রাজা পরীক্ষিতের অন্তিম যাত্রা



রাজা পরীক্ষিতের অন্তিম যাত্রা

সব দিক থেকেই পরীক্ষিত ছিলেন এক আদর্শ রাজা। অর্জুনের পৌত্র, অভিমন্যুর পুত্র—সেই মহাবীর অভিমন্যু, যিনি কুরুক্ষেত্রের চক্রব্যূহে প্রাণ দিয়েছিলেন নিজের অনাগত সন্তানকে দেখার আগেই। পরীক্ষিত তাঁর পিতাকে দেখেননি। তাঁর জন্ম হয়েছিল এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে, যখন যুদ্ধের দামামা থিতিয়ে এসেছে, আর চারিদিকে কেবল শ্মশানের নিস্তব্ধতা।

কিন্তু তিনি বড় হয়েছিলেন এক দীপ্ত মহিমায়। বীরত্ব, ন্যায়পরায়ণতা আর প্রজাবাৎসল্য ছিল তাঁর স্বভাবজাত। পাণ্ডবরা যখন মহাপ্রস্থানের পথে পা বাড়ালেন, হস্তিনাপুরের শেষ প্রদীপ হিসেবে জ্বলে রইলেন পরীক্ষিত। মানুষ তাঁকে ভালোবেসেছিল নিঃশর্তভাবে। কিন্তু মানুষের ভাগ্য তো সুতোর ওপর ঝুলে থাকে। এক সাধারণ দুপুরে শিকারে বেরোলেন রাজা। আর সেখান থেকেই শুরু হলো এক অমোঘ ট্র্যাজেডির।

শিকার রাজধর্মের অংশ হতে পারে, কিন্তু সেদিন অরণ্যের গভীরে যেন এক মায়া হরিণ তাঁকে পথ ভুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তৃষ্ণার্ত, ক্লান্ত এবং কিছুটা বিরক্ত রাজা এসে পৌঁছলেন ঋষি শমীকের আশ্রমে। ঋষি তখন গভীর ধ্যানে মগ্ন। বাহ্যজ্ঞানহীন সেই স্তব্ধতার সামনে দাঁড়িয়ে পরীক্ষিত জল চাইলেন, শিকারের খোঁজ নিলেন। কিন্তু শমীক নিথর, যেন পাথর খোদাই করা এক মূর্তি।

এ কি ঋষির ধ্যান, নাকি রাজাকে অবজ্ঞা? ক্লান্ত মস্তিষ্কে জেদ চেপে বসল পরীক্ষিতের। অহংকার এক অদ্ভুত বস্তু—ভালো মানুষকেও মুহূর্তে গ্রাস করে। পাশে পড়ে থাকা এক মৃত সর্পকে ধনুকের ডগায় তুলে তিনি ঋষির গলায় জড়িয়ে দিলেন। এক লহমার সেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য যে তাঁর জীবনের শেষ ঘণ্টা বাজিয়ে দেবে, তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি।

শমীকের পুত্র শৃঙ্গী ছিলেন তেজস্বী যুবক। আশ্রমে ফিরে পিতার গলায় মৃত সাপ দেখে তাঁর রক্ত টগবগ করে উঠল। যখন শৃঙ্গী তার এক বন্ধুর থেকে শুনলেন এ কাজ রাজা পরীক্ষিতের, তখন ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞান হারালেন তিনি। হাতের অঞ্জলিতে জল নিয়ে উচ্চারণ করলেন সেই ভয়ংকর অভিশাপ:

"আজ থেকে সপ্তম দিনে তক্ষক নাগের দংশনে এই পাপিষ্ঠ রাজার মৃত্যু হবে।"

ঋষি শমীক ধ্যানভঙ্গের পর যখন সব জানলেন, তিনি ব্যথিত হলেন। পুত্রকে বললেন, "এ তুমি কী করলে শৃঙ্গী? এক মুহূর্তের ভুলের জন্য এক প্রজাবৎসল রাজাকে এমন দণ্ড দিলে? এ ধর্ম নয়।" কিন্তু নিক্ষিপ্ত বাণ আর উচ্চারিত অভিশাপ—ফেরানোর সাধ্য কারও নেই। ঋষি শমীক তার এক সুশীল ও জ্ঞানী শিষ্য গৌরমুখকে দিয়ে পরীক্ষিতকে সব ঘটনা জানায়।

খবর যখন পৌঁছল হস্তিনাপুরে, পরীক্ষিত ভেঙে পড়লেন না। বরং এক অদ্ভুত প্রশান্তি তাঁকে গ্রাস করল। তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। জীবনের শেষ সাতটি দিনকে তিনি সার্থক করে তুলতে চাইলেন। পুত্র জনমেজয়ের হাতে রাজ্যভার তুলে দিয়ে গঙ্গার তীরে এক উচ্চ মঞ্চ তৈরি করলেন তিনি। চারিদিকে অতল জলরাশি, যাতে কোনো সর্প সেখানে পৌঁছাতে না পারে।

সেখানে বসেই তিনি ব্যাসপুত্র শুকদেবের মুখে শুনতে লাগলেন শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা আর বিষ্ণুর মাহাত্ম্য। এই সাত দিনেই রচিত হলো 'ভাগবত পুরাণ'। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক রাজা হয়ে উঠলেন এক পরমাত্মার যাত্রী।

যখন তক্ষক আসছিল,সে সাধারণ সর্প নয়, সে প্রাচীন, গর্বিত এবং মারণ ক্ষমতাসম্পন্ন। পথে তাঁর দেখা হলো মহাজ্ঞানী কশ্যপের সঙ্গে, যিনি বিষবিদ্যা জানতেন। তক্ষক তাঁকে পরীক্ষা করতে চাইল। নিজের দংশনে এক বিশাল বৃক্ষকে ভস্মীভূত করে দিল সে। কিন্তু কশ্যপ তাঁর মন্ত্রবলে সেই ছাই থেকে আবার গাছটিকে জ্যান্ত করে তুললেন।

তক্ষক প্রমাদ গুনল। সে বুঝতে পারল, কশ্যপ যদি রাজার কাছে পৌঁছায়, তবে অভিশাপ ব্যর্থ হবে। সে কৌশলে কশ্যপকে ধনরত্ন দিয়ে বশীভূত করল। কশ্যপও ভাবলেন, নিয়তি যখন নির্ধারিত, তখন তাকে ঠেকানোর চেষ্টা বৃথা। তিনি সম্পদ নিয়ে ফিরে গেলেন।

সপ্তম দিন উপস্থিত। চারিদিকে কড়া পাহারা। কিন্তু তক্ষক ছিল ছদ্মবেশে পটু। কিছু সাপকে ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে ফলের ঝুড়ি নিয়ে পাঠাল সে রাজার কাছে। পরীক্ষিত তখন নিশ্চিত যে তিনি বেঁচে গেছেন। সূর্যাস্তের আর সামান্যই বাকি। তিনি প্রসন্ন মনে একটি ফল হাতে নিলেন। উপহাসের সুরে বললেন, "তবে আসুক তক্ষক, এই ফলের মধ্যেই যদি সে থাকে, তবে আমার মৃত্যু হোক।"

ফলটি কাটতেই তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক ক্ষুদ্র কীট। মুহূর্তের মধ্যে সেটি ধারণ করল কালান্তক তক্ষকের রূপ। বিদ্যুতের গতিতে সে দংশন করল পরীক্ষিতকে। বিষের জ্বালায় নিমেষে ছাই হয়ে গেল সেই মঞ্চ আর রাজা।

নিয়তির খেলা এখানেই শেষ হয় না। জনমেজয় যখন শুনলেন তাঁর পিতার মৃত্যুর কাহিনী, তাঁর শোক পরিণত হলো হিমশীতল প্রতিশোধে। তিনি আয়োজন করলেন 'সর্পসত্র' যজ্ঞের—যেখানে বিশ্বের সমস্ত সর্পকে আগুনে পুড়িয়ে মারার সংকল্প করলেন তিনি।

মহাভারতের গল্প এইভাবেই চলে। এক মুহূর্তের ক্রোধ, একটি সামান্য ভুল, আর তার মাশুল গুনতে হয় যুগের পর যুগ। পরীক্ষিতের মৃত্যু কেবল এক রাজার বিদায় নয়, এ ছিল এক অলঙ্ঘনীয় নিয়তির জয়গান।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতী ও ব্যাসদেব

"পতন একদিনে হয় না, উত্থানও একদিনে হয় না — কিন্তু সেই একটা মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সব ঠিক করে দেয়।"

পাণ্ডব-কথা: এক অলৌকিক জন্ম ও এক বসন্তের দীর্ঘশ্বাস