গরুড় ও অমৃতের সন্ধান: এক শক্তিশালী বীরের আখ্যান
গরুড় ও অমৃতের সন্ধান: এক শক্তিশালী বীরের আখ্যান-
বিনতানন্দন গরুড়ের বুকের ভেতর তখন এক প্রকাণ্ড আগুন জ্বলছে। সে আগুন ক্ষুধার নয়, অপমানের। এক তুচ্ছ বাজি হেরে তাঁর মা বিনতা এখন কদ্রুর দাসী। দাসত্ব মোচনের একটাই পথ— সর্প সন্তানদের জন্য স্বর্গ থেকে নিয়ে আসতে হবে অমৃত।
যাত্রার আগে মা বিনতা ছেলেকে সাবধান করেছিলেন, "সমুদ্রের মাঝখানে ওই সর্পকুলকে তুই আহার হিসেবে গ্রহণ করিস, কিন্তু খবরদার, কোনো ব্রাহ্মণকে যেন আঘাত করিস না।"
একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল-
আকাশপথে উড়তে উড়তে গরুড়ের জঠরে তখন তীব্র ক্ষুধার জ্বালা। হঠাৎ ক্ষুধার ঝোঁকে তিনি এমন একজনকে মুখে পুরে নিলেন, যার সংস্পর্শে তাঁর তালু আগুনের মতো জ্বলতে শুরু করল। গরুড় বুঝলেন, ভুল হয়েছে। নিজের অজান্তেই তিনি এক ব্রাহ্মণকে মুখে তুলে নিয়েছেন। তৎক্ষণাৎ তাঁকে মুক্ত করে দিয়ে গরুড় এগিয়ে চললেন।
কিছুদূর এগোতেই দেখা হলো মহর্ষি কশ্যপের সঙ্গে। কশ্যপ কুশল জানতে চাইলেন। গরুড় লুকোলেন না কিছুই— মায়ের দাসত্ব, কদ্রুর চক্রান্ত আর অমৃত আহরণের কঠিন লক্ষ্যের কথা খুলে বললেন। শেষে ঈষৎ বিরক্তির সঙ্গেই জানালেন, তাঁর পেটের ক্ষুধা এখনো মেটেনি।
দুই ভাইয়ের প্রতিহিংসা-
কশ্যপ স্মিত হেসে বললেন, "চিন্তা নেই। অদূরেই এক বিশ্ববিখ্যাত সরোবর আছে। সেখানে এক বিশালকায় হাতি আর এক প্রকাণ্ড কচ্ছপ বাস করে। তাদের পারস্পরিক ঘৃণা আজও প্রবাদপ্রতিম।"
এই ঘৃণার শিকড় অনেক গভীরে। গত জন্মে তারা ছিল দুই ভাই— বিভাবসু আর সুপ্রতীক। ছোট ভাই সুপ্রতীক বিষয়-সম্পত্তি ভাগ করার জন্য বড় ভাইকে নাছোড়বান্দা হয়ে ধরতেন। বিভাবসু তাঁকে বারবার সাবধান করেছিলেন— "সম্পত্তিই হলো বিভেদের মূল। একবার ভাগ হলে ভাই আর ভাই থাকে না, একে অপরের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।"
কিন্তু সুপ্রতীক শোনেননি। ক্রুদ্ধ বিভাবসু ভাইকে অভিশাপ দিলেন হাতি হওয়ার। পাল্টা অভিশাপে সুপ্রতীক বড় ভাইকে কচ্ছপ বানিয়ে ছাড়লেন।
সেই প্রকাণ্ড হাতি আজ দৈর্ঘ্যে বারো যোজন, আর কচ্ছপ দশ যোজন। পশু হয়েও তারা সেই পুরনো ঝগড়া ভোলেনি। কশ্যপ গরুড়কে বললেন, "ওদের দুজনকে ভক্ষণ করেই তুমি তোমার ক্ষিধে মেটাও।"
গরুড় ঠিক তাই করলেন। নখে করে সেই দানবীয় প্রাণী দুটিকে তুলে নিয়ে তিনি গন্দমাদন পর্বতের শিখরে গিয়ে বসলেন। আহার শেষ করে শান্ত মনে তিনি আবার ডানা মেললেন স্বর্গের পথে।
দেবতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-
গরুড় যখন স্বর্গের কাছাকাছি পৌঁছালেন, তাঁর পাখার ঝাপটায় আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠল। দেবরাজ ইন্দ্র বিচলিত হয়ে দেবগুরু বৃহস্পতির শরণাপন্ন হলেন। বৃহস্পতি শান্ত গলায় বললেন, "বিনতার পুত্র অমৃত নিতে আসছে। ওর তেজ অসীম, ওকে থামানোর সাধ্য কারো নেই।"
দেবতারা হুলুস্থুল বাধিয়ে দিলেন। অমৃত রক্ষা করতে চারদিকে ব্যূহ তৈরি হলো। গরুড় রণক্ষেত্রে পৌঁছাতেই তাঁর পাখার ঝাপটায় চারদিক ধুলোয় অন্ধকার হয়ে গেল। ইন্দ্রের আদেশে বায়ুদেব সেই ধুলো পরিষ্কার করতেই শুরু হলো মহাযুদ্ধ।
সে এক অসম লড়াই।
দেবতাদের অস্ত্র গরুড়কে স্পর্শও করতে পারল না, অথচ গরুড়ের ঠোঁট আর নখের আঘাতে দেবতারা ছিন্নভিন্ন হতে লাগলেন। ব্যূহ ভেদ করে গরুড় যখন অমৃতের কাছে পৌঁছালেন, দেখলেন সেখানে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। গরুড় বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। মুহূর্তে নদী থেকে জল এনে তিনি সেই আগুন নিভিয়ে দিলেন।
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত অমৃতের পাত্র গরুড়ের সামনে।
উপসংহার:লোভ আর জেদ মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। বিভাবসু আর সুপ্রতীক যা মানুষ হিসেবে মিটিয়ে নিতে পারতেন, পশু জন্মেও সেই বোঝা তাঁরা বয়ে বেরিয়েছেন। অন্যদিকে গরুড়ের এই সংগ্রাম প্রমাণ করে, ভক্তি আর সংকল্প থাকলে স্বর্গ জয় করাও অসম্ভব নয়— তবে সেই শক্তির পেছনে থাকা চাই সঠিক প্রজ্ঞা আর সাহস।

Comments
Post a Comment