অর্জুনের লক্ষ্যভেদ ও একলব্যের নিষ্ঠা: মহাভারতের এক অনন্য গুরু-শিষ্য আখ্যান


 অর্জুনের লক্ষ্যভেদ ও একলব্যের নিষ্ঠা: মহাভারতের এক অনন্য গুরু-শিষ্য আখ্যান

ভীষ্মের নির্দেশে যখন দ্রোণাচার্য হস্তিনাপুরে এসে পা রাখলেন, তখন কুরুকুলের ভাগ্যাকাশে এক নতুন সূর্যের উদয় হলো। রাজপুত্রদের অস্ত্রশিক্ষার গুরু হিসেবে তাঁর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে ভীষ্ম কোনো কার্পণ্য করেননি। আভিজাত্য আর শাস্ত্রীয় গাম্ভীর্যে দ্রোণের দিন কাটছিল শিষ্যদের মাঝখানে।


একদিন আচার্য দ্রোণ তাঁর শিষ্যদের সামনে এক অদ্ভুত প্রস্তাব রাখলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন গভীর কোনো গোপন সংকল্পের ছাপ। তিনি বললেন, "তোমাদের কাছে আমার একটা ব্যক্তিগত প্রার্থনা আছে। ভবিষ্যতে তোমাদের মধ্যে কেউ কি পারবে আমার সেই ইচ্ছা পূরণ করতে?"

সভাকক্ষ নিস্তব্ধ। রাজপুত্ররা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। কিন্তু সেই স্তব্ধতা ভেঙে এগিয়ে এল কিশোর অর্জুন। কোনো দ্বিধা নেই, কোনো সংকোচ নেই। সে মাথা নিচু করে বলল, "আচার্য, আমি কথা দিচ্ছি। আপনার যেকোনো আদেশ আমি পালন করব।" দ্রোণ আবেগে আপ্লুত হলেন, পরম স্নেহে অর্জুনকে বুকে টেনে নিলেন। সেই মুহূর্তেই বোধহয় স্থির হয়ে গিয়েছিল যে, এই অর্জুনই হবে তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।

এরপর শুরু হলো অলৌকিক দিব্যাস্ত্রের সাধনা। পাণ্ডব, কৌরব থেকে শুরু করে যদুবংশীয় রাজপুত্ররা—সবাই দ্রোণের চরণে শিষ্যত্ব নিলেন। সুতপুত্র কর্ণও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু অর্জুন ছিলেন সবার চেয়ে আলাদা। তাঁর একাগ্রতা ছিল আগুনের মতো প্রখর।

দ্রোণাচার্যের নিজের ছেলে অশ্বত্থামার প্রতি তাঁর মমতা ছিল প্রশ্নাতীত। অশ্বত্থামাকে তিনি কলসি দিয়ে সর্ব প্রথমে জল আনতে পাঠাতেন এবং অশ্বত্থামা প্রথমেই দ্রোণাচার্যের কাছে ফিরে আসত। সেই সুযোগে তাকে কিছু গোপন বিদ্যা শিখিয়ে দিতেন। কিন্তু অর্জুনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে পারেনি এই কৌশল। অর্জুন 'বারুণাস্ত্র' প্রয়োগ করে নিমেষে জল পূর্ণ করে দ্রোণের কাছে ফিরে আসতেন, যাতে তিনিও সেই বিশেষ পাঠ থেকে বঞ্চিত না হন।

অর্জুনের এই শেখার ক্ষুধা ছিল অপরিসীম। একদিন প্রদীপের আলোয় বসে খাবার সময় হঠাৎ আলো নিভে গেল। কিন্তু অর্জুন লক্ষ্য করলেন, অন্ধকারেও তাঁর হাত ঠিক মুখের কাছেই অন্ন পৌঁছে দিচ্ছে। তাঁর মনে বিদ্যুৎ খেলে গেল—অভ্যাস যদি হাতকে পথ দেখাতে পারে, তবে অন্ধকার ধনুর্বিদ্যায় বাধা হবে কেন? সেই রাত থেকেই শুরু হলো জ্যোৎস্নালোকে আর নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে তাঁর শরসন্ধানের কঠোর তপস্যা। গভীর রাতে ধনুকের ছিলা থেকে টংকার শুনে দ্রোণ বেরিয়ে এলেন। বিস্মিত আচার্য সেদিন অর্জুনকে প্রতিশ্রুতি দিলেন, "আমি তোমায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর করব অর্জুন, তোমার উপরে আর কেউ থাকবে না।"

দ্রোণাচার্য শিষ্যদের রথ, অশ্ব, হস্তী—সব ধরনের যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী করে তুললেন। কিন্তু তাঁর সমস্ত মনোযোগের কেন্দ্রে ছিলেন অর্জুন। দ্রোণের এই অসামান্য শিক্ষার কথা দূর-দূরান্তের রাজ্যগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল।

একলব্য

সেই সময়েই নিষাদরাজ হিরণ্যধনু’র পুত্র একলব্য দ্রোণের কাছে এলেন অস্ত্রশিক্ষার আশায়। কিন্তু দ্রোণ নির্মমভাবে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করলেন। রাজকুলের বাইরে কাউকে তিনি শিক্ষা দেবেন না—এই ছিল তাঁর নীতি। হতাশ কিন্তু অদম্য একলব্য ফিরে গেলেন গভীর অরণ্যে। সেখানে দ্রোণাচার্যের একটি মাটির মূর্তি গড়ে তাকেই গুরু জ্ঞানে পূজা শুরু করলেন। নিভৃত বনের নিস্তব্ধতায় একলব্য হয়ে উঠলেন এক অতিমানবীয় ধনুর্ধর।

একদিন মৃগয়ায় বেরিয়ে রাজপুত্রদের সঙ্গে থাকা একটি কুকুর একলব্যের কুটিরের কাছে গিয়ে ডাকতে শুরু করল। একলব্য বিরক্তিহীনভাবে সাতটি বাণ এমনভাবে নিক্ষেপ করলেন যে কুকুরের মুখ বন্ধ হয়ে গেল, কিন্তু এক ফোঁটা রক্তও ঝরল না। সেই বিচিত্র দৃশ্য দেখে পাণ্ডবরা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাঁরা খুঁজে বের করলেন সেই ব্যাধপুত্রকে। একলব্য বিনম্রভাবে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, "আমি আচার্য দ্রোণের শিষ্য।"

অর্জুন বিষণ্ণ হলেন। তিনি দ্রোণকে গিয়ে অনুযোগের স্বরে বললেন, "আচার্য, আপনি বলেছিলেন আমার উপরে কেউ নেই। কিন্তু এই একলব্য তো আমাকেও ছাড়িয়ে গেছে।" দ্রোণ বিচলিত হলেন। তিনি অর্জুনকে সঙ্গে নিয়ে সেই অরণ্যে প্রবেশ করলেন।


গুরুদক্ষিণা

আচার্যকে সশরীরে সামনে দেখে একলব্য ভক্তিভরে লুটিয়ে পড়লেন। তাঁর মাটির মূর্তির সামনে যে সাধনা, আজ তা পূর্ণতা পেল। দ্রোণ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, "তুমি যদি আমার শিষ্যই হও, তবে আমাকে গুরুদক্ষিণা দাও।"

একলব্য সানন্দে রাজি হলেন। কিন্তু দ্রোণ চাইলেন একলব্যের ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি। এক মুহূর্তের জন্যও একলব্যের হাত কাঁপল না। অবলীলায় নিজের আঙুলটি কেটে তিনি গুরুর চরণে উৎসর্গ করলেন। সেই সঙ্গে চিরকালের মতো হারিয়ে গেল তাঁর শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হওয়ার ক্ষমতা। এক নিষ্ঠুর অবিচারের মাধ্যমে দ্রোণ তাঁর অর্জুনকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন।

লক্ষ্যভেদ ও ব্রহ্মশির

দ্রোণ একবার তাঁর শিষ্যদের পরীক্ষা নিতে চাইলেন। একটি গাছের ডালে তিনি কৃত্রিম একটি মাটির পাখি বসিয়ে বললেন, "তোমাদের লক্ষ্য ওই পাখির ঘাড়।"

যুধিষ্ঠিরকে ডেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কী দেখতে পাচ্ছ?" যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন, "আচার্য, আমি আপনাকে দেখছি, ভাইদের দেখছি, আর ওই গাছ আর পাখিটা দেখছি।" দ্রোণ তাঁকে সরিয়ে দিলেন। একে একে সব রাজপুত্র ব্যর্থ হলেন। শেষে ডাক পড়ল অর্জুনের।

দ্রোণ প্রশ্ন করলেন, "অর্জুন, তুমি কী দেখছ?"

অর্জুন সংক্ষেপে বললেন, "শুধু পাখির মাথাটা দেখতে পাচ্ছি।"

"আর কিছু না?"

"না, আর কিছুই না।"

দ্রোণ তৃপ্ত হলেন। অর্জুনের তীরে মুহূর্তেই পাখির মুণ্ডু বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। দ্রোণ বুঝলেন, রাজা দ্রুপদের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এই অর্জুনই তাঁর মোক্ষম অস্ত্র।

একদিন গঙ্গায় স্নানের সময় একটি কুমির দ্রোণের পা কামড়ে ধরল। দ্রোণ চাইলে নিজেই মুক্ত হতে পারতেন, কিন্তু তিনি শিষ্যদের পরীক্ষা করতে চাইলেন। চোখের পলক ফেলার আগেই অর্জুন পাঁচটি বাণ বিদ্ধ করে কুমিরটিকে বধ করলেন। দ্রোণ প্রসন্ন হয়ে অর্জুনকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধ্বংসাত্মক অস্ত্র 'ব্রহ্মশির' দান করলেন। তবে সতর্ক করে দিলেন, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে যেন এই অস্ত্র কখনও ব্যবহৃত না হয়।

অর্জুনের মাথায় হাত রেখে দ্রোণাচার্য সেদিন আবারও উচ্চারণ করেছিলেন সেই অমোঘ সত্য— "এই পৃথিবীতে তোমার সমান বীর আর কেউ জন্মাবে না।"

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)