আগুন ও অরণ্য: পাণ্ডবদের পুনর্জন্ম

 


আগুন ও অরণ্য: পাণ্ডবদের পুনর্জন্ম

পৃথিবী তখন জেনে গেছে তারা নেই।

বারণাবতের জতুরগৃহের লেলিহান শিখা যখন শান্ত হয়ে এল, তখন সেই ভস্মস্তূপের আড়ালে জন্ম নিল এক অদ্ভুত স্বাধীনতা। মৃত মানুষের কোনো পিছুটান থাকে না, পাণ্ডবদেরও রইল না। ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে, অরণ্যের বুক চিরে যখন পাঁচ ভাই আর কুন্তী নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের পরিচয় একটাই—তারা 'অফিসিয়ালি' মৃত। পেছনে পড়ে রইল ষড়যন্ত্রের ধোঁয়া, আর হস্তিনাপুরে বসে কেউ একজন হয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল এই ভেবে যে, কণ্টক অবশেষে উপুড় হয়েছে।

New s

কিন্তু মৃতেরা হাঁটছিল। এবং তাদের হাঁটার গতি ছিল তীব্র।

শোকের অভিনয় ও অন্তরের উল্লাস

হস্তিনাপুরে খবরটা যখন পৌঁছাল, যেন স্থির জলে কেউ ভারী পাথর ছুঁড়ে দিল। রাজপ্রাসাদ থেকে নগরীর অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে পড়ল সেই হাহাকার। বারণাবতের সেই ধ্বংসস্তূপে পাওয়া গেছে ছয়টি দেহ—এক নারী ও পাঁচ পুরুষের। কৌরব শিবিরের কাছে অঙ্কটা জলের মতো পরিষ্কার। কুন্তী আর তার পাঁচ পুত্র আগুনে পুড়ে খাক হয়ে গেছেন।

দুর্যোধন যখন খবরটা শুনলেন, তার চোখেমুখে তখন শোকের নিখুঁত মেকআপ। জনসমক্ষে তিনি বিলাপ করলেন, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। একজন দক্ষ অভিনেতার মতো তিনি শোকের সবকটি অধ্যায় সফলভাবে সম্পন্ন করলেন। কিন্তু তার হৃদয়ের অন্তঃপুরে তখন জয়ের এক উষ্ণ স্রোত বয়ে যাচ্ছে। শকুনি পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে হাসছিলেন—কাজ যখন হয়েই গেছে, তখন চাতুর্যের আর দরকার কী? শুধু কর্ণ ছিলেন নির্বাক, তার মনের জটিল অন্দরে হয়তো অন্য কোনো লড়াই চলছিল।

বিদুর: যিনি সত্য জানতেন

এই মহানাটকের মাঝে একমাত্র বিদুর দাঁড়িয়ে ছিলেন নির্লিপ্ত পাহাড়ের মতো।

তিনিও শোকপ্রকাশ করলেন, শাস্ত্রীয় আচারে অংশ নিলেন। কিন্তু তার সেই শান্ত চোখের গভীরে ছিল এক গোপন সত্য। তিনি জানতেন, পাণ্ডবরা জীবিত। ওই যে খনক পাঠিয়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করা, ওই যে যাত্রার দিনে সাংকেতিক ভাষায় সাবধান করে দেওয়া—সবই ছিল তার সেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। ধৃতরাষ্ট্র যখন শোকে পাথর, আর দুর্যোধন যখন মনে মনে সিংহাসনের স্বপ্ন দেখছেন, বিদুর তখন জানতেন সত্যটা কী। কিন্তু তিনি মুখ খুললেন না। কারণ সত্য বলা মানেই পাণ্ডবদের বিপদে ফেলা। নীরবতাই ছিল তখন তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

অন্তিম সংস্কার ও এক করুণ পরিহাস

ধৃতরাষ্ট্রের নির্দেশে বারণাবতে ঘটা করে অন্তিম সংস্কার হলো। কিন্তু কার সৎকার হলো? ওই যে অভাগী নিষাদ নারী আর তার পাঁচ পুত্র, যারা বারণাবতের সেই ভোজসভায় আমন্ত্রিত হয়ে এসে চিরনিদ্রায় ঢলে পড়েছিল—পাণ্ডবদের নামে সৎকার হলো তাদেরই। মহাকাব্য এই অজ্ঞাতপরিচয় মা ও ছেলেদের করুণ পরিণতিকে ভুলে যায়নি। রাজনীতির দাবাখেলায় যারা ঘুঁটি হয়ে প্রাণ দিল, ইতিহাস তাদের সেই নিঃশব্দ বলিদানকে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ধরে রেখেছে।

অরণ্যের গভীরে: ভীমের অতিমানবিক যাত্রা

যখন হস্তিনাপুরে ভুয়ো শোক চলছে, পাণ্ডবরা তখন অরণ্যের গভীরে।

সুড়ঙ্গ দিয়ে বেরোনোর পর সেই প্রাক-ভোরের অন্ধকারে ভীমই ছিলেন পথপ্রদর্শক। তিনি জানতেন, চেনা এলাকার কাছাকাছি থাকা মানেই বিপদ। তাই তিনি এক অবাস্তব গতিতে হাঁটতে শুরু করলেন। ঘন অরণ্য, অসমান জমি, কাঁটাঝোপ—কুন্তী ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিলেন। নকুল-সহদেব আর এক পা-ও চলতে পারছিল না।

ঠিক তখনই দেখা গেল ভীমের সেই রুদ্র রূপ। যার বাহুতে দশ হাজার হাতির বল, তিনি কী আর ক্লান্ত হন? তিনি কুন্তীকে পিঠে তুলে নিলেন, দুই বগলে দুই যমজ ভাইকে আঁকড়ে ধরলেন, আর অর্জুন ও যুধিষ্ঠিরকে বললেন তাকে ধরে থাকতে। তারপর সেই অরণ্যের বুক চিরে ভীম ছুটতে শুরু করলেন। ঝোপঝাড় ভেঙে, শেকড়বাকড় ডিঙিয়ে তিনি মাইলের পর মাইল পেরিয়ে গেলেন কয়েক ঘণ্টায়। মহাকাব্যের পাতায় এই ছবিটা চিরকাল অমলিন—এক বিশালকায় মানুষ তার পরিবারকে আগলে নিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে ভবিষ্যতের দিকে দৌড়াচ্ছেন।

হিড়িম্বার অরণ্য ও এক রাক্ষসী প্রেম

যখন ভীম থামলেন, তারা তখন বারণাবত থেকে অনেক দূরে। ক্লান্ত ভাইয়েরা আর মা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ভীম তখন অতন্দ্র প্রহরীর মতো জেগে। ঠিক সেই অরণ্যেই ছিল হিড়িম্ব রাক্ষসের ডেরা। মানুষের গন্ধ পেয়ে সে তার বোন হিড়িম্বাকে পাঠাল শিকার নিশ্চিত করতে।

হিড়িম্বা এল, কিন্তু সে শিকারের বদলে খুঁজে পেল প্রেম। ভীমের সেই পৌরুষদীপ্ত শান্ত চেহারা দেখে সে মুগ্ধ হলো। মায়াবিনী রাক্ষসী এক সুন্দরী নারীর রূপ ধরে ভীমের কাছে এসে সব সত্য প্রকাশ করল। সে সতর্ক করল তার ভাই আসছে। ভীম শুধু হাসলেন। তিনি হিড়িম্বাকে বললেন সরে দাঁড়াতে, যাতে তার ভাইদের ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটে।

এরপর যে যুদ্ধ হলো, তাতে অরণ্যের গাছপালা উপড়ে গেল, মাটি কেঁপে উঠল। কিন্তু ভীম খুব শান্তভাবে, প্রায় অবলীলায় হিড়িম্ব রাক্ষসকে নিধন করলেন। 

ঘুম ভাঙার পর যুধিষ্ঠিররা দেখলেন, এক পাহাড়প্রমাণ রাক্ষসের মৃতদেহের পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ভীম। আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে এক রাক্ষসী নারী, যার চোখে অপলক বিস্ময় আর মুগ্ধতা।

​যুধিষ্ঠির পরিস্থিতিটা মেপে নিলেন এক নিমেষে। তারপর খুব স্বাভাবিক প্রশ্নটাই করলেন। হিড়িম্বা কোনো লুকোছাপা করল না। রাক্ষসীদের স্বভাবের মধ্যেই এক ধরনের সোজাসাপ্টা ব্যাপার থাকে; কোনো দ্বিধা বা লজ্জা ছাড়াই সে জানিয়ে দিল, সে ভীমকে বিবাহ করতে চায়। যে মানুষটা স্পষ্ট জানে সে জীবনে কী চায়, তার গলার স্বর এমনই ঋজু হয়।


​কুন্তী গত এক দিনে যা সহ্য করেছেন, তা সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। কিন্তু জীবন তাকে এক আশ্চর্য বাস্তববোধ শিখিয়েছে। তিনি একবার হিড়িম্বার দিকে তাকালেন, তারপর দিলেন সম্মতি। যুধিষ্ঠিরও অমত করলেন না। আর ভীম? হৃদয়ের আবেগকে সোজাসাপ্টা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তার মধ্যে কোনো জটিলতা কোনোদিনই ছিল না। তিনি রাজি হয়ে গেলেন।

​ঘটোৎকচ: দুই জগতের সন্তান

​সেই গহন অরণ্যের ভেতরেই শুরু হলো এক বিচিত্র দাম্পত্য। এক দুর্ধর্ষ পালানোর গল্পের মাঝখানে সেটুকুই ছিল পরম মমতা আর শান্তির এক টুকরো সময়। আর সেই মিলনেই জন্ম নিল এক পুত্র।

​তার আবির্ভাবই ছিল রাজকীয় আর ভয়ঙ্কর। বিশাল দেহ, আগুনের মতো চোখ, আর কানে সেই রাক্ষসসুলভ সূচালো দুল। মাথায় তার চুল নেই, একেবারে মসৃণ—ঠিক যেন কলস বা ঘটের মতো। হিড়িম্বা তার নাম রাখল 'ঘটোৎকচ'। জীবনের প্রথম মুহূর্ত থেকেই সে জানত তার পরিচয়। সে নিজের অস্তিত্ব আর দায়বদ্ধতা নিয়ে ততটাই স্বচ্ছ ছিল, যতটা স্বচ্ছ হওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে গোটা একটা জীবন লড়াই করতে হয়।

​সে একদিকে রাক্ষসপুত্তুর, অন্যদিকে পাণ্ডব-সন্তান। দুই পৃথিবীর সমস্ত তেজ আর মায়া যেন এসে মিশেছিল তার রক্তে।

​রাক্ষসদের বড় হওয়ার গতি সাধারণের চেয়ে ঢের বেশি। চোখের পলকেই শিশু ঘটোৎকচ হয়ে উঠল এক তেজি যুবক। একদিন সে তার পিতার সামনে এসে দাঁড়াল—এক শক্তিশালী, সমর্থ এবং কর্তব্যপরায়ণ যোদ্ধা হিসেবে।

​যাওয়ার আগে সে ভীম আর পাণ্ডবদের শুধু এটুকুই বলে গেল, "যখনই তোমাদের প্রয়োজন পড়বে, যেখানেই থাকো না কেন—শুধু একবার আমাকে স্মরণ কোরো। আমি আসবই।"

​তারপর মায়ের হাত ধরে সে মিশে গেল অরণ্যের গভীরে। পাণ্ডবরা আবার হাঁটতে শুরু করলেন এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে।

আগামীর পথ

অরণ্য থেকে যখন পাণ্ডবরা বেরিয়ে এলেন, তারা আর আগের মতো নেই। জতুগৃহের আগুন তাদের রাজকীয় অহংকার পুড়িয়ে খাঁটি সোনা করে দিয়েছে। তারা এখন গৃহহীন, নামহীন, ভবঘুরে। পৃথিবীর চোখে তারা ভূত।

কিন্তু তারা এগিয়ে যাচ্ছিলেন। বারণাবতের আগুন তাদের মারতে পারেনি, বরং এক নতুন জীবনের দীক্ষা দিয়েছে। জতুরগৃহ শেষ হয়েছে, কিন্তু পৃথিবীর কঠিন লড়াইটা কেবল শুরু হলো।

যুধিষ্ঠির সামনে তাকালেন। সেখানে পথ নেই, কিন্তু গন্তব্য আছে। পাণ্ডবরা আবার যাত্রা শুরু করলেন।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন


Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র

রাজা যযাতির পতন ও মুক্তি