি কোনো সমাদর চাই না। আমি শুধু প্রমাণ করতে চাই, এই সভায় শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর কে। অর্জুন, তুমি যদি সাহস থাকে তবে দ্বৈরথ যুদ্ধে অবতীর্ণ হও।"
অর্জুনের কান্নার মতো রক্ত উথলে উঠল মুখে। অনাহুত এই স্পর্ধা তিনি সহ্য করতে পারলেন না। কৃপাচার্য তখন শাস্ত্রীয় নিয়মের দোহাই দিয়ে এগিয়ে এলেন। তিনি বললেন, "অর্জুন কুরুবংশের রাজপুত্র। এই যুদ্ধে অংশ নিতে হলে তোমাকে আগে তোমার পরিচয় দিতে হবে। তোমার পিতা কে? তোমার কুল কী? কারণ রাজপুত্ররা কুলহীন কারও সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন না।"
মুহূর্তে কর্ণের উজ্জ্বল মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সূর্যালোকিত প্রাঙ্গণে তিনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর কাছে এর কোনো উত্তর ছিল না।
ঠিক সেই মুহূর্তে গর্জে উঠলেন দুর্যোধন। তিনি জানতেন, অর্জুনকে রুখতে হলে এই কর্ণের চেয়ে বড় অস্ত্র আর নেই। তিনি বললেন, "বীরত্বের কোনো কুল হয় না। যদি রাজপদই যুদ্ধের মাপকাঠি হয়, তবে এই মুহূর্তেই আমি কর্ণকে অঙ্গরাজ্যের রাজা ঘোষণা করছি।"
তৎক্ষণাৎ সোনার সিংহাসন এল, এল অভিষেক করার পবিত্র জল। সবার চোখের সামনে একজন অজ্ঞাতকুলশীল যুবক হয়ে উঠলেন অঙ্গরাজ।
এমন সময় ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ সারথি—অধিরথ। চোখে আনন্দাশ্রু, জরাগ্রস্ত দেহ। তাঁকে দেখেই কর্ণ সিংহাসন থেকে নেমে গিয়ে তাঁর পায়ে মাথা রাখলেন। পান্ডবরা এতক্ষণ সব দেখছিলেন। ভীমের মুখে ফুটে উঠল এক বিদ্রূপের হাসি।
"ওহ! তবে তো তুমি সূতপুত্র! সারথির ছেলের হাতে কি ধনু সাজে? তোমার হাতে তো লাগাম থাকা উচিত ছিল। অর্জুনের হাতে মরার যোগ্যতাও তোমার নেই।"
অপমানে কর্ণের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। দুর্যোধন কিন্তু দমবার পাত্র নন। তিনি পাল্টা জবাব দিলেন, "নদীর উৎস আর বীরের কুল খুঁজতে নেই ভীম। দেখো এই বীরকে, যাঁর গায়ে সহজাত বর্ম, যাঁর চোখে সূর্যের তেজ। ইনি কি সামান্য সারথি-পুত্র হতে পারেন? যাঁর সাহসে আজ অর্জুনও ভীত, তাঁর পরিচয় তাঁর বিক্রমেই।"
ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আকাশ থেকে আলো মুছে গিয়ে ধোঁয়াশা ঘনিয়ে আসছে রণাঙ্গনে। আজকের মতো খেলার সমাপ্তি ঘোষিত হলো। দ্বৈরথ হলো না, শ্রেষ্ঠত্বের মীমাংসাও হলো না।
দুর্যোধন কর্ণের হাত ধরে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। দুই নিঃসঙ্গ মানুষ যেন একে অপরের আশ্রয় খুঁজে পেলেন। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় হস্তিনাপুরের আকাশে যে রেষারেষির মেঘ জমল, তার শেষ হতে আরও অনেক রক্ত আর দীর্ঘশ্বাস বাকি ছিল। অর্জুন আর কর্ণ—কেউই সেই দিনের সেই প্রশ্নটা ভুলতে পারেননি। শ্রেষ্ঠ কে? উত্তরটা সেদিন না মিললেও, মহাকালের পাতায় তা লেখা হতে শুরু করেছিল।

Comments
Post a Comment