দ্রৌপদীর নিয়তি সংবাদটা বাতাসের আগে ছোটে।
দ্রৌপদীর নিয়তি সংবাদটা বাতাসের আগে ছোটে।
একচক্রা গ্রামের সেই ছিমছাম কুঁড়েঘরে যখন খবরটা পৌঁছল, তখন পাণ্ডবরা ছদ্মবেশে দিন কাটাচ্ছেন। ব্রাহ্মণ সেজে থাকা পাঁচ ভাইয়ের কানে এল পাঞ্চাল রাজ্যে এক বিশাল স্বয়ংবরের আয়োজন হয়েছে। রাজা দ্রুপদের কন্যা দ্রৌপদী নিজে বেছে নেবেন তাঁর জীবনসঙ্গীকে। ভারতবর্ষের তাবড় তাবড় রাজপুত্র আর বীরেরা সেখানে ভিড় জমাচ্ছেন।
কুন্তী লক্ষ্য করলেন তাঁর ছেলেদের। কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন ছিল না। তিনি দেখলেন অর্জুন-ভীমদের চোখে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা, এক অস্থিরতা। কতদিন পর এই চাউনি ফিরল! বনবাস, লাঞ্ছনা আর মৃত্যুর সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। নিজেদের বীরত্বকে লুকিয়ে রেখে ব্রাহ্মণের মতন শান্ত জীবন যাপন করতে করতে মনের ভেতর যে ক্ষোভ জমা হয়েছিল, দ্রৌপদীর স্বয়ংবরের সংবাদে যেন তাতে একটা স্ফুলিঙ্গ পড়ল। কুন্তী বুঝলেন, কুঁড়েঘরের চার দেওয়ালে আর এদের আটকে রাখা যাবে না।
তিনি শান্ত গলায় সিদ্ধান্ত নিলেন, "অনেক দিন তো এখানে থাকা হলো। একচক্রার মানুষরা আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, ভালোবাসা দিয়েছে। কিন্তু এবার যাওয়ার সময় হয়েছে। চলো, আমরা পাঞ্চালের দিকেই রওনা হই।"
ভাইরা একে অপরের দিকে তাকাল। যুধিষ্ঠির, যিনি সবসময় মেপে কথা বলেন, তিনি শুধু বললেন, "মা যখন বলছেন, আর ভাইরা যদি একমত হয়, তবে তা-ই হোক।"
কারও কোনো দ্বিমত ছিল না।
যাত্রার প্রস্তুতি যখন প্রায় শেষ, তখনই সেই কুঁড়েঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল এক দীর্ঘকায় ছায়া। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব। যাঁর দৃষ্টি বর্তমান ছাড়িয়ে অতীত আর ভবিষ্যতের গহীনেও পৌঁছে যায়। তিনি কেবল ঋষি নন, তিনি পাণ্ডবদের পূর্বপুরুষও বটে। ব্যাসদেবের অকাল আগমন কখনওই কাকতালীয় হয় না।
পাণ্ডবরা তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় বরণ করলেন। কুন্তী বসতে দিলেন আসন। কিছুক্ষণ ব্যাসদেব ধর্ম, কর্ম আর মানুষের নিয়তি নিয়ে গভীর আলোচনা করলেন। তিনি বারবার মনে করিয়ে দিলেন, ধর্মের পথ যতই আঁকাবাঁকা আর দুর্গম হোক, শেষ পর্যন্ত সেই পথেই চলা উচিত। ভাইয়েরা মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনছিলেন।
হঠাৎ ব্যাসদেব থামলেন। তাঁর চোখে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, "পাঞ্চালে যাওয়ার আগে তোমাদের একটা গল্প শোনা দরকার। দ্রৌপদী কে, সেটা জানতে হবে। আজ তোমরা যা দেখছ, সেটা তো কেবল একটা খোলস মাত্র। এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক অলৌকিক অতীত।"
ব্যাসদেব বলতে শুরু করলেন। অনেক আগের কথা। এক পরম জ্ঞানী ঋষির এক কন্যা ছিল। সেই কন্যার রূপ বর্ণনা করার মতন ভাষা কোনো কবির নেই। মনে হতো যেন বিধাতা নিজের হাতে নিখুঁত এক প্রতিমা গড়েছেন। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হলো, অত রূপ আর গুণ থাকা সত্ত্বেও তার বিবাহ হচ্ছিল না। কোনো সুপাত্র জোটে না, কোনো সম্বন্ধ টেকে না। মনে হতো যেন ভাগ্যের এক অদৃশ্য দেওয়াল তাকে ঘিরে রেখেছে।
এটা কেবল দুর্ভাগ্য ছিল না, ছিল পূর্বজন্মের কর্মফল। মানুষ যখন এক জীবন থেকে অন্য জীবনে পাড়ি দেয়, তখন তার সঙ্গে যায় সেই অব্যাক্ত কর্মের হিসেব। মেয়েটি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছিল ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘদিনের একাকীত্ব যখন অসহ্য হয়ে উঠল, তখন সেই হাহাকার পরিণত হলো প্রার্থনায়। সে দেবদেবীর আরাধনা শুরু করল। বিশেষ করে মহাদেব শিবের আরাধনায় সে নিজেকে সঁপে দিল।
দেবরাজ শিব সন্তুষ্ট হলেন। একদিন তিনি আবির্ভূত হলেন মেয়েটির সামনে। শান্ত গলায় বললেন, "বলো মাতা, তোমার কী প্রার্থনা?"
মেয়েটি অভিভূত হয়ে পড়েছিল। উত্তেজনায় আর অনেক দিনের জমানো আবেগে সে বলে ফেলল, "আমি এক গুণবান স্বামী চাই।"
কিন্তু তার তৃষ্ণা এতটাই ছিল যে, সে একই কথা বারবার বলতে লাগল। "আমাকে স্বামী দিন, আমাকে স্বামী দিন..."—এভাবে গুনে গুনে পাঁচবার সে একই বর চাইল।
মহাদেব স্মিত হাসলেন। বললেন, "তথাস্তু। তুমি পাঁচজন স্বামী লাভ করবে।"
মেয়েটি থতমত খেয়ে গেল। শিউরে উঠে বলল, "এ কী বলছেন প্রভু! আমি তো শুধু একজন স্বামী চেয়েছিলাম। ভুল করে পাঁচবার বলে ফেলেছি।"
শিব মৃদু মাথা নেড়ে বললেন, "তুমি পাঁচবার প্রার্থনা করেছ। আমার কাছে প্রতিটি প্রার্থনাই ছিল এক একটি পৃথক ইচ্ছা। আমি পাঁচটি ইচ্ছাই পূরণ করেছি। যা একবার দেওয়া হয়ে গেছে, তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। এটাই তোমার নিয়তি।"
মেয়েটি স্তব্ধ হয়ে রইল। মহাকালের লিখন খণ্ডাবে কে?
ব্যাসদেব পাণ্ডবদের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "সেই মেয়েটিই আজ আবার জন্ম নিয়েছে। সে কোনো মায়ের গর্ভ থেকে আসেনি, সে এসেছে রাজা দ্রুপদের যজ্ঞকুণ্ডের লেলিহান অগ্নিশিখা থেকে। তার নাম কৃষ্ণা, লোকে তাকে দ্রৌপদী বলে চেনে। আর মহাদেবের সেই বর অনুযায়ী তার পাঁচ স্বামী হওয়ার কথা ছিল—সেই পাঁচজন বীর এই কুঁড়েঘরেই বসে আছো।"
ব্যাসদেব উঠে দাঁড়ালেন। ঘরজুড়ে এক নিস্তব্ধতা। তিনি যাওয়ার আগে শুধু বললেন, "দ্রৌপদী তোমাদের পাঁচ ভাইয়েরই অর্ধাঙ্গিনী হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট হয়ে আছে। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা বহু আগে থেকেই স্থির হয়ে থাকা এক চিত্রনাট্য। পাঞ্চালে যাও। স্বয়ংবরে অংশ নাও। দ্রৌপদীকে সুখী করো।"
কিছুক্ষণ পরেই ঋষি ব্যাসদেব যেমন এসেছিলেন, তেমনই অলক্ষ্যে মিলিয়ে গেলেন। পেছনে রেখে গেলেন কুন্তী আর তাঁর পাঁচ ছেলেকে, যাঁদের সামনে এখন পাঞ্চালের দীর্ঘ পথ আর এক অদ্ভুত ভবিষ্যতের ইশারা।

Comments
Post a Comment