দ্রোণের প্রতিশোধ: পাঞ্চালরাজের দর্পচূর্ণ

 


দ্রোণের প্রতিশোধ: পাঞ্চালরাজের দর্পচূর্ণ

শিক্ষাশেষ। 

গুরুদক্ষিণা দেওয়ার লগ্ন সমাগত। পাণ্ডব ও কৌরব রাজপুত্ররা যখন করজোড়ে গুরুর সামনে দাঁড়ালেন, দ্রোণাচার্যের দুচোখে তখন বহু বছরের পুরনো এক অপমানের আগুন ধিকধিক করে জ্বলছে। তিনি কোনো সোনা-দানা বা মণিমাণিক্য চাইলেন না। খুব শান্ত গলায় শিষ্যদের বললেন, "আমার দক্ষিণার জন্য তোমাদের পাঞ্চাল আক্রমণ করতে হবে। পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে যুদ্ধে পরাজিত করে আমার পায়ের কাছে বন্দি করে নিয়ে এসো। সেটাই হবে আমার শ্রেষ্ঠ পাওনা।"

দ্রোণাচার্যের এই আদেশ শোনামাত্র কৌরবরা উল্লাসে ফেটে পড়ল। দুর্যোধন, কর্ণ আর দুঃশাসনরা বুক চিতিয়ে আস্ফালন করতে লাগলেন যে, দ্রুপদকে বন্দি করা তাঁদের কাছে সামান্য খেলা মাত্র। পাণ্ডবরা কিন্তু চুপচাপ, তাঁদের চোখেমুখে কেবল যুদ্ধের প্রস্তুতির গাম্ভীর্য।

এক বিশাল বাহিনী নিয়ে কৌরবরা পাঞ্চালের দিকে অগ্রসর হলো। রথের ঘর্ঘর আর হাতির বৃংহণে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল। পাঞ্চালের সীমানায় পৌঁছে অর্জুন তাঁর ভাইদের নিয়ে একটু দূরে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। কৌরবদের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, "আপনারাই আগে যুদ্ধ শুরু করুন। আপনাদের শৌর্য দেখার অপেক্ষায় রইলাম।"

দ্রুপদ কোনো সাধারণ যোদ্ধা ছিলেন না। কৌরবরা ভেবেছিল অবলীলায় জয় ছিনিয়ে নেবে, কিন্তু রণক্ষেত্রে দেখা গেল অন্য ছবি। দ্রুপদের অব্যর্থ বাণবর্ষণে কৌরব বাহিনী খড়কুটোর মতো উড়ে যেতে লাগল। দুর্যোধনরা আবিষ্কার করলেন যে, আস্ফালন করা সহজ, কিন্তু দ্রুপদকে হারানো অতটা সহজ নয়। পাঞ্চাল সেনাদের প্রতাপে কৌরবদের অহংকার ধুলোয় মিশে গেল। আহত ও পরাজিত হয়ে কৌরবরা পিছু হটতে বাধ্য হলো। দূরে দাঁড়িয়ে অর্জুন সব দেখছিলেন। পাঞ্চালের জয়োল্লাস যখন তুঙ্গে, শঙ্খধ্বনি যখন বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছে, ঠিক তখন পাণ্ডবরা রণক্ষেত্রে পা রাখলেন।

এবার যুদ্ধের চরিত্র বদলে গেল। ভীম তাঁর গদা নিয়ে প্রলয়ঙ্কর মূর্তিতে পাঞ্চাল বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আর অর্জুনের ধনুক থেকে ছিটকে আসা তীরের ঝাপটায় পাঞ্চাল সেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ল।প্রথমে অর্জুনকে  সত্যজিৎ  আক্রমন করে। কিন্তু অর্জুন শীঘ্রই তাকে ধরাশায়ী  করে।অর্জুনের লক্ষ্য ছিল স্থির, তাঁর বীরত্বের সামনে দ্রুপদ বেশিক্ষণ টিকতে পারলেন না। অজেয় পাঞ্চালরাজ শেষ পর্যন্ত অর্জুনের হাতে বন্দি হলেন।

জয়ের পর ভীম যখন নগরীর সম্পদ লুঠ করতে উদ্যত হলেন, অর্জুন তাঁকে রুখে দিয়ে বললেন, "ভুলে যেও না ভাই, আমাদের লক্ষ্য ছিল কেবল দ্রুপদ। নিরপরাধ প্রজাদের ওপর অত্যাচার করা বা সম্পদ গ্রাস করা আমাদের গুরুর নির্দেশ নয়।"

বন্দি দ্রুপদকে নিয়ে পাণ্ডবরা ফিরে এলেন দ্রোণাচার্যের আশ্রমে। বহু বছর পর দুই বাল্যবন্ধু আবার মুখোমুখি। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। দ্রোণ স্থির চোখে চাইলেন দ্রুপদের দিকে। তাঁর কণ্ঠে কোনো ক্রোধ নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত শীতলতা।

তিনি বললেন, "দ্রুপদ, মনে আছে? তুমি বলেছিলে বন্ধুত্ব কেবল সমানে সমানে হয়। আজ তোমার রাজ্য আমার অধিকারে। আজ তুমি সহায়-সম্বলহীন এক সাধারণ মানুষ। এই মুহূর্তে তুমি আমার সমান নও। কিন্তু আমি তোমার মতো সংকীর্ণমনা নই। আমি আমাদের পুরনো বন্ধুত্বকে সম্মান করি।"

দ্রোণ হাসলেন, তবে সেই হাসিতে বিদ্রূপ ছিল না, ছিল জয়ের প্রশান্তি। তিনি ঘোষণা করলেন, "আমি তোমার রাজ্যের অর্ধাংশ—চর্মণ্বতী নদীর দক্ষিণ ভাগ তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আর উত্তর ভাগ, যার রাজধানী অহিচ্ছত্র, সেটা থাকবে আমার শাসনে। এবার আমরা দুজনেই রাজা, দুজনেই সমান। এবার কি আমরা আবার বন্ধু হতে পারি?"

অপমানে নীল হয়ে যাওয়া দ্রুপদ মুক্তি পেলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে জেগে রইল এক নতুন প্রতিশোধের ক্ষুধা। অর্জুনের শৌর্যে অর্জিত সেই জয়ে দ্রোণের দীর্ঘদিনের অপমানের ঋণ শোধ হলো, কিন্তু শুরু হলো মহাভারতের এক নতুন রক্তক্ষয়ী অধ্যায়।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন


Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র

রাজা যযাতির পতন ও মুক্তি