মেদহীন এক সাম্রাজ্য এবং নিয়তির খেলা-ধৃতরাষ্ট্র,পাণ্ডু ও বিদুরের জন্ম-


মেদহীন এক সাম্রাজ্য এবং নিয়তির খেলা-ধৃতরাষ্ট্র,পাণ্ডু ও বিদুরের জন্ম-


বিচিত্রবীর্যের অকালমৃত্যু কেবল একটি জীবনের অবসান ছিল না, তা ছিল কুরু বংশের ভবিষ্যতের ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। হাস্তিনাপুরের সিংহাসন শূন্য, আর সত্যবতীর বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে। যে সাম্রাজ্যকে তিনি তিল তিল করে আগলে রেখেছিলেন, তা আজ উত্তরাধিকারহীন। বিচিত্রবীর্যের দুই রাণী অম্বিকা আর অম্বালিকা তখন ভরা যৌবনে বিধবা। সত্যবতীর মনে হলো, তাঁর আজন্মের স্বপ্ন বুঝি এক নিমেষে ধূলিসাৎ হতে চলেছে।


ভীষ্মের অটল প্রতিজ্ঞা

তিনি দ্বারস্থ হলেন ভীষ্মের। সোজাসুজি বললেন, "বৎস, কুরুবংশ আজ বিলুপ্তির পথে। তুমি এই দায়ভার গ্রহণ করো। অম্বিকা আর অম্বালিকার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করে তুমিই রক্ষা করো এই বংশ।"

ভীষ্মের মুখচ্ছবিতে কোনো বিকার দেখা দিল না। সেই শান্ত, সমাহিত কণ্ঠস্বর। তিনি মনে করিয়ে দিলেন গঙ্গার তীরে নেওয়া সেই ভয়ানক প্রতিজ্ঞার কথা। যে প্রতিজ্ঞার বিনিময়ে একদিন সত্যবতী শান্তনুর মহিষী হতে পেরেছিলেন। ভীষ্ম বললেন, "মা, পৃথিবী তার গন্ধ ত্যাগ করতে পারে, আকাশ শব্দহীন হতে পারে, এমনকি চাঁদও তার শীতলতা হারানো সম্ভব—কিন্তু আমার দেওয়া কথা আমি লঙ্ঘন করতে পারব না। আমি রাজ্যভোগ করব না, বিয়ে করব না—এ আমার অন্তরের কথা।"


সত্যবতী জানতেন, ভীষ্মকে টলানো অসম্ভব। তিনি বিফল মনোরথে ফিরে এলেন, কিন্তু হাল ছাড়লেন না।

ব্যাসদেবের আগমন

অসহায় সত্যবতীর মনে পড়ল তাঁর কুমারীকালের কথা। যমুনার বুকে পরাশর মুনির সঙ্গে সেই মিলনের ফলে জন্মেছিলেন ব্যাসদেব। সত্যবতী মনে মনে স্মরণ করলেন তাঁর সেই তেজস্বী পুত্রকে। মুহূর্তের মধ্যে আবির্ভূত হলেন মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব। জটাধারী, দীর্ঘকায়, তামাটে রঙের এক মানুষ, যাঁর উপস্থিতিতে চারপাশ যেন কেঁপে ওঠে।

সত্যবতী পুত্রকে বললেন তাঁর সঙ্কটের কথা। বংশ রক্ষার প্রয়োজনে ব্যাসদেব রাজি হলেন নিয়োগ প্রথায় মাতামহীর আদেশ পালন করতে।

তিন জননীর তিন নিয়তি

প্রথম ডাক পড়ল রাজকুমারী অম্বিকার। রাজকীয় সাজে তিনি প্রস্তুত হলেন বটে, কিন্তু যখন ব্যাসদেবের সম্মুখে গেলেন, তাঁর সেই রুক্ষ, দীর্ঘ তপস্বীর রূপ দেখে ভয়ে শিউরে উঠলেন তিনি। অম্বিকা দুচোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেললেন। সেই মিলনের ফসল হিসেবে জন্ম নিলেন ধৃতরাষ্ট্র। জননী চোখ বন্ধ করে ছিলেন বলে কুরুবংশের বড় রাজকুমার জন্ম থেকেই হলেন অন্ধ।

এরপর গেলেন অম্বালিকা। তিনি চোখ খোলা রাখলেন ঠিকই, কিন্তু ব্যাসদেবের সেই প্রচণ্ড তেজ সহ্য করতে না পেরে ভয়ে তাঁর গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। তিনি পাণ্ডুর বর্ণ ধারণ করলেন। তাঁর কোল আলো করে যে সন্তান এল, সে হলো পাণ্ডু। পাণ্ডুর মতো ফ্যাকাশে চামড়া নিয়ে তাঁর জন্ম।

সত্যবতী দেখলেন, কুরুবংশের উত্তরাধিকারীরা কেউ পূর্ণাঙ্গ হলো না। তিনি অম্বিকাকে অনুরোধ করলেন আবার ব্যাসদেবের কাছে যেতে। কিন্তু অম্বিকার মনে তখন ত্রাস। তিনি নিজে না গিয়ে নিজের এক পরিচারিকাকে রাজকীয় সাজে সাজিয়ে পাঠিয়ে দিলেন।

সেই দাসী কোনো ভয় পেল না। সে ব্যাসদেবকে গ্রহণ করল পরম শ্রদ্ধা আর শান্ত মনে। কোনো কুণ্ঠা ছিল না তাঁর চোখেমুখে। ব্যাসদেব প্রীত হলেন। সেই মিলন থেকে জন্ম নিল বিদুর—হাস্তিনাপুরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম প্রজ্ঞার আধার।

ধর্মের মর্ত্যে আগমন

বিদুর কিন্তু সাধারণ কেউ ছিলেন না। মাণ্ডব্য মুনির অভিশাপে স্বয়ং ধর্মরাজ বা যমরাজকে পৃথিবীতে মানুষ হয়ে জন্ম নিতে হয়েছিল। ন্যায় আর ধর্মের মূর্ত প্রতীক হয়ে তিনি কুরুসভার উপদেষ্টা হলেন।

একদিকে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র, অন্যদিকে পাণ্ডুর বর্ণের পাণ্ডু, আর তাদের মাঝে ধ্রুবতারার মতো স্থির বুদ্ধির বিদুর—এই তিনজনকে ঘিরেই শুরু হলো এক মহাকাব্যের বীজবপন। সত্যবতী জানতেন না, যে উত্তরাধিকার রক্ষার জন্য তিনি এত আয়োজন করলেন, তা একদিন কুরুক্ষেত্রের মহাপ্রলয় ডেকে আনবে। মানুষের জেদ আর নিয়তির পরিহাস এইভাবেই ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম খোদাই করে নেয়।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন


Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

রাজা যযাতির পতন ও মুক্তি

সত্যবতী ও ব্যাসদেব