বশিষ্ঠ ও কল্মাষপাদ: এক আশ্চর্য ক্ষমা
বশিষ্ঠ ও কল্মাষপাদ: এক আশ্চর্য ক্ষমা
বনবাসের সেই নিস্তব্ধ রাত। আগুনের শিখাগুলো কাঁপছে আর গন্ধর্বরাজ চিত্ররথ অর্জুনের দিকে তাকিয়ে একটু স্মিত হাসলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ছে এক গভীর অভিজ্ঞতার সুর। তিনি বলতে শুরু করলেন, "শোনো পার্থ, বশিষ্ঠের সেই গল্প শুধু কামধেনুর নয়, সে গল্পের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক পাহাড়প্রমাণ ক্ষমার ইতিহাস। সে ইতিহাস ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা কল্মাষপাদের।"
রাজা কল্মাষপাদ ছিলেন বীর্যবান, কিন্তু ক্ষমতার দম্ভ মানুষের মস্তিস্কে যে বিষ ঢেলে দেয়, তাঁর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। একদিন গভীর অরণ্যে শিকারের নেশায় মত্ত রাজা এক সংকীর্ণ পথে এসে দাঁড়ালেন। উল্টো দিক থেকে আসছিলেন বশিষ্ঠের জ্যেষ্ঠ পুত্র শক্তি। রাজা চাইলেন ঋষিপুত্র তাঁকে পথ ছেড়ে দিন, কিন্তু শক্তি অটল। ক্ষিপ্ত রাজা হাতের চাবুক সপাটে বসিয়ে দিলেন ঋষিপুত্রের গায়ে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই জ্বলে উঠল শক্তির ক্রোধ—তিনি অভিশাপ দিলেন, "অহংকারে তুমি আমায় আঘাত করলে? যাও, আজ থেকে তুমি নরখাদক রাক্ষস হয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়াবে!"
বিশমিমিত্র এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি এক রাক্ষসকে পাঠালেন রাজার শরীরে ভর করার জন্য। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য রাজা কল্মাষপাদ এরপর যা করলেন, তা কল্পনাকেও হার মানায়। তিনি একের পর এক ভক্ষণ করতে শুরু করলেন বশিষ্ঠের একশ পুত্রকে। নিজের চোখের সামনে নিজের সন্তানদের ঘাতকের হাতে বিলীন হতে দেখেও মহর্ষি বশিষ্ঠ কিন্তু ক্রোধে ফেটে পড়লেন না। তিনি বারবার আত্মহননের চেষ্টা করলেন—পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিলেন, আগুনে ঝাঁপ দিলেন, এমনকি সমুদ্রেও—কিন্তু প্রকৃতি তাঁকে রক্ষা করল। তাঁর শোক ছিল হিমালয়ের মতো স্তব্ধ, কিন্তু তাতে প্রতিহিংসার লেশমাত্র ছিল না।
বারো বছর পর যখন অভিশাপের মেয়াদ ফুরিয়ে এল, বশিষ্ঠের মুখোমুখি হলেন সেই কঙ্কালসার কল্মাষপাদ। রাজা পায়ে লুটিয়ে পড়ে কাঁদলেন। বললেন, "ঋষি, আমি আপনার সর্বনাশ করেছি, আপনার বংশ নির্মূল করেছি। আমাকে শাস্তি দিন।"
বশিষ্ঠ শান্ত কণ্ঠে বললেন, "ওঠো রাজা। তুমি যখন ওসব করেছিলে, তখন তুমি তুমি ছিলে না। অতীতকে আঁকড়ে ধরে থেকে লাভ নেই। তোমার বংশ রক্ষার জন্য আমিই তোমাকে সাহায্য করব।" মহর্ষি নিজে ‘নিয়োগ’ প্রথার মাধ্যমে রানী মদয়ন্তীর গর্ভে সন্তান উৎপাদনে রাজি হলেন, যাতে ইক্ষ্বাকু বংশের প্রদীপ নিভে না যায়।
অদৃশ্যন্তী ও গর্ভস্থ বিস্ময়
গল্পের মোড় ঘুরল অন্য দিকে। একদিন বশিষ্ঠ যখন গভীর শোকে বনের পথে হাঁটছেন, হঠাৎ তাঁর কানে এল এক অলৌকিক ছন্দ। কে যেন অবিকল ঋগ্বেদের মন্ত্র উচ্চারণ করছে! বশিষ্ঠ চমকে গিয়ে ডাকলেন, "কে তুমি? কার কণ্ঠ থেকে বেরোচ্ছে এই শুদ্ধ মন্ত্র?"
গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন শক্তির বিধবা পত্নী অদৃশ্যন্তী। তিনি নতজানু হয়ে বললেন, "পিতৃদেব, এ আমি নই। আপনার নাতি, যে এখনও আমার গর্ভে রয়েছে, সে বারো বছর ধরে গর্ভের অন্ধকারেই সমস্ত বেদ মুখস্থ করে ফেলেছে। এই কণ্ঠস্বর তারই।"
বশিষ্ঠের দু’চোখ ভিজে এল। শোকের বালুচরে তিনি প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পেলেন। এই শিশুই পরবর্তীকালে জন্ম নিল, যার নাম রাখা হলো পরাশর—যিনি মৃতপ্রায় বংশে প্রাণের সঞ্চার করেছিলেন।
পরাশরের ক্রোধ ও বশিষ্ঠের শিক্ষা
পরাশর বড় হলেন। কিন্তু যখনই তিনি জানলেন তাঁর পিতা ও পিতৃব্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল রাজা কল্মাষপাদ, তাঁর রক্ত ফুটতে শুরু করল। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, এই ধরাধাম থেকে তিনি ক্ষত্রিয় বংশকেই মুছে দেবেন। এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করলেন তিনি, যা আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত করতে চাইল সমস্ত বীর যোদ্ধাদের।
তখন বশিষ্ঠ পাশে এসে দাঁড়ালেন। প্রবীণ এই ঋষি নাতির কাঁধে হাত রেখে বললেন, "বৎস, ক্রোধ হলো সেই আগুন যা সবার আগে নিজের আধারকে পোড়ায়। কল্মাষপাদ তখন রাক্ষসের অধীন ছিলেন। আজ তোমার বাবা আর কাকা স্বর্গে সুখে আছেন। প্রতিহিংসা কখনো শান্তি আনে না। ক্ষমা করো পরাশর, ক্ষমাতেই মানুষের প্রকৃত বীরত্ব।"
পরাশর তাঁর পিতামহের সেই শান্ত ও গভীর দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে নিজের হাতের অস্ত্র নামিয়ে রাখলেন। সংবরণ করলেন সেই প্রলয়ংকরী যজ্ঞ। এই পরাশরই পরে জন্ম দিয়েছিলেন মহর্ষি বেদব্যাসের, যিনি এই মহাভারত আমাদের উপহার দিয়েছেন।
গন্ধর্বরাজ চিত্ররথ থামলেন। আগুনের ছাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, "পার্থ, প্রকৃত শক্তি অস্ত্রের ঝনঝনানিতে নেই, আছে আত্মার প্রশান্তিতে। বশিষ্ঠ সেদিন ক্ষমা করেছিলেন বলেই আজ আমরা ব্যাসদেবকে পেয়েছি, আজ তোমরা এই ধর্মযুদ্ধ লড়বার প্রেরণা পাচ্ছো।"
পাণ্ডবরা স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। রাতের নিস্তব্ধতা যেন বশিষ্ঠের সেই পাহাড়প্রমাণ ক্ষমার মহিমাকেই বারবার প্রতিধ্বনিত করতে লাগল।

Comments
Post a Comment