ক্ষত্রিয় দম্ভের পরাজয় ও এক ব্রহ্মর্ষির উদয়: বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্রের সেই চিরকালীন সংঘাত
ক্ষত্রিয় দম্ভের পরাজয় ও এক ব্রহ্মর্ষির উদয়: বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্রের সেই চিরকালীন সংঘাত
গঙ্গার কূল ঘেঁষে রাতটা তখন মন্থর হয়ে এসেছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর জলের ছলছল শব্দে মিশে যাচ্ছিল গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের উদাত্ত কণ্ঠস্বর। অর্জুন চুপচাপ শুনছিলেন, কিন্তু তাঁর বুকের ভেতর এক অস্থির কৌতূহল তোলপাড় করছিল। মহর্ষি বশিষ্ঠের নাম তিনি আগেও শুনেছেন, কিন্তু তাঁর শক্তির উৎস আর ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য আজ যেন এক নতুন রহস্য হয়ে অর্জুনের সামনে উন্মোচিত হচ্ছিল।
অর্জুন সামান্য ঝুঁকে বসলেন। তাঁর কণ্ঠে এক ধরণের ব্যাকুলতা, “চিত্ররথ, তোমার বর্ণনায় বশিষ্ঠের যে রূপ ফুটে উঠছে, তা আমাকে স্তম্ভিত করছে। কে এই মহান ঋষি? যাঁর সামনে দেবরাজ থেকে শুরু করে পরাক্রমশালী রাজারাও বিনম্র হয়ে থাকেন? এই ব্রহ্মর্ষির তেজ আর প্রভাবের উৎসটা ঠিক কোথায়? বিশ্বামিত্রের মতো দিগ্বিজয়ী সম্রাটের সাথে তাঁর সংঘাতেরই বা শুরু কীভাবে?”
চিত্ররথ মৃদু হাসলেন। তাঁর চোখেমুখে এক প্রাচীন প্রজ্ঞার ছাপ। তিনি বললেন, “শোনো পার্থ, বশিষ্ঠের কাহিনী ত্রিলোকের এক পবিত্র আখ্যান। মন দিয়ে শোনো সেই ইতিহাস।”
কন্যাকুব্জের প্রতাপশালী রাজা গাধি, যাঁর বীরত্বে কম্পমান ছিল আর্যাবর্ত। তাঁরই পুত্র বিশ্বামিত্র—ক্ষত্রিয় তেজে টগবগে এক যুবক, যাঁর বাহুবল আর রাজকীয় অহংকার আকাশচুম্বী। একদিন মৃগয়ায় গিয়ে ক্লান্ত-তৃষ্ণার্ত বিশ্বামিত্র সদলবলে এসে পৌঁছলেন মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে। সেই তপোবন যেন শান্তির এক অন্য জগৎ। বশিষ্ঠ স্বয়ং ব্রহ্মার মানসপুত্র, পাশে তাঁর পতিব্রতা স্ত্রী অরুন্ধতী। ঋষি রাজাকে সাদরে বরণ করলেন। অতিথিসেবার কোনো ত্রুটি রাখলেন না।
সেই আশ্রমে ছিল এক অদ্ভুত গাভী—নন্দিনী। সে সাধারণ কোনো পশু নয়, সে এক দৈব সত্তা। মহর্ষির একটি মাত্র সংকেতে নন্দিনী যেন পৃথিবীর সমস্ত ঐশ্বর্য উগরে দিতে পারত। অন্ন, বস্ত্র, রত্ন, ঘৃত—রাজার পুরো সৈন্যবাহিনীকে আপ্যায়িত করতে তার মুহূর্ত সময় লাগল না। বিশ্বামিত্র অবাক হলেন, তারপর জেগে উঠল তাঁর লোভ।
তিনি বশিষ্ঠকে বললেন, “হে মুনিবর, আপনার মতো শান্ত ঋষির কাছে এই অমূল্য রত্ন কেন? দশ হাজার গাভী কিংবা আমার আস্ত সাম্রাজ্যের বিনিময়ে আপনি এই নন্দিনীকে আমাকে দিন।”
বশিষ্ঠ শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “রাজন, এই নন্দিনী শুধু আমার সহচর নয়, আমার যজ্ঞের প্রধান অবলম্বন। একে আমি কোনো কিছুর বিনিময়েই দিতে পারি না।”
বিশ্বামিত্রের অহংকারে ঘা লাগল। তিনি গর্জে উঠলেন, “আমি রাজা, আমি ক্ষত্রিয়। বীরভোগ্যা বসুন্ধরা! আপনি যদি স্বেচ্ছায় না দেন, তবে আমি বাহুবলে একে নিয়ে যাব।”
বশিষ্ঠ অবিচল। তিনি শুধু বললেন, “আপনি শক্তিমান সম্রাট। আপনার যা উচিত মনে হয়, তাই করুন।”
বিশ্বামিত্রের সেনারা নন্দিনীকে মারতে মারতে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। আর্তনাদ করে উঠল সেই কামধেনু। সে ফিরে এল বশিষ্ঠের কাছে, তাঁর চোখে করুণ আকুতি। বশিষ্ঠ বিষণ্ণভাবে বললেন, “নন্দিনী, আমি তো ব্রাহ্মণ, ক্ষমা আমার ধর্ম। রাজা তোমাকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছেন, আমি কী করতে পারি?”
নন্দিনী তখন রুদ্রমূর্তি ধারণ করল। তার ল্যাজ থেকে অঙ্গার ঝরতে শুরু করল। তার শরীর থেকে বেরিয়ে এল অগুনতি যবন, শক, হুণ আর কিরাত সৈন্য। নিমিষের মধ্যে বিশ্বামিত্রের বিশাল বাহিনীকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল সেই মায়াবী সেনা।
বিশ্বামিত্র স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর সমস্ত শস্ত্র, সমস্ত দম্ভ আজ পরাজিত একজন সাধারণ ব্রাহ্মণের যোগবলের কাছে। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “ধিক্ ক্ষত্রিয় বলং, ব্রহ্মতেজো বলং বলম্!” অর্থাৎ ক্ষত্রিয়ের বাহুবলকে ধিক্কার, ব্রাহ্মণের তপস্যাই আসল শক্তি।
সব ছেড়ে দিয়ে বিশ্বামিত্র অরণ্যে গেলেন। কঠোর থেকে কঠোরতর তপস্যায় নিজেকে পুড়িয়ে তামাটে করে তুললেন। শেষে ইন্দ্রের সাথে সোমরস পান করার অধিকার পেলেন, হলেন ‘ব্রহ্মর্ষি’। কিন্তু সেই দীর্ঘ পথের বাঁকে বাঁকে মিশে ছিল বশিষ্ঠের অপরিসীম ধৈর্য আর বিশ্বামিত্রের দুর্দম সংকল্প।
গঙ্গার ধারে রাত গভীর হচ্ছিল। চিত্ররথের কণ্ঠে তখন বশিষ্ঠের শত পুত্রের বিয়োগ আর ঋষি পরাশরের জন্মের উপাখ্যান। অর্জুন অপলক তাকিয়ে রইলেন অন্ধকারের দিকে। মানুষের ভেতরকার রাগ, দ্বেষ আর তাকে ছাপিয়ে ওঠা ক্ষমা—বশিষ্ঠ আর বিশ্বামিত্রের এই চিরকালীন লড়াই যেন মানুষেরই অন্তরের রূপকথা।

Comments
Post a Comment