বিষাদ ও অমৃত: এক সমুদ্রমন্থনের আখ্যান

বিষাদ ও অমৃত: এক সমুদ্রমন্থনের আখ্যান


নীল নির্জনতার ভেতরেও একটা দাহ থাকে। দেবরাজ ইন্দ্রের সেদিন শরীরী দাহ ছিল না, ছিল আভিজাত্যের দম্ভ। আর সেই দম্ভের আগুনেই ছাই হয়ে গেল স্বর্গপুরীর সব ঐশ্বর্য। গল্পটা শুরু হয়েছিল একটা সামান্য ফুলের মালা দিয়ে, কিন্তু তার শেষটা লেখা হলো মহাকালের নীল বিষে।

এক ঋষির ক্রোধ ও ধুলোয় মেশা দম্ভ

দুর্বাসা ঋষি— যাঁর মেজাজটা আগুনের শিখার মতো সব সময় কাঁপত। একদিন দেবরাজকে এক দিব্য মালা উপহার দিলেন তিনি। কিন্তু ক্ষমতার মদমত্ততায় ইন্দ্র ভুলে গেলেন সৌজন্য। মালাটা নিজের গলায় না পরে ছুড়ে দিলেন বাহন ঐরাবতের শুঁড়ে। হাতিটা আপন খেয়ালে সেই মালা ধুলোয় আছাড় মারল।

ব্যাস, এটুকুই যথেষ্ট ছিল। দুর্বাসার চোখ থেকে যেন বিদ্যুৎ ঠিকরে বেরোল। তিনি অভিশাপ দিলেন, "যে ঐশ্বর্যের গরমে তুমি অন্ধ, সেই লক্ষ্মী তোমাকে ত্যাগ করবেন। দেবকুল আজ থেকে শ্রীহীন হবে।"

দেখতে দেখতে দেবতাদের গায়ের দ্যুতি মিলিয়ে গেল। বলিরেখা দেখা দিল তাঁদের শরীরে। আর সেই সুযোগে অসুররা কেড়ে নিল স্বর্গ। হেরে যাওয়া দেবতারা যখন দিশেহারা, তখন ভগবান বিষ্ণু তাঁদের এক বিচিত্র পথের হদিশ দিলেন— সমুদ্রমন্থন।

শত্রু যখন সহযোগী

বিষ্ণু বললেন, "ক্ষীরসমুদ্রের অতলে লুকিয়ে আছে অমৃত। সেই সুধা পান করলেই তোমরা হারানো তেজ ফিরে পাবে। কিন্তু একা তোমরা পারবে না, অসুরদের সাথে সন্ধি করো।"

অগত্যা মান অভিমান বিসর্জন দিয়ে দেবাসুর এক হলো। মন্দার পর্বত হলো মন্থনদণ্ড, আর বাসুকি নাগ হলো দড়ি। কিন্তু মাঝসমুদ্রে পর্বতটা ডুবতে শুরু করতেই বিষ্ণু কূর্ম অবতার হয়ে পাহাড়টাকে নিজের পিঠে ধারণ করলেন। শুরু হলো মন্থন। একদিকে দেবতারা, একদিকে অসুররা। সমুদ্রের বুক চিরে এক অলৌকিক শব্দ জেগে উঠল।

হলাহল ও নীলকণ্ঠের জন্ম

প্রথমেই যা উঠে এল, তা অমৃত নয়— তা ছিল তীব্র হলাহল বিষ। সেই বিষের ধোঁয়ায় ত্রিলোক যখন নীল হয়ে মরতে বসেছে, তখন এগিয়ে এলেন এক নিঃসঙ্গ সন্ন্যাসী। মহাদেব। তিনি সেই বিষ নিজের হাতের তালুতে তুলে নিলেন এবং অবলীলায় পান করলেন। কিন্তু বিষ নামল না নিচে, তাঁর গলার কাছে আটকে থেকে গ্রীবাকে করে দিল নীলবর্ণ। কোনো এক উপন্যাসের নায়কের মতো তিনিও যেন জগতের সব নীল বিষ নিজের কণ্ঠে জমা করে হয়ে রইলেন 'নীলকণ্ঠ'।

বিপদ কাটতেই একে একে উঠে এল সমুদ্রের লুকানো সব রত্ন। কামধেনু, উচ্চৈঃশ্রবা ঘোড়া, ঐরাবত আর সম্পদের দেবী লক্ষ্মী। সবশেষে উদিত হলেন ধন্বন্তরি— তাঁর হাতে অমৃতের কলস।

মোহিনী মায়া ও রাহু-কেতুর জন্ম

অমৃত দেখামাত্রই অসুরদের ভেতর কাড়াকাড়ি পড়ে গেল। ঠিক তখনই সেখানে আবির্ভূত হলেন এক নারী। নাম তাঁর মোহিনী। এমন রূপ, এমন তাঁর চাউনি যে অসুররা লড়াই ভুলে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মোহিনী কৌশলে অসুরদের ভুলিয়ে সবটুকু সুধা দেবতাদের পান করিয়ে দিলেন।

এরই মাঝে রাহু নামের এক চতুর অসুর ছদ্মবেশে দেবতাদের সারিতে ঢুকে এক চুমুক অমৃত খেয়ে ফেলল। সূর্য আর চন্দ্র সেটা দেখে ফেলতেই চিৎকার করে উঠলেন। বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র রাহুর গলা কেটে দুভাগ করে দিল। কিন্তু যেহেতু অমৃত তখন গলার নিচে নেমে গেছে, তাই সে আর মরল না। মাথাটা হলো রাহু আর ধড়টা কেতু। আজও তারা সেই প্রতিশোধ নিতে সূর্য আর চন্দ্রকে গ্রাস করার জন্য তাড়া করে ফেরে— যাকে আমরা বলি গ্রহণ।

বিসর্জনের শেষে প্রাপ্তি

সমুদ্রমন্থন শেষ হলো। দেবতারা অমর হলেন, হারানো স্বর্গ ফিরে পেলেন। কিন্তু এই গল্পের গূঢ় সত্যটা অন্য কোথাও লুকিয়ে আছে। জীবনের সমুদ্র মন্থন করলে আগে হলাহল বিষই উঠে আসে, আগে নীলকণ্ঠ হয়ে সেই বিষ হজম করতে হয়। তারপরই মেলে শান্তির অমৃত।

আসলে যা কিছু শ্রেষ্ঠ, তা সহজে মেলে না। প্রাপ্তির আগে দিতে হয় কঠিন পরীক্ষা— কখনও দম্ভ বিসর্জন দিয়ে, কখনও বা শত্রুর সাথে হাত মিলিয়ে। সমুদ্র তার রত্নরাজি এমনিতে ছেড়ে দেয় না, তাকে নিংড়ে নিতে হয়।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:

WhatsApp করুন


Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতী ও ব্যাসদেব

"পতন একদিনে হয় না, উত্থানও একদিনে হয় না — কিন্তু সেই একটা মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সব ঠিক করে দেয়।"

পাণ্ডব-কথা: এক অলৌকিক জন্ম ও এক বসন্তের দীর্ঘশ্বাস