দেবতা আর অসুরের লড়াই আর কচ ও দেবযানীর প্রেম


দেবতা আর অসুরের লড়াই আর কচ ও দেবযানীর প্রেম

দেবতা আর অসুরের লড়াই তখন তুঙ্গে। স্বর্গে ইন্দ্রের দুশ্চিন্তার শেষ নেই, কারণ মর্ত্যের সমতলে দানবগুরু শুক্রাচার্য যেন সাক্ষাৎ যমরাজকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন। তাঁর হাতে আছে 'মৃতসঞ্জীবনী'। অসুরের দল মরছে আর শুক্রাচার্য কেবল একবার বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ছেন, অমনি তারা তুড়ি মেরে বেঁচে উঠছে। অথচ দেবগুরু বৃহস্পতি এ বিদ্যায় আনাড়ি। দেবতারা তো প্রমাদ গুনলেন। অবশেষে শরণ নিলেন বৃহস্পতিরই পুত্র কচ-এর। ছিপছিপে যুবক, চোখে তার তেজোদ্দীপ্ত অঙ্গীকার। দেবতারা বললেন, "বৎস কচ, ছদ্মবেশে যাও শুক্রাচার্যের আশ্রমে। যেমন করে হোক, আদায় করো সেই গোপন মন্ত্র।"

কচ গেল। তবে লুকোছাপা সে করল না। ঋজু ভঙ্গিতে শুক্রাচার্যের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, "আমি বৃহস্পতির পুত্র। আপনার শিষ্য হতে চাই।" শুক্রাচার্য খুশি হলেন। কেন হবেন না? শত্রুর ছেলে যদি শ্রদ্ধায় মাথা নোয়ায়, তবে গুরুর অহংকার তাতে তৃপ্ত হয় বইকি। শুক্রাচার্য তাকে সাদরে বরণ করলেন। শর্ত হলো—হাজার বছরের ব্রহ্মচর্য।

আশ্রমে কচের দিন কাটে ফুল তুলে, গোরু চরিয়ে আর সমিধ সংগ্রহ করে। কিন্তু এই কঠিন তপশ্চর্যার ফাঁকেই কখন যেন এক জোড়া টানা চোখ কচের ওপর নিবদ্ধ হলো। তিনি দেবযানী। শুক্রাচার্যের আদুরে দুহিতা। কচ সুদর্শন, মিষ্টভাষী আর গম্ভীর। দেবযানীর মতো অভিমানী মেয়ের মনে সেই মায়াবী যুবকটি কখন যে ঘর বাঁধল, কচ তা টের পেল না। দেবযানী ভালোবাসলেন নিভৃতে, তিল তিল করে।

অসুররা কিন্তু বোকা নয়। তারা বুঝল, এই কচ আসলে গুপ্তচর। একদিন বনে একা পেয়ে তারা কচকে মেরে টুকরো টুকরো করে নেকড়েকে খাইয়ে দিল। সন্ধ্যাবেলায় গোরু ফিরল, কিন্তু কচ ফিরল না। দেবযানী কেঁদে ভাসালেন—"বাবা, কচকে না দেখলে আমি বাঁচব না।" মেয়ের চোখের জল সইতে পারলেন না বৃদ্ধ গুরু। মৃতসঞ্জীবনী মন্ত্র পড়লেন। নেকড়ের পেট চিরে কচ বেরিয়ে এল নবজাতকের মতো।

অসুররা দমল না। দ্বিতীয়বার তারা কচকে পুড়িয়ে ছাই করে দিল। সেই ছাই মিশিয়ে দিল শুক্রাচার্যেরই পানপাত্রের সুরার সঙ্গে। অজান্তে সেই সুরা পান করলেন শুক্রাচার্য। আবার দেবযানীর হাহাকার। শুক্রাচার্য এবার মন্ত্র পড়তে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। পেটের ভেতর থেকে কচের কণ্ঠস্বর শোনা গেল—"প্রভু, আমি আপনার জঠরে।"

এক অদ্ভুত সংকট! কচ চিরে বেরিয়ে এলে শুক্রাচার্য মারা যাবেন। আর না এলে কচ নেই। দেবযানী জেদ ধরলেন, "আমি পিতা এবং প্রেমিক—কাউকেই হারাতে পারব না।" তখন শুক্রাচার্য এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিলেন। পেটের ভেতরে থাকা কচকেই শিখিয়ে দিলেন সেই গোপন বিদ্যা। তারপর গুরুকে বিদীর্ণ করে কচ বেরিয়ে এলেন বাইরে। গুরুর দেহ নিথর। কিন্তু কচের হাতে তো এখন সঞ্জীবনী! সে তৎক্ষণাৎ মন্ত্র পড়ে প্রাণ ফিরিয়ে দিল শুক্রাচার্যকে। এক অপূর্ব গুরু-শিষ্যের মিলন। শুক্রাচার্য সেই দিনই বিধান দিলেন—ব্রাহ্মণদের মদ খাওয়া মহাপাপ। মদ্যপান মানুষের হিতাহিত জ্ঞান কেড়ে নেয়।

হাজার বছর পূর্ণ হলো। এবার কচের ফেরার পালা। যাওয়ার আগে সে দেবযানীর কাছে বিদায় নিতে এল। ঠিক এইখান থেকেই শুরু হয় এক ট্র্যাজিক অসমাপ্তির গল্প। দেবযানী পথ আগলে দাঁড়ালেন। বুকের ভেতর জমানো কয়েকশ বছরের হাহাকার উজাড় করে বললেন, "কচ, আমি তোমাকে চেয়েছি। তুমি আমাকে গ্রহণ করো। বিবাহ করো আমাকে।"

কচ শান্ত স্বরে বলল, "দেবযানী, তুমি আমার পূজনীয়া। আমি আজ তোমার পিতার উদর চিরে ভূমিষ্ঠ হয়েছি, তাই সম্পর্কে আমি তোমার ভাই। এক জঠর থেকে আমাদের জন্ম। এ পরিণয় সম্ভব নয়।"

দেবযানীর চোখে তখন আগুনের ফুলকি। অপমানিত নারীত্বের সেই দাহ্য রূপ। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, "তুমি আমায় ব্যবহার করেছ! কেবল মন্ত্র শেখার জন্য আমার প্রেমকে ঢাল বানিয়েছ? যাও, আমি অভিশাপ দিচ্ছি—যে সঞ্জীবনী মন্ত্র তুমি এত কষ্টে শিখলে, তা তোমার নিজের প্রয়োজনে কখনো ফলপ্রসূ হবে না।"

কচ বিচলিত হলো না। শুধু বিষণ্ণ হাসল। বলল, "অন্যায় করলে দেবযানী। আমি ধর্ম মেনেছি বলেই তোমাকে গ্রহণ করতে পারছি না। তুমি অভিশাপ দিলে, তাই প্রতি-অভিশাপ দিচ্ছি—কোনো ঋষিপুত্র কখনো তোমার পাণিগ্রহণ করবে না। তোমাকে ক্ষত্রিয়ের অন্দরমহলে যেতে হবে।"

কচ স্বর্গে ফিরে গেল। সে নিজে সঞ্জীবনী ব্যবহার করতে পারল না ঠিকই, কিন্তু শিখিয়ে দিল অন্য দেবতাদের। দেবতারা অমর হলো। আর দেবযানী? তিনি রয়ে গেলেন সেই ধুলোমাখা আশ্রমের নির্জনতায়, একরাশ একাকীত্ব আর অপ্রাপ্তির দহন বুকে নিয়ে।

চলবে...পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতী ও ব্যাসদেব

"পতন একদিনে হয় না, উত্থানও একদিনে হয় না — কিন্তু সেই একটা মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সব ঠিক করে দেয়।"

পাণ্ডব-কথা: এক অলৌকিক জন্ম ও এক বসন্তের দীর্ঘশ্বাস